গোলটেবিলের ওপর অপালার পাশে উঠে বসে সোমেন। ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করে ম্যাক্স কবিতা লেখে? জানতাম না তো।
অপালা মাথা নেড়ে বলে—লেখে। আরও কত কী করে!
বাঙালির চেয়ে কয়েক পরদা গম্ভীর বাজ ডাকার মতো গুরগুরে গলায় ম্যাক্স কবিতা পড়তে শুরু করে। কবিতার নাম—গ্র্যান্ড রেস্টুরেন্ট। ইংরেজি কবিতাটার অর্থ এরকম—আমি একদিন গ্র্যান্ড রেস্টুরেন্টে যাই। তখন সকালবেলা। রেস্টুরেন্টে লোকজন ছিল না। কী চমৎকার সেই দোকানঘর! দেয়ালে দেয়ালে সুরেলা রং। কাচের তৈরি সব জানালা দরজা। মেঝেতে পুরু কার্পেট। একধারে নাচের জায়গা। টেবিল-চেয়ারগুলি কী চমৎকার। সেই সকালেও ব্যান্ড বাজছে রেস্টুরেন্টে। সেই সুর শুনে মনে হয়, পৃথিবীর সব দুঃখ বুঝি ঘুচে গেছে। আমি সেখানে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, মনটা বড় ভাল হয়ে যাচ্ছিল। তারপর আমার একবার ল্যাভেটারিতে যাওয়ার দরকার হলে আমি বেয়ারাকে ডেকে বললাম—তোমাদের ল্যাভেটারি কোনদিকে? লোকটা খুব বিনীতভাবে আমাকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিল ল্যাভেটারিটা, দূর থেকে। আমি ল্যাভেটারির দরজা খুলে ঢুকেই কিন্তু শিউরে উঠলাম। এ কী নরক চারদিকে! মেঝের ওপর পড়ে আছে শেষ রাতের মাতালের বমি, বেসিনের গায়ে ফাটা আর ময়লার দাগ। মেঝেয় জল জমে আছে। আয়নাটা নোংরা। তেমন নোংরা ওদের কমোড। আমি দৌড়ে ফিরে এলাম, সোজা গিয়ে ম্যানেজারের সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলাম—কেন তোমার সামনের দোকানটা এত ঝকমকে? আর কেনই বা তোমার ল্যাভেটারি এত নোংরা? কেন তোমার ল্যাভেটারিটাও নয় তোমার রেস্টুরেতে মতোই পরিষ্কার? আমি এই কথা চিৎকার করে যত বলি, লোকটা তত অসহায়ের মতো বলে—আমি কী করব, তামার কী করার আছে?
কয়েকজন ক্ষীণ হাততালি দিল। বোঝা গেল যে, কেউ কিছু বোঝেনি।
অপালা সোমেনের কানে কানে বলে—কী সব পড়ল রে? বাথরুমটা নোংরা বলে অত রাগ কেন?
সোমেন খানিকটা স্তব্ধ হয়ে বসেছিল। হঠাৎ সম্বিৎ পেয়ে বলল—ওটা আসলে বাথরুম নয়।
—তবে কী?
—সভ্যতার অভ্যন্তর। সভ্যতার বাইরের দিকটাই চকচকে, ভিতরটায় নোংরা জমে যাচ্ছে।
অপালা চোখ বড় বড় করে বলে—বাঃ, তুই তো বেশ কবিতা বুঝিস।
সোমেন মাথা নেড়ে বলে—আমি বেশি বুঝি না, তবে তোরা কিছু কম বুঝিস।
—আমরাও কিছু কম বুঝি না। বলে অপালা বড় বড় চোখে একবার সোমেনের দিকে দেখে নিয়ে মুখটা ফিরিয়ে বলে—মেয়েদের কাছে তোর এখনও ঢের শেখার আছে।
কবিতার মাঝখানে কখন যেন অণিমা ঘরে এসেছে। একটু ঘুরল এদিক-ওদিক। ম্যাক্স যে মোড়ায় বসে আছে তারই পাশে মেঝের ওপর বসল দীনদরিদ্রের মতো। মুখখানা এখনও বুঝি একটু লাল। আর কিছুটা অন্যমনস্ক। সোমেনের চোখে চোখ পড়ল একবার। একটু ক্ষীণ হাসল। চোখ সরিয়ে নিল আস্তে আস্তে। কয়েকটা মুহূর্তের মধ্যেই ওর কি কিছু পরিবর্তন ঘটে গেল? লজ্জা করছিল সোমেনের।
চায়ের আর বিস্কুটের ট্রে নিয়ে চাকর এল ঘরে। সবাই চা নিচ্ছে, ঘরের মাঝখানে একটু হুড়োহুড়ি। কেবল সোমেন চা নিতে উঠল না, অণিমাও নয়। সোমেন ভাবে—আমরা অন্যরকম হয়ে গেলাম। এরকমই কি হওয়া উচিত ছিল? এটা কি স্বাভাবিক! ভাবতে গেলে অস্বাভাবিক কিছু নয়। বয়সের ছেলেমেয়ে, হলে দোষ কী? কিন্তু মনটা কখনও প্রস্তুত ছিল না তো সোমেনের! প্রেম নিয়ে কত ঠাট্টা করেছে তারা। বিপজ্জনক সব ঠাট্টা। মনে কিছু থাকলে কি ওরকম ঠাট্টা করা যায়!
চায়ের পর রিহার্সাল শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু হুল্লোড়ে তা আর হল না। এখন নিছক আড্ডা চলবে। সোমেনের কিছুক্ষণ একা হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল। সকলের অন্যমনস্কতায় সে টুপ করে উঠে পড়ল একসময়। দরজার কাছ বরাবর গিয়ে একবার চোর-চোখে ফিরে তাকাল। দেখল আর কেউ নয়, কিন্তু অণিমা ঠিক অপলক চোখে চেয়ে আছে।
সোমেন মুখটা ফিরিয়ে নিল। বারান্দা পার হয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই অণিমার ডাক শুনতে পেল—শোনো।
সোমেন দাঁড়ায়—কী?
—গাব্বুকে এরপর পড়াবে তো?
সোমেন যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলে—পড়াব না কেন?
অণিমা একটু হেসে বলল—ভয় ছিল, তুমি—তোমার খুব রাগ হয়নি তো!
সোমেন মাথা নেড়ে বলে—না তো! তবে কেমন অন্যরকম লাগল অণিমা।
—বোকা, অন্যরকম আবার কী! তুমি ভারী উলটোপালটা মনের ছেলে।
—এতকাল টের পাইনি তো কিছু।
—সে তোমার বোঝার দোষ। কিছু ভুল হয়নি সোমেন। আমি তোমাকে জানাতে চাইছিলাম। হয়তো কাজটা নির্লজ্জ হয়েছে।
সোমেন মুখ তুলে অণিমাকে দেখল। বেশ সুন্দরীই অণিমা। বয়স সোমেনেরই মতো। তাদের ভালবাসা হতে কিছু আটকায় না। তবু কেন যে সোমেনের মনটা দোমড়ানো কাগজের মতো হয়ে আছে! তাতে অনেক ভাঁজ, অনেক আলো অন্ধকারের ইকড়ি-মিকড়ি। কোথায় যেন আটকাচ্ছে।
—চলি। সোমেন বলল।
অণিমা বুঝি কিছু আকুলতাভরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে বলে—শোনো, আর একটা কথা।
—কী?
—তোমার কোনও ভয় নেই। আমি ভূতের মতো তোমার ঘাড়ে ভর করব না।
—বুঝলাম না আণিমা।
— বলছি। আজ যা করেছি তা একটা স্মৃতিচিহ্নের মতো রইল।
সোমেন অবাক হয়ে বলে—তার মানে?
অণিমা হাসল। আকাশে জ্যোৎস্না রয়েছে। সেই জ্যোৎস্নায় বড় ম্লান দেখাল হাসিটি। বলল—আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বৈশাখে। কাউকে এখনও জানাইনি। তোমাকে জানালাম প্রথম।
