বউদির সঙ্গে খুব একটা কথাবার্তা হয় না আজকাল। সোমেন কথা বলতে আলসেমি বোধ করে। চুপচাপ থাকতেই ভাল লাগে। যেন বা হঠাৎ তার অভিজ্ঞতা বেড়েছে, বয়স হয়েছে, ধীর-স্থির বিবেচক গম্ভীর মানুষ একজন।
চায়ের কথায় বেরোতে গিয়েও ঘুরে এসে সোফায় বসে বলল—দাও।
গ্যাস উনুন থেকে কেটলি নামিয়ে, চা ভিজতে দিয়ে বউদি উঠে এসে বলল—এই প্যান্ট করালে?
—হুঁ।
—বেলবটম করালে না কেন?
সোমেন একটু হাসে। দাদাকে আজকাল বউদি খুব আধুনিক পোশাক পরায়। দাদা স্টাইল বোঝে না। মোটাসোটা মানুষ বলে মানায়ও না কিছু। তবু নির্বিকার মানুষের মতো বউদি যা পরায় তাই পরে।
সোমেন বলল—বেলটম আমার ভাল লাগে না। পায়ের গোড়ালির কাছে একগোছ বাড়তি কাপড় হাতির কানের মতো লটরপটর করবে, সে ভারী বিশ্রি। বোকা-বোকা।
বউদি বলে—দাঁড়াও তো, দেখি।
সোমেন দাঁড়ায়। বউদি চারধারে ঘুরে প্যান্টের ফিটিং দেখে মুখ টিপে হেসে বলে—খারাপ হয়নি। তা অমন সুন্দর বিলিতি কাপড়ের প্যান্টের সঙ্গে কি ওই অখন্দে তিলেপড়া নীল শার্টটা পরে বেরোবে নাকি?
সোমেন পা নাচাতে নাচাতে বলে—এইটাই আমার সবচেয়ে ভাল শার্ট।
—উদো একটা। টাকা দিচ্ছি, আজই একটা সাদা রঙের ইজিপসিয়ান বা টেরিকটন শার্ট করতে দেবে…
সোমেন বাধা দেওয়ার আগেই বউদি ভিতরের ঘরে তোশকের তলা থেকে মুহূর্তের মধ্যে পঞ্চাশটা টাকা এনে প্যান্টের পকেটে গুঁজে দিয়ে বলে—রেডিমেড ভাল পেলে তাও। কিনতে পারো।
সোমেন একটু চুপ করে থাকে। বউদি চা এনে দেয়। চুমুক দিতে দিতে বলে—তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে…
বউদি হেসে ফেলে, বলে—তার মানে?
কাঁধ ঝাঁকিয়ে সোমেন বলে—দয়া ছাড়া গতি কী বলে?
—দয়া নয় ঠাকুরদা, তুমি তো বড্ড বেশি বোঝো?
—দয়া নয়? তবে কী! জয় তোমার করুণা…
—আজ তোমার জন্মদিন।
সোমেন একটু অবাক হয়। বলে—আজ দোসরা ফাল্গুন নাকি?
—হ্যাঁ। কিছুই তো খেয়াল রাখো না। রাতে তোমার দাদা মাংস আনবে, আর ফ্রায়েড রাইস করব। তোমার নিজের এসব খেয়াল না থাকলেও আমাদের থাকে মশাই।
—কত বয়স হল বলো তো?
—পঁচিশে পা দিলে। চব্বিশ পূর্ণ হয়ে গেল।
—পঁচিশ! বলে হঠাৎ বিড়বিড়িয়ে ওঠে সোমেন, কবজি উলটে ঘড়ি দেখে বলে— পঁচিশ! তা হলে তো একদম সময় নেই।
বউদি অবাক হয়ে বলে—কীসের সময় নেই?
সোমেন বউদির মুখের দিকে চেয়ে বলে—খুব তাড়াতাড়ি একটা কিছু করা দরকার বুঝেছ! বয়স বাড়ছে।
বউদি বড় বড় চোখ চেয়ে বলে—বুঝেছি। কিন্তু বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে সেলুন থেকে দাড়িটা কেটে নেওয়ার যেন সময় হয়। ওই প্যান্টটার সঙ্গে তোমার একদম ম্যাচিং হচ্ছে না। লোকে দেখলে ভাববে কার প্যান্ট চুরি করে এনে পরেছ।
সোমেন গাল চুলকোয়, থুতনিতে হাত দিয়ে হাসে। ঘরে ঘুমন্ত বাচ্চাদের মধ্যে কে যেন কেঁদে উঠল। বউদি ও-ঘরে যাওয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে বলল—ফের যেন শোকতাপ পাওয়া বুড়ো ঠাকুরদার মতো চেহারায় না দেখি। মা এসে দেখলে ভাববে তার ছেলেকে খেতে দিইনি কদিন।
সেলুনে দাড়ি কামিয়ে নিল সোমেন। গড়িয়াহাটার ভাল দোকান থেকে দুধসাদা একটা টেরিকটনের শার্ট কিনে নিল। দোকানের ট্রায়াল রুমে ঢুকে পরে নিল শার্টটা। ট্রায়াল রুমটা অদ্ভুত। অন্ধকার ছিল, ভিতরে পা দিতেই পায়ের তলায় চৌকো পাটাতন দুলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে পাখা ঘুরতে থাকে মাথার ওপর। আলো জ্বলে ওঠে। সবই অটোমেটিক। এই সব কায়দার জন্যই বোধ হয় বড় দোকানটায় শার্টটার দাম টাকা দশেক বেশি পড়ল। ফুটপাত থেকে কিনলেই হত।
নিজেকে আয়নায় দেখে খুশি হচ্ছিল না সোমেন। পঁচিশ বছর বয়সের ছাপ পড়ল নাকি মুখে! কোন বয়সের পর যেন মানুষ আর বাড়ে না। কোন বয়স থেকে যেন ক্ষয় শুরু হয়! একটা আবছা ভয় হঠাৎ বুক শুকিয়ে দেয়। যৌবন বয়স তো চিরকাল থাকে না। কিন্তু কত দিন থাকে?
অণিমাদের বাড়িতে গাব্বুর পড়ার ঘরে ঢুকে একটু অবাক হয় সোমেন। সবাই হাজির। অপালা, পূর্বা, অণিমা, শ্যামল, মিহির বোস ছাড়াও ইউনিভার্সিটির কয়েকজন ছেলেমেয়ে, দু-চারজন অচেনাও রয়েছে। একটা চেয়ারের ওপর এক পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মিহির বোস, হাতে নাটকের পাণ্ডুলিপি, মুখচোখ খুব সিরিয়াস। যেমন বোকা বোকা লেগেছিল তাকে প্রথম দিন। এখন আর তেমন লাগছে না। আত্মবিশ্বাসী উচ্চাকাঙক্ষাসম্পন্ন একজন চালাক-চতুর লোকের মতোই দেখাচ্ছিল। অপালা তার দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে।
সে ঘরের দরজায় পরদা সরিয়ে দাঁড়ায়। পূর্বা অণিমাকে ঠেলা দিয়ে অবহেলার সঙ্গে। বলে—তোদের প্রাইভেট টিউটারটা এসেছে, দ্যাখ, অণি!
অণিমা মুখ ফিরিয়ে হাসল। বলল—প্রাইভেট টিউটার ছাড়া আর কী! ওর কোনও উচ্চাকাঙক্ষা নেই।
অপালা মুখ ফিরিয়ে তাকে দেখে ভ্রূ কোঁচকাল।
মিহির বোস একটু নিরস গলায় বলল—আসুন সোমেনবাবু।
সোমেন বুঝতে পারে সবাই তার ওপর রেগে আছে। সোমেনের মৃদু একটু বোকা-হাসি আছে, যা দেখে সবাই ওকে ক্ষমা করে। সেই হাসিটা সে হাসল এখন। ঘরে ঢুকে অণিমার পাশে সোফায় বসে বলে—গাব্বু পড়বে না?
—কী জানি! ও ওদিককার একটা ঘরে শিফট করেছে। এ ঘরটা আপাতত হইচই দলের। এখানে তোমার ভাল না লাগলে গাব্বুর ঘরে যেতে পারো।
সোমেন উত্তর দিল না, বসে রইল। মিহির বোস তার প্রতীক নাটকের থিম বোঝাচ্ছিল। একটু থেমে আবার শুরু করল এখন।
