শান-বাঁধানো বাগানের একটুখানি রাস্তায় আগে হেঁটে যেতে যেতে রিখিয়া বলল—আহা! ভেবে ভেবে ঘুম হয় না বেচারির!
শৈলীমাসির ঘরে তেমনি কোমল অন্ধকার। সবুজ ঘেরাটোপে ঢাকা বাতিদান। ওষুধের গন্ধ, অডিকোলনের গন্ধ। খুব মৃদু শব্দ করে চলেছে এয়ারকুলার। সামান্য ঠান্ডা ঘর। নাইলনের সাদা মশারি ফেলা। বিছানার পাশে আজ একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার দেখা যাচ্ছে। সিলিন্ডারের পাশে একটু মোটা মতো, লম্বা লোক গম্ভীরভাবে চেয়ারে বসে আছে।
ঘরে ঢুকে তাকে ডেকে রিখিয়া বলে—বাপি, এই হচ্ছে ননীমাসির ছেলে।
ভদ্রলোক একবার সোমেনের দিকে চাইলেন। চেনার কথা নয়। তার ওপর উনি উদ্বিগ্ন। বললেন—রাখু, উনি কিন্তু ট্র্যাংকুইলাইজারটা খেলেন না। ঘুমিয়ে পড়লেন।
সোমেন প্রণাম করবার জন্য উপুড় হয়ে ভদ্রলোকের পা খুঁজে পাচ্ছিল না মেঝের অন্ধকারে। একটা পা পেল, অন্যটা না পেয়ে চেয়ারের পায়ার হাত ছুঁইয়ে মাথায় ঠেকাল। উনি গ্রাহ্য করলেন না। স্ত্রীর জন্য বোধ হয় খুবই উদ্বিগ্ন। একবার তাকিয়ে বললেন—কে বললি?
রিখিয়া বোধ হয় বাপকে তেমন আমল দেয় না। আদুরে মেয়েরা এরকমই হয়। হঠাৎ একটা ঝাঁঝের গলায় বলল—বললাম তো। ননীমাসির ছেলে। চুলঅলা ননীবালার গল্প শোনোনি!
—ও। বলে উনি খুব গম্ভীর হয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ সোমেনের দিকে চেয়ে নালিশ করার মতো বললেন—অক্সিজেন নেওয়াটা ওর এক বাতিক। নাকে নল নিয়ে নিয়ে ঘায়ের মতো হয়ে গেছে—
সোমেন কী বলবে। চুপ করে রইল। যখন প্রণাম করছিল তখন ভদ্রলোক পা দুটো এগিয়ে দেননি। সেই রাগটা সোমেনকে খানিকটা উত্তপ্ত রেখেছে।
উনি রিখিয়াকে বললেন—রাতের খাওয়াটা আজ ঠিক খেয়েছেন। অন্য দিনের মতো গোলমাল করেননি।
রিখিয়া তার বাবার দিকে চেয়ে মাথা নাড়ল কেবল। বলল—এখানে বসে অত কথা বোলো না। ডিস্টার্ব হয়।
উনি কিন্তু বসে রইলেন। কেমন একটু ঘোর-লাগা ভাব। পরনে একটা গোলাপি। পায়জামা, একই রঙের টিলা কোটের মতো জামা গায়ে। দেখে মনে হয় না যে লোকটার রুচি বা বুদ্ধি-সুদ্ধি আছে। অথচ কত টাকা করেছে। সোমেনের ভারী হিংসে হয়। বোধবুদ্ধিহীন এরকম কত মানুষ লাখ লাখ টাকা কামিয়ে নিচ্ছে বাতাস থেকে। ভদ্রলোকের কোনও ব্যক্তিত্বও নেই। মেয়ে তার সঙ্গে কেমন ঝাঁঝিয়ে কথা বলে! হয়তো বা ভদ্রলোক কিছুটা স্ত্রৈণও। অন্ধ কুকুরের মতো বসে আছে বশংবদ। মনে মনে নিজের বাবার সঙ্গে তুলনা করে দেখে সোমেন। বাবাকে অনেক মহৎ মানুষ বলে মনে হয়। সৎ, চরিত্রবান, শুভ্র মানুষ। মায়ের দেওয়া ছোট্ট চিরকুটটা যখন ব্যগ্রভাবে খুঁজে দেখছিলেন সেদিন তখনই সোমেন টের পেয়েছিল, মায়ের প্রতি বাবার মমতা এখনও কী গভীর। তবু ব্রজগোপালের চরিত্রে একটুও স্ত্রৈণতা নেই। অসফল মানুষ, তবু সোজা গনগনে মানুষ। শরীর শক্ত হাড়গোড় আছে।
সামান্য অ্যালকোহলের একঝলক গন্ধ আজও পেল সোমেন। অন্ধ কুকুরটা টলতে টলতে এল ঘরে। মুখ তুলে চাইল রিখিয়ার দিকে। না, চাইবে কী করে! ও তো দেখে না। কেবল শ্রবণ উৎকর্ণ করে বাতাস শু^কছে। রিখিয়ার বাবা হাত বাড়ালেন কুকুরটার দিকে। মৃদু গলায় বললেন—আয়!
কুকুরটা মাথা নামিয়ে লুটিয়ে পড়ল পায়ের কাছে। চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। সামনের দুটো পা নুলোর মতো বুকের ওপর জড়ো করে, পিঁছনের পা দুটো ছড়িয়ে অদ্ভুত আদরখেকো ভঙ্গিতে পড়ে আছে। রিখিয়ার বাবা চটিসুদ্ধ পা তুলে ওর গলার কাছটা রগড়াতে রগড়াতে বললেন—আজও খুব রিন্টুর কথা বলছিলেন। সে আসছে না কেন। দোষটা যেন আমার। সে যদি তার মা-বাবার কথা না ভাবে—
বলে উনি চাইলেন রিখিয়ার দিকে। রিখিয়া বুঝি চোখ দিয়ে একটু শাসন করল। বাইরের লোকের সামনে ঘরের কথা বলা ঠিক নয়। উনি তাই কথাটা শেষ করলেন না।
রিখিয়া সোমেনের দিকে চেয়ে বলল—মা তো ঘুমিয়েছে। আপনি এ ঘরে এসে বসুন।
কুকুরের ওপরে আদুরে পা রেখে ভদ্রলোক বসে থাকলেন অক্সিজেন সিলিন্ডারের পাশে। ফিরে ও দেখলেন না, সোমেন আর রিখিয়া কোথায় গেল। কিন্তু এই প্রথম সোমেনের কষ্ট হল লোকটার জন্য। মনে হল, সংসার থেকে লোকটা খুব বেশি কিছু পায়নি। ছেলে বিলেতে, স্ত্রী শয্যাশায়ী, মেয়ে আমল দেয় না। টাকা ছাড়া ওই লোকটার আছে কি? টাকা আর একা। আর বোধ হয় আদর করার জন্য একটা অন্ধ কুকুর।
রিখিয়ার বসবার ঘরে উজ্জ্বল আলো। টক টক করছে লাল উলের মস্ত পা-পোশ। উজ্জ্বল আলোয় এসেই সোমেনের লজ্জা করছিল। বলল—আমি আজ যাই—
—ও মা! কেন?
—রাত হয়ে গেছে।
—ইস্। কী লক্ষ্মী ছেলে! রাত আটটায় রোজ বাড়ি ফেরা হয় বুঝি!
—তা নয়। তোমাদেরও অসুবিধে।
—সেটা আমরা বুঝব। বসুন।
আসলে সোমেনের কেমন একরকম হচ্ছে। এ মেয়েটার বিয়ে হয়ে যাবে, আজ বাদে কাল যে কোনও দিন। প্রথমদিন যেমন একরকমের ভালবাসা বোধ করেছিল, আজ তেমনি একটা হতাশা মাখানো হিংসে হচ্ছে কেবল। মন বলছে—কমরেড, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো ব্যারিকেড।
আজও একই জায়গায় পড়ে আছে অবহেলাভরে সেই পেনট্যাক্স ক্যামেরা। আজ শুধু লেনসের ওপর ঠুলি পরানো।
রিখিয়া হঠাৎ বলে—বাবা একটু ওইরকম।
সোমেন অবাক হয়ে বলে—কীরকম?
—সন্ধের পর বলে—কথাটা শেষ করল না রিখিয়া! আবার বলল—দাদার জন্যই।
মুখোমুখি বসল রিখিয়া। চুমকির শাড়ি আলো পেয়ে এখন আগুন হয়ে ঝলসাচ্ছে। মুখে আজ কিছু প্রসাধন। খোঁপাটা দোকানে বাঁধা, দেখলেই বোঝা যায়। চওড়া ব্যান্ডে বাঁধা বড় ঘড়ি বাঁ হাতে। হাতের তেলোয় একটু বুঝি মেহেদির রং। কী জীবন্ত চোখ। সোমেন চোখ সরিয়ে নেয়। মেয়েদের চোখের দিকে সে এখনও তেমন করে চাইতে শেখেনি।
