সোমেনের শরীরে একটা বিদ্যুৎ স্পর্শ করল হঠাৎ। বাতুলের মতো চেয়ে থেকে সে বলে—কী বলছ অণিমা?
—সত্যি সোমেন। গাড়ি-বাড়িঅলা এক ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে।
সোমেনের বুকটা হঠাৎ বায়ুশূন্য হয়ে যায়। দম নিতে কষ্ট হয় তার। বড় আশ্চর্য ব্যাপার। একটু আগে অণিমা যখন চুমু খেয়েছিল তখন থেকে এই সময়টুকুর মধ্যে তার মনে মনে একটা প্রত্যাশা তেরি হয়েছিল। তার ভিতরে যেন সর্বদাই বাস করে অন্য এক সোমেনের যার সঙ্গে এই সোমেনের ইচ্ছের মিল নেই। সেই অন্য সোমেন বুঝি এই ক্ষণেক সময়টুকুতেই অণিমাকে নিজের বলে চিহ্নিত করে রেখে দিয়েছিল। ভিতরের সেই সোমেনটাই এখন মার খেয়ে মুষড়ে ওঠে।
—তা হলে আজকের ব্যাপারটা কেন করলে অণিমা?
অণিমা ঘন গভীর শ্বাস ফেলে একটা। বলে—তোমাকে জানিয়ে দিলাম যে, জীবনে আমি কত অসুখী হব। ওরকম না করলে তুমি বুঝতে না সোমেন। এখন বুঝবে। মনে রাখবে।
হঠাৎ সোমেন তার ভুবনজয়ী হাসিটা হাসে। বলে—ধ্যাৎ। তুমি ভারি ইমোশনাল, এমন তো ছিলে না?
অণিমাও হাসে। হঠাৎ ডান হাতখানা বাড়িয়ে পাকা জুয়াড়ির মতো গলায় বলে—কুইটস।
সোমেন হাতটা ধরে। বলে—শোধবোধ।
অণিমা হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলে—এসো সোমেন। গাব্বুকে পড়িও। লজ্জার কিছু নেই। সোমেন মাথা নাড়ল।
নির্জন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোমেন ভাবে—অণিমার হাতটা কেন অত ঠান্ডা?
সোমেন বড় অস্থির বোধ করে। অনেক দূর রাস্তা আপনমনে হাঁটতে থাকে। মাথাটা গরম হয়। একবার নিজের থেকেই হেসে উঠল সে। একবার মাথা নেড়ে বলল—আহা রে। এবং প্রথম বুঝতে পারল, অণিমার বিয়ে হয়ে গেলে তার মন খুব খারাপ লাগবে। বড্ড একা লাগবে তার।
কয়েক দিন ধরে মনটা খারাপ রইল সোমেনের। একটি মুহূর্তের ঘটনাটুকুকে কিছুতেই ব্যাখ্যা করা গেল না। বার বার ম্লান জ্যোৎস্নায় অণিমার প্রেত হাসিটুকু মনে পড়ে। বুকটা বায়ুশূন্য হয়ে যায়।
কয়েকদিন গাব্বুকে পড়াতে গেল না সোমেন। খুব আড্ডা দিয়ে বেড়াল এদিক-ওদিক। কিন্তু মনের মধ্যে কেবলই বুকচাপা দম আটকানো কষ্ট হয়। এই বয়সের মধ্যে সোমেন কখনও এমন গভীর কষ্ট ভোগ করেনি। বার বার ভাবে, একটা সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু হয় না। কষ্টটা থেকে যায়। ঘুমের মধ্যেও ছটফট করে সোমেন। যখন জেগে থাকে তখন বড় আনমনা হয়ে থাকে। অণিমা সবই স্পষ্ট করে বলেছে তাকে। তবু সসামেনের বড় ঝাপসা লাগে। মাঝে মাঝে তার পাগলামি করতে ইচ্ছে করে।
আবার একদিন গাব্বুকে পড়াতে গেল সোমেন। যতক্ষণ পড়াল ততক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে রইল, বারবার ফিরে তাকাল দরজার দিকে। অণিমার দেখা পাওয়া গেল না। গাব্বুকে অণিমার কথা জিজ্ঞেস করতে তার ভয় হচ্ছিল, যদি গাব্বু কিছু টের পেয়ে যায়!
দু-চারদিন পড়ানোর পর একদিন ধৈর্য হারিয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলল সোমেন—তোমার দিদিভাই কোথায়?
মোটাসোটা ফরসা আর খুব স্মার্ট ছেলে গাব্বু। চোখে কথা খেলাতে পারে। মিচকি হেসে বলে—আপনি জানেন না! দিল্লি গেছে পিসির বাড়ি বেড়াতে।
সোমেনের আর কিছু বলার থাকে না। সে কেবল ক্ৰমে একজন দুঃখী যুবকের রূপ ধরতে থাকে। একটা চুমু কি ভীষণ ট্র্যাজিক হতে পারে!
এই দুঃখের দিনে আচমকা একটা ঘটনা ঘটে গেল একদিন।
॥ একত্রিশ ॥
আজকাল কেমন বিকেলবেলার মতো বিষয় হয়ে থাকে সোমেনের মন। মনের মধ্যে যেন এক বাসাবদল চলছে। নিজের ঠাঁই ছেড়ে মন চলল কোথায়! চৈত্রের বুক-শুকনো করা গরম বাতাস বয় এখন। সারা গায়ে ধুলো মেখে পিঙ্গল হয়ে থাকে কলকাতা। গাছপালাহীন শানবাঁধানো শহরের আবহে জ্বোরো রুগির গায়ের তাপ৷ দীর্ঘ গ্রীষ্মকাল আসছে। ঋতুর এই পরিবর্তন তেমন লক্ষ করে না সোমেন। অন্যমনস্কতাই তার সঙ্গী আজকাল। একটি চুম্বনে তাকে বিদীর্ণ করে দিয়ে গেছে অণিমা।
মাঝে মাঝে শীত করার মতো শিউরে ওঠে গা। মাঝে মাঝে তাকে চাবুক মারে স্মৃতি। মনে পড়ে সেই পাগল চুমু-খাওয়া। কোনও মানে হয় না। এও কি অণিমার কোনও ইয়ারকি। এক-একবার ইয়ারকি বলে মনে হয়। তখন বুকে একরকমের কষ্ট টের পায়। যখন ভাবে, ইয়ারকি নয়, তখন একরকমের রহস্যের ঘন গন্ধ ভরে ওঠে বুক।
মানুষের ভিতরে এক অনন্ত জগৎ রয়েছে। নিজের ভিতরে ডুবুরির মতো নেমে যেতে সারলে দেখা যায়, এক ক্ষ্যাপা সেখানে আজব শহর-বন্দর তৈরি করে রেখেছে। অকল্পনীয় সব রঙের বুরুশ ঘষে চারদিক রঙিন করে রেখেছে সে। সেখানে অদ্ভুত সব মানুষের আনাগোনা—যাদের আর কোনওদিন পাওয়া যাবে না। সেখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে। নাটকের মতো, বায়োস্কোপের মতো। একটা চুমু-খাওয়া তেমন কিছু আণবিক বিস্ফোরণ নয়, তবু বজ্রপাতের মতো মাঝে মাঝে গর্জে ওঠে সেই চুম্বনের স্মৃতি। মাথার মধ্যে ঝলসে ওঠে নীল ফসফরাস। অণিমা কি তাকে ভালবাসত? নাকি ইয়ারকি করে গেল? তার চব্বিশ পূর্ণ হওয়ার জন্মদিনে ও কীরকম উপহার অণিমার, ক্ষতচিহ্নের মতো চিরস্থায়ী? মনের সেই অলীক ক্ষ্যাপা জগতে অণিমার উষ্ণ শ্বস কুসুমগন্ধের মতো ছড়িয়ে থাকে। নাড়া-খাওয়া গাছের মতো কেঁপে ওঠে সোমেন। শীত করে ওঠে গায়ে কাঁটা দিয়ে এই চৈত্রেও।
অণিমাকে ভালবাসার কথা কখনও তেমন ভাবেনি সোমেন ইদানীং। এখন নাগালের বাইরে গিয়েই কি শতগুণে ফিরে এল অণিমা।
