গাব্বুকে পড়াতে যায় ঠিকই। মাস—মাইনে হাত পেতে নেয়, অবিকল টিউটরের মতো। অণিমা থাকলে এই হীনমন্যতাটুকু আসত না। মাসে একশো টাকা না পেলেও চলে যাচ্ছিল একদিন। এখন ওই একশো টাকার একটা বাজেট তৈরি হয়ে গেছে মাসে। মায়ের একপো দুধের দাম, নিজের সিগারেট-দেশলাই, লন্ড্রি কিংবা রেস্টুরেন্ট, কিছু পত্র-পত্রিকা। এই দুর্দিনে একশো টাকার টিউশনি ভাবাই যায় না। স্কুল-কলেজ ছেড়ে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। কৃষিবিপ্লবের জন্য গ্রামীণ ভারতে ডাক দেওয়া হচ্ছে ছেলেদের। কলকাতার ছেলেরাও দেয়ালে দেয়ালে সেইসব কথা লিখল ঠিকই, কিন্তু স্কুল-কলেজ ছাড়ল না। পরীক্ষাটাকেই আরও সহজ করে নিল তারা। আগুন বোমা, গুলি আর ছুরি ঝলসে ওঠে চারদিকে। স্কুল-কলেজে ছাত্ররা বই খুলে পরীক্ষায় বসে। এ অবস্থায় প্রাইভেট পড়বে কে, কোন দুঃখে! পাস করা অনেক সহজ হয়ে গেছে এখন। অণিমার দেওয়া টিউশনিটা তাই বড় দুর্লভ বলে মনে হয়।
অন্যমনস্কতার মধ্যেই সেদিন গাব্বুকে পড়িয়ে ফিরছিল সোমেন। এই সব ভাল পাড়ার ভিতরে আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশি। খুব নির্জন। গাছপালার ছায়ায় ঘনায়মান রহস্য। একলা হাঁটতে একটু ভয় করে। কখন নিরালা ফুঁড়ে প্রেতের মতো কয়েকজন এসে ঘিরে ধরবে চারদিক থেকে, ওরা চলে গেলে পড়ে থাকবে সোমেনের লাশ। চারদিক দেখে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে সোমেন আবার মনের মধ্যে ডুবে হাঁটছিল। মনের মধ্যে এক ক্ষ্যাপার তৈরি জগৎ। দুঃখের বা পিপাসার কোনও রং নেই। কিন্তু মনের মধ্যে সেইসব অলীক রঙের আভা ঠিকই ধরা পড়ে। কত কথা ভাবে সোমেন! বুড়োমানুষদের এরকম হয়, আর কিছুই ঘটবে না, তাই তারা অতীতের স্মৃতি নিয়ে থাকে। সোমেনেরও সেই দশা আজকাল। যেন বা, যা ঘটার ঘটে গেছে জীবনে। এখন আছে শুধু তার স্মৃতি। সোমেন আজকাল বড় ভাবে।
সামনেই রাস্তার আলোর স্তম্ভ। তার নীচে গাছের ঘন এবড়ো-খেবড়ো ছেঁড়া ছায়া। সেই ছায়ায় একটা মস্ত লম্বা গাড়ি এসে ধীর হয়ে থামল। পিছনের দরজা খুলে কে যেন নামছে। লক্ষ করার মতোই দামি বিদেশি গাড়ি, অঢেল কালো টাকায় কেনা। সোমেন অবহেলাভরে একবার মুখ তুলে দেখল। গাড়ির পিছনে দামি জড়োয়া গয়নার মতো লাল আলোর অলংকার একবার উজ্জ্বল হয়ে নিল।
আধো অন্ধকারে সোমেন পেরিয়ে যাচ্ছিল গাড়িটা। যে মেয়েটি গাড়ি থেকে নেমেছে সে ঝুঁকে গাড়ির সিট থেকে তার ব্যাগ কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হতেই সোমেনের মুখোমুখি দেখা। এত আবছায়ায় চিনবার কথা নয়। তবু বলল—আরে! আপনি!
রিখিয়া! সচেতন হয়ে সোমেন চেয়ে দেখল, এই তো রিখিয়াদের বাড়ি। সে অন্য মনস্কতায় পেরিয়ে যাচ্ছিল। কোনও ভুল নেই। রাস্তার আলো পড়েছে রিখিয়াদের ঘের-দেয়ালের গায়ে। তাতে আলকাতরা দিয়ে লেখা—প্রতিশোধ, প্রতিরোধ, প্রতিবাদ কমরেড, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো ব্যারিকেড। এই কথাটা রিখিয়াদের দেয়ালে সে তো দেখছে।
চুমকি বসানো কী একরকম শাড়ি পরেছে রিখিয়া, অন্ধকারেও চমকাচ্ছিল।
ভারি অপ্রস্তুত লাগছিল সোমেনের। সে কদিন দাড়ি কামায়নি। পরনে যদিও সেই বড়দির দেওয়া দামি প্যান্ট, আর বউদির দেওয়া শার্ট, তবু দুটোই চৈত্রের ধুলোয় বড় ময়লা হয়ে গেছে। বুকটায় পাখি ঝাপটাল। গলার স্বর হয়ে গেল অন্যরকম। বলল—যাচ্ছিলাম।
এটা কোনও জবাব হল না। রিখিয়া অন্যরকম বুঝল। বলল—কোথায় যাচ্ছিলেন? আমাদের বাড়ি?
যদি সোমেন ‘হ্যাঁ’ বলে এখন তবে হয়তো ভাববে—হ্যাংলা সেধে সেধে বাড়ি আসে। আর যদি ‘না’ বলে, তবে হয়তো ভাববে—ইস্, আমাদের জন্য একটুও ভাবে না তো!
সুসময়ে তো আসতই সোমেন। কিন্তু সুসময় তো আসে না।
সোমেন উত্তর না দিয়ে হাসল। তার সেই বিখ্যাত ভুবনজয়ী হাসিটি। দাড়ির জন্য চিন্তিত ছিল সোমেন। কিন্তু এও জানে, অল্প দাড়ি থাকলে তাকে যুবা বয়সের রবীন্দ্রনাথের মতো দেখায়।
রিখিয়ার কথা বলার সময়ে একটু মাথা নাড়ার রোগ আছে। তাতে ওকে খারাপ লাগে না। এখন মাথা নাড়ল, কানের ঝুটা ঝুমকো ঝিকিয়ে ওঠে। বলে—যাচ্ছিলেন না আর কিছু। আপনি প্রায় সময়েই তো এদিক দিয়ে হেঁটে যান। আসেন না।
—তুমি দেখেছ?
—না দেখলে বললাম কী করে?
—ডাকোনি তো!
—আমি ডাকব কেন? যার আসবার আসবে।
এমন অভিমানের গলায় বলল! ছেলেমানুষ। নইলে অমনভাবে বলে? বুকের মধ্যে তোলপাড় করে ওঠে যে!
সোমেন কবজির ঘড়ি দেখে বলল—সাড়ে সাতটা বাজে। আর একদিন আসব।
—মায়ের খুব অসুখ।
—কী হয়েছে?
রিখিয়া কিন্তু হাসল। বলল—খুব কিছু নয়। মার তো নানারকম। এখন শ্বাসকষ্ট হয়। আর চোখে নাকি ভাল দেখছে না। ডাক্তার বলেছে, রেটিন্যাল হেমারেজ। সব্বাইকে দেখার জন্য পাগল। আপনার মাকে নিয়ে আসার কথা ছিল না? প্রায় সময়েই ননীবালার চুলের গল্প শুনি।
সোমেনের গলার স্বর তীব্র শ্বাসবায়ুর প্রভাবে কেঁপে গেল। বলল—আর একদিন—
রিখিয়া মাথা নাড়ে, বলে—তা কেন? এই তো দু-পা। মা এখনও ঘুমোয়নি।
সোমেনের চোখে পড়ল আবার সেই লেখাটা। কমরেড, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো ব্যারিকেড। দারোয়ান গেটটা খুলে দিল। গাড়িটা আলো জ্বেলে বাঁক নিয়ে ঢুকে যাচ্ছে গ্যারেজে। একটা কুকুর ডেকে উঠল দোতলায়। সোমেন সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলল—চলো৷ শৈলীমাসির কথা আমিও খুব ভাবি।
