—এসো। বলে হাত বাড়াল অণিমা। সোমেনের হাতখানা ধরল। বলল—এস, দেখিয়ে দিচ্ছি।
সোমেন এত ভয় কখনও পায়নি। অণিমা হাত ধরেছে বলে নয়, অণিমা কাছ ঘেঁষে রয়েছে বলেও নয়। সোমেন লক্ষ করেছে, ওর গলার স্বর বসা, আবেগরুদ্ধ। এসব সময়ে মানুষ গলার স্বর লুকোতে পারে না।
অন্ধকার একটা ঘরে এনে তার হাত ছাড়ল অণিমা। আলো জ্বালল না। বাগানের দিকে একটা মস্ত খোলা জানালা। জানালার ওপাশে হয়তো জ্যোৎস্না, কিংবা ফ্লুরোসেন্ট আলো। সেই আলোয় ছায়ামূর্তির মতো পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে অণিমা ডাকল—সোমেন।
—কী?
—এখন সেই কথাটা বলো।
সোমেন কেঁপে ওঠে। বোঝে যে অণিমা ঠাট্টা করছে না।
৩০. অণিমার সান্নিধ্য
॥ ত্রিশ ॥
অণিমার সান্নিধ্য কোনওদিনই খারাপ লাগেনি সোমেনের। ওকে ভয় পাওয়ারও কিছু ছিল না। খুব ঠান্ডা মাথার মেয়ে অণিমা। সব সময়ে মুখখানা সিরিয়াস করে বিচ্ছুর মতো ইয়ারকি দেয়।
কিন্তু এ অণিমা যেন সে নয়।
অণিমা ফিরে তাকাল। আবছা অন্ধকারে ওর মুখচোখ দেখা যায় না। কিন্তু শ্বাসের শব্দ আসে। অণিমা খুব নার্ভাস আজ! যেন বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, এমনভাবে নাক টানল। বলল—বললে না?
সোমেনের গলার স্বর অন্যরকম হয়ে গেল। সে প্রায় ধরা গলায় বলে—কোন কথাটা? অণিমা জানালার দিকে পিছন ফিরে জানালার গ্রিল-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো তুলে পিছনে মুড়ে জানালার গ্রিল ধরে আছে। ভঙ্গিটা শিথিল, কেমন যেন। বলল সেই কথাটা। যেদিন চাঁদ উঠবে, ফুল ফুটবে, লোডশেডিং থাকবে, সেদিন আমরা দুজন দূরে কোথাও গিয়ে
—ও। বলে হাসল সোমেন। প্রাণহীন হাসি।
— কথাটা কিন্তু কোনওদিনই বলোনি।
—আজ কি বলব অণিমা?
—বলো। কেন, শুনে কী হবে?
—শুনতে ইচ্ছে করছে। কেউ তো কোনওদিন বলেনি।
—যাঃ। তোমাকে অনেকে বলেছে।
অণিমা একটু হাসল, বলল—বললেই বা। তুমি তো বললানি।
—ভয় পেতাম অণিমা। যা মেয়ে তুমি, শুনেই হেসে উঠবে হয়তো।
—নইলে সিরিয়াসলি বলতে?
সোমেন উত্তর দিল না।
একটা ফোঁপানির মতো কাঁপা শ্বাস ফেলে অণিমা বলে—আমি খুব ইয়ারকি করি, না?
আর তৎক্ষণাৎ ঘটনাটা ঘটল বজ্রপাতের মতো। সোমেন জানত না, এতটা হবে।
ঘরের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়েছিল সোমেন, প্রতিরোধহীন। জানালার চৌকো আলোর পরদায় ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল অণিমা। হঠাৎ অণিমার ছায়া খসে পড়ল। নিঃশব্দ, নরম পায়ে অণিমা ছুটে এসে হঠাৎ দুটো জোরালো হাতে সোমেনের দু-কাঁধ খামচে ধরল আশ্লেষে, টেনে আনল নিজের দিকে। অন্ধকারে একটু বুঝি সময় লাগল অণিমার। সোমেনের ঠোঁট দু-খানা খুঁজতে। তারপরই সোমেন দু-খানা তুলোর চেয়েও নরম, উত্তপ্ত, আঠালো ঠোঁটের স্বাদ পেল নিজের ঠোঁটে।
বিশ্বাস হয় না। তবু ঘটনাটা ঘটছে। এমন নয় যে, সোমেন কাউকে কখনও চুমু খায়নি। কিন্তু অণিমা এত অন্যরকম। কী করে হয়! ভেবে কাঠের মতো হয়ে গেল সোমেন। শরীরে থরথরানি, কিন্তু আড়ষ্ট, ভীত। কী গভীর ঝড়ের মতো শ্বাস ফেলল অণিমা তার মুখে। সেই শ্বাসের বাতাস এত গরম যেন চামড়া পুড়ে যায় সোমেনের। অণিমার শরীরের ভিতরে বুঝি জ্বর? ভয়ংকর এক জ্বর! দুই হাতে সোমেন অণিমাকে ধরতে যাচ্ছিল বুঝি। অণিমা তখন সরে গেল আচমকা।
জানালায় ঠিক আগের মতো হয়ে দাঁড়াল। সোমেনের দিকে পিঠ। আস্তে করে বলল—এটা কিন্তু ইয়ারকি নয়।
অণিমার গলাটা ধরা-ধরা। প্রবল শ্বাস। হাঁফাচ্ছে। সোমেন হাতের পিঠে ঠেটি মুছে নেয়। কিছু বলার নেই। জীবনে এরকম কিছু কিছু ঘটনা ঘটে যার কোনও অর্থ হয় না। আর কি কোনওদিন সোমেন ইয়ারকি করতে পারবে অণিমাকে নিয়ে? কেমন যেন মন খারাপ হয়ে গেল সোমেনের। বলল—তুমি পাগল আছ, মাইরি!
অন্ধকারেই অণিমা একবার ফিরে তাকাল তারদিকে। একবার নাক টানল। তারপর খুব সহজ হয়ে একবার বলল—ও ঘরে যাও সোমেন। গাব্বু আজ পড়বে না।
করিডোরটা পার হয়ে সামনের ঘরে আসবার পথটুকুতে সোমেন তার শরীরে অণিমার গন্ধ পাচ্ছিল। অণিমার গায়ে কোনও দামি সুগন্ধী ছিল, মুখে ছিল রূপটান। এসব অণিমা বড় একটা মাখে না। আজ কেন মেখেছিল কে বলবে? সবচেয়ে বেশি সজাগ হয়ে আছে সোমেনের ঠোঁটে অণিমার মুখের স্বাদ। সেই সঙ্গে একটা অনিচ্ছুক, কিন্তু তীব্র কামবোধ। শরীর তো মনের বশ নয়। সোমেনের বুকের মধ্যে একটা ধুকধুকুনি উঠেছে, চোখেমুখে রক্তোচ্ছাস। বাইরের ঘরের আলো আর অনেক চোখের চাউনির মধ্যে এসে দাঁড়াতেই তার বড্ড লজ্জা হতে লাগল।
ঘরের মাঝখানে ম্যাক্স দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা চোথা কাগজ। চোখ দুটোয় নীল আগুন। ওই আগুনের রহস্য আজও ভেদ হয়নি সোমেনের কাছে। ওই নিরীহ রোগা সাহেব লোকটার চোখ ওরকম জ্বলে কেন? কাগজ হাতে ম্যাক্স দাঁড়িয়ে চারধারটা ওই আগুনে-চোখে দেখে নিচ্ছিল।
ঘরের কোণে একটা প্রকাণ্ড গোল টেবিলের ওপর বসেছিল অপালা। ঝুটো হারের লকেটটা মুখে পুরে চুষছে। সোমেনকে বড় বড় চোখের দৃষ্টিতে প্রায় ছ্যাঁদা করে দিল। ঝামরে বলল—কোথায় গিয়েছিলি?
পূর্বা সোফায় অনিল রায়ের পাশে বসে আছে। মুখ ফিরিয়ে বলল—ও তো প্রাইভেট টিউটর এ বাড়ির, জানিস না?
সে কথার কোনও উত্তর দিল না অপালা। বড় স্থির চোখের চাউনিতে তাকিয়ে থেকে বলল—এখানে এসে চুপ করে বোস। ম্যাক্স একটা কবিতা পড়বে।
অনিল রায় হাত তুলে বললেন—চুপ। হাশ্ সায়লেন্স।
