পূর্বা চেয়ারে বসেছিল। উঠে এসে সোমেনের পাশে সোফায় বসে ফিসফিস করে বলল—নাটকটা কিছু বুঝতে পারছি না মাইরি। একটা লোক একদিন মাথা ধরার ট্যাবলেট মনে করে নাকি চাঁদটাকে গিলে ফেলেছিল। সেই থেকে প্রবলেম শুরু তারপর থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, ইউ এন ও সবাই লোকটার কাছে কৈফিয়ত চেয়ে পাঠায়। লোকটার প্রেমিকা আত্মহত্যা করতে চাইছে, আর লোকটা তাকে বিরাট বিরাট বক্তৃতা দিয়ে কী যেন বোঝাচ্ছে। সবাই বলছে, দারুণ নাটক। আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।
সোমেন সমবেদনার স্বরে বলে—ততার মাথাটা নিয়ে আমারও চিন্তায় রাতে ঘুম হয় ড়া।
—যাঃ। বলে পূর্বা হেসে ওঠে।
মিহির বোস নাটকের থিম বোঝাতে বোঝাতে ব্যথিত চোখে তাকায়। পরদা সরিয়ে অনিল রায় উঁকি দেন—আসতে পারি?
সবাই সমস্বরে বলে ওঠে—আসুন স্যার।
অনিল রায়ের হাঁটা দেখেই বোঝা যায়, পেটে ঈষৎ মদ আছে। চোখ দুটো চকচকে লাল; মুখে বেসামাল একটা হাসি। তাঁর সঙ্গে ম্যাক্স! সেও টেনে এসেছে তবে অনেক স্টেডি, আর কিছু গম্ভীর। অনিল রায় সোমেনের কাছে এলে সোমেন উঠে জায়গা ছেড়ে দিয়ে বলে—বসুন স্যার।
—সোমেন না?
—হ্যাঁ স্যার। আপনি আমাকে কেবল ভুলে যান।
অনিল রায় বসে হাসলেন। বললেন—বয়সে পেয়েছে, বুঝলে! সেদিন নিজের ছেলেটার সঙ্গে দেখা এক বিয়েবাড়িতে, প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল আচমকা, চিনতেই পারলাম না। অবশ্য আমাদের ডিভোর্সের সময়ে ওর বয়স কম ছিল। এখন বেশ লম্বা চওড়া হয়েছে। সাত বছর সময় তো কম নয়! তবু চেনা উচিত ছিল। আফটার অল নিজেরই তো ছেলে। শেষে অদিতিই এগিয়ে এসে বলল—অনিল, বাণ্টিকে চিনতে পারছ না! অনিল রায় হাসলেন—কী কাণ্ড বলো!
পূর্বা হিহি করে হাসছিল। অনিল রায় ধমকালেন—কী হল? ও ছুঁড়ি হাসছে কেন? মিহিরের নাটকটা কি খুব হিউমারাস?
অণিমা বলে—না স্যার, হাসিই ওর রোগ। হাসতে হাসতে একদম বেহেড হয়ে যায়।
—না না, ও আমার ছেলের কথা শুনে হাসছে। আজকাল প্যাথেটিক কথাতেও লোকে হাসে। সোমেন, একটা সিগারেট দাও তো।
—নেই স্যার, এনে দিচ্ছি। বলে সোমেন উঠতে যাচ্ছিল। মিহির বোস নিজের সিগারেটের প্যাকেট বের করে এগিয়ে আসে।
—আমার কাছে আছে, নিন।
পূর্বা মুখ তুলে বলে—আজ সারা বিকেল ধরে হাসিটা চেপেছিলাম। এতক্ষণে বেরিয়ে গেল।
অনিল রায় অবাক হয়ে বলেন—কেন?
—নাটকটা স্যার কিছু বুঝতে পারছি না। কেবল হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু অপালা যা গম্ভীর হয়েছিল, হাসতে সাহস হয়নি।
অপালা তার প্রতিমার মতো বড় বড় চোখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বলল—মারব থাপ্পড়। বাথরুমে যাওয়ার নাম করে অন্তত বার দশেক হাসবার জন্য উঠে গেছিস, আমি বুঝে টের পায়নি।
আবার হিহি করে হেসে ওঠে পূর্বা। তার হাসি দেখে সবাই হাসে। অপ্রস্তুত মিহির বোসও হাসতে থাকে সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অকপটে। পূর্বা বলে—তোর হাসি পায়নি অপা?
—পেলেই যেখানে-সেখানে হাসতে হবে নাকি? হাসলে মিহিরবাবু বুঝি আর ফিরে তাকাতেন আমাদের দিকে? নিজের ভবিষ্যৎ কেউ হেসে নষ্ট করে, বলুন স্যার?
সোমেন চাপা স্বরে বলে—জঘন্য।
অনিমা শুনতে পেয়ে বড় বড় চোখে তারদিকে চেয়ে বলে—কী জঘন্য সোমেন?
—তোমরা?
—ওমা! কেন?
—তোমরা জীবনেও কাউকে ভালবাসতে পারবে না। কেবল ইয়ারকি। ঘরে ঢুকে অপালার ভাসবাস দেখে মনে হয়েছিল, মিহির বোসের প্রেমে পড়েছে বুঝি। এ তো দেখছি, এখনও বাঁদরনাচ নাচাচ্ছে।
একটু পা নাচিয়ে অণিমা বলে—ভালবাসার লোককে নিয়ে বুঝি ইয়ারকি করতে নেই! তোমাকে নিয়ে আমি ঠাট্টা করি না?
—ফের? বলে তাকায় সোমেন।
—আচ্ছা বাবা, ঠাট্টা করব না আর। কান ধরছি। সত্যিই অণিমা কান ধরে।
—ও কী রে? চেঁচিয়ে ওঠে অপালা।
—অণিমা ম্লান মুখে বলে—ও ধরতে বলল যে।
—কে?
—ও। বলে ভারী লাজুক ভঙ্গিতে সোমেনকে দেখিয়ে দিয়েই মাথা নত করে অণিমা। সকলে উচ্চকিত হয়ে হাসতে থাকে। সোমেনের কান মুখ গরম হয়ে যায়। পূর্বা দাঁতে ঠোঁট টিপে বলে—তোর বাড়ির টিউটরটার তো ভারী সাহস অণি!
—তুমি আর কেলিও না। বলে পূর্বাকে ধমক দেয় সোমেন।
পূর্বা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে—দেখেছেন স্যার! ওকে আমি সবচেয়ে বেশি ফেবার করি, আর ও সব সময়ে আমাকে ইনসাল্ট করে।
গোলমালটা একটু থিতিয়ে আসে। মিহির বোস তার কভার ফাইল খুলে নাটকের পাণ্ডুলিপি বের করে।
সোমেন উঠে বলে—আমি গাব্বুর ঘরে যাচ্ছি।
কেউ তারদিকে মনোযোগ দিল না। নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে সোমেন প্যাসেজে পা দিল। নীচের তলায় অনেকগুলো ঘর। কেউ থাকে না। ফাঁকা নিঝুম। পায়ে পায়ে এঘর-ওঘর ঘুরে দেখছিল সোমেন। গাব্বু কোনও ঘরেই নেই।
ভিতর দিকে একটা ঢাকা বারান্দার মতো। আলো নেই। প্যাসেজের আলোর ক্ষীণ আভা আসছে। পিছন দিকেও ওদের বাগান আছে। মৃদু গোলাপের গন্ধ আসছে, আর গাছগাছালির বুনো গন্ধ। সোমেন ডাকল—গাব্বু।
কেউ সাড়া দিল না।
পিছন ফিরতেই চমকে গেল সোমেন। পিছনে মৃদু আলো, আবছায়ায় ছায়ামূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে অণিমা। সোমেন হেসে ফেলে বলে—চমকে গিয়েছিলাম। শব্দ করোনি তো।
অণিমা উত্তর দিল না। নড়লও না। কেবল তাকিয়ে থাকল।
সোমেনের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল হঠাৎ। অজানা একটা ভয়। একটা অনিশ্চয়তা। সে সহজ হওয়ার জন্য বলল—গাব্বু কোথায় কোথায় বললে?
