একদিন সকালে বড়জামাই এসে হাজির। বলল—মা, আমাদের বাড়িতে চলুন।
বুকটা কেঁপে ওঠে, হাত-পা ঝিম ঝিম করে। কষ্টে ননীবালা বললেন—কেন বাবা, কী হয়েছে?
অজিত মুখটা গম্ভীর রেখেই বলে—চলুন নিজেই দেখবেন।
গলা আটকে আসে ননীবালার। শীলুর চোট লেগেছিল পেটে, কোনও অঘটন হয়নি তো! কষ্টে জিজ্ঞেস করেন—শীলুর কিছু হয়েছে?
জামাই লজ্জা পায়। চোখ নামিয়ে বলে—আপনার একবার যাওয়া দরকার। আপনার মেয়ে আপনার জন্য অস্থির।
বীণা নন্দাইকে চা করে খাওয়ায়, খাবার দেয়, দু-একটা ঠাট্টার কথাও বলে। ওদের কারও দুশ্চিন্তা নেই। কেবল ননীবালারই হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁদিয়ে আসে। কতকাল ধরে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেছে ওরা। প্রায় বুড়ো বয়সেই হতে চলেছে সন্তান, যদি কিছু ঘটে তো মেয়েটা জামাইটা শয্যা নেবে। সংসারের সুখ নিবে যাবে।
ননীবালা কথা বাড়ান না। সোমেনের একটা কিটব্যাগে কাপড়চোপড় গোছাতে থাকেন। ছেলেরা কেউ বাড়ি নেই। কাউকে বলে যাওয়া হল না। জামাই তাড়া দিচ্ছে, ঘরদোর কিছু সিজিল-মিছিল করে যাবেন তার উপায় নেই। ননীবালা বাড়ির বার হলেই বীণা ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র হাঁটকে দেখে। কী এক শত্রুতা তৈরি হয়েছে বউটার সঙ্গে! তার ওপর চেক ভাঙিয়ে টাকা তুলতে যে কোনওদিন গোবিন্দপুর থেকে শনিঠাকুরটি আসবেন। আর এক শত্রু। কিন্তু শত্রু হোক আর যাইহোক, তার একটা মর্যাদা আছে। ননীবালা মানুষটাকে যতই মুখ করুন, এ সংসারের আর কেউ তাকে অমর্যাদা করলে ননীবালার বড় লাগে। ননীবালা থাকবেন না, তখন যদি আসে তো ছেলের বউ হয়তো বসতেও বলবে না, আদর আপ্যায়ন করবে না দাঁড়ানোর ওপর বিদায় দেবে। সে লোকও বড় অভিমানী, একটু অনাদর দেখলে নিজেকে সে জায়গা থেকে সরিয়ে নেয়। আর সোমেনের চিন্তা তো আছেই। বাপের মতোই স্বভাব, একটুতে রেগে যায়। মুখ ফুটে কারও কাছে একগ্লাস জল পর্যন্ত চায় না। ননীবালার কাছেই যত আবদার। বয়স্ক খোকা একটি।
এইসব দুশ্চিন্তা করেন ননীবালা, আর ব্যাগ গুছিয়ে নেন। সংসারে শত দড়িদড়া দিয়ে বাঁধা জীবন। কত মায়া, কত চিন্তা, কত নিজেকে দরকারি মানুষ বলে ভাবা! তবু তো সব ছেড়ে একদিন রওনা হতে হয়! কিছু আটকে থাকে না। এসব বুনো বয়সের চিন্তা। আঁচলটায় চোখ মুছে নেন তিনি।
এই যে শীলু আর জামাই ছেলে-ছেলে করে পাগল, তার তো কোনও মানে নেই। হচ্ছে না, সে একরকম। কিন্তু হলেই কি সুখ নাকি? মুখখানা দেখলেই মায়া এসে গেল তো গেলই। আর একটা জীবন ছাড়ান-কাটান নেই। মুখ দেখে সুখ যেমন, আবার জীবনভর দুঃখও কম নাকি! পেটের শত্রুর চেয়ে শত্রু নেই, লোকে বলে—সে মিছে কথা নয়। বাপ-পা যত ভালবাসে ছেলেমেয়েকে ছেলেমেয়ে কোনওকালে উলটে ভালবাসে না তত। নিজেকে দিয়েই জানেন। রণেন, শীলু হওয়ার পর জগৎসংসার যেন ওদের মধ্যেই বাসা বাঁধল, ভালবাসা নিঙড়ে নিল। আবার এখন রণেনকে দেখেন, ছেলেপুলে নিয়ে কত চিন্তা, কত ভালবাসা!
ননীবালা বীণাকে ডেকে বললেন—যাই।
—আসুন। বলে বীণা প্রণাম করল।
বড় ভাল লাগল ননীবালার। পিঠে হাত রেখে গভীর মনে আশীর্বাদ করলেন। এরা ভালবাসা নিতে জানে না, জানলে, ননীবালা যে কত ভালবাসতে পারেন তা দেখতে পেত।
॥ উনত্রিশ ॥
ননী, ছেলেকে পাঠিয়েছিলি, কিন্তু নিজে তো কই একদিনও এলি না। বগুড়ার কথা বলব এমন মানুষ পাই না। সেই আমাদের বগুড়ার ছেলেবেলার সাক্ষী কেই বা আছে! একা পড়ে আছি কতকাল। তোকে পেলে কত কথা যে বলব! তোর ছেলেটা বড় লাজুক, আজকাল আসে না তো! ওকে সঙ্গে নিয়ে আসবি। কবে মরে যাই কে জানে? সকলের জন্য বড় মায়া হয় আজকাল। আসিস….
মার চৌকিটা ন্যাড়া হয়ে পড়ে আছে। বিছানাটা গোটানো, তার ওপরে শতরঞ্চির বেড়। চৌকির ওপর ধুলোর আস্তরণ পড়েছে। তোশকের নীচে গুঁজে রাখা অনেক টুকিটাকি কাগজ, লন্ড্রির বিল, পুরনো চিঠি তার মধ্যে শৈলীমাসির দেওয়া চিঠিটাও পড়ে আছে। মা এখনও বড়দির বাড়ি থেকে আসেনি। দুদিন ধরে পড়ে আছে চিঠিটা, মার কাছে পৌঁছে দিয়ে আসা হয়নি। থাকগে। এমন কিছু জরুরি চিঠি নয়।
কেমন একটা বিষন্ন ঋতু এসেছে এখন। শীতের টান শেষ হয়ে বাতাস ভেপে উঠেছে ক্রমে। সাঁঝ সকালে অন্ধ কুয়াশা আর ধুলো ঢেকে রাখে চারধার। কলকাতার পচনের ভ্যাপসা গন্ধ চাপ হয়ে বসে থাকে শহরের বুকে। মন বড় আনমনা। ভাল লাগে না। কিছু ভাল লাগে না।
গতকালও অণিমার সঙ্গে দেখা, মুক্ত অঙ্গনে ওরা নাটক করবে। মিহির বোস নাটক লিখেছে, পরিচালনাও তার। নাটকের দল তৈরি হয়ে গেছে, দলের নাম হইচই। সোমেনকে একটা পার্ট নেওয়ানোর জন্য ঝুলোঝুলি। সবশেষে বলল—বড্ড অহংকারি তুমি। অহংকার সবাইকে মানায় না সোমেন।
একটু কি রেগে গিয়েছিল অণিমা! কিন্তু সোমেনের ওসব ছেলেমানুষি আর ভাল লাগে না। বয়স বাড়ছে। গেস্ট কিন উইলিয়ামসে ঢুকে গেল চিত্তপ্রিয়। আই সি আইতে ডি গ্রেড কেরানির চাকরি পেয়ে গেছে হেমন্ত। সত্যেন তার বাড়িতে টিউটোরিয়াল খুলে পয়সা করছে। সোমেনেরও একটা কিছু করা দরকার। কিছু করার জন্য হাত-পা নিশপিশ করে। কিন্তু শূন্য কাজে বেলা কেটে যায়।
দুপুরে ঘুমিয়ে উঠে নতুন প্যান্টটা পরে বেরোতে যাচ্ছিল সোমেন, বউদি ডেকে বলল—চা করছি, খেয়ে যাবে নাকি!
