—আর কিছু বলল না?
—হুঁ। ছেলে বিলেতে মেম বিয়ে করেছে, আর আসবে না, সেজন্য খুব দুঃখ করল। বলল—ছেলে তো আপন হল না, এখন দেখি জামাই যদি আপন হয়। ছেলে লিখেছে, ভারতবর্ষ ভিখিরির দেশ, ওখানে মানুষ থাকতে পারে না। লন্ডনে ষাট হাজার পাউন্ডে বাড়ি কিনেছে। গাড়িটাড়ি তো কিনেছেই।
—ও আবার কেমন ছেলে! ননীবালা দুঃখ পেয়ে বলেন।
মিটমিটে হেসে সোমেন বলে—আমি যেমন!
—তোর সঙ্গে কীসের তুলনা? ননীবালা অবাক হয়ে বলেন—তুই আমার কোলপোঁছা ছেলে। এখনও বিপাকে পড়লে কেমন মা-মা করিস!
—সে সবাই করে। আবার সুযোগ পেলে কেটেও পড়ে। আমিও তো বাসা ছাড়ার প্ল্যান করছি, তুমি তো জানোই। একই ব্যাপার।
ননীবালা অবহেলা ভরে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন—হুঁ! তুই আবার যাবি!
—যাবই তো। সোমেন তেমনি হাসিমুখে বলে—শুধু যে বাসা ছাড়ব তা নয়, দেশও ছাড়তে পারি।
—তার মানে?
আমার এক বন্ধু জার্মানিতে চাকরি করে। সে লিখেছে, আমাকে ওখানে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে।
—গিয়ে কী করবি?
সোমেন আধশোয়া হয়ে বলে—চাকরি করব আর তোমাকে টাকা পাঠাব।
—অমন টাকায় আমার দরকার নেই। ননীবালা বলেন—আগে শুনতাম লোকে পড়াশুনো করতে বিলেত-টিলেত যায়। আজকাল দেখি সবাই যায় চাকরি করতে।
সোমেন চিত হয়ে শুয়ে ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে বলে—তো এদেশে চাকরি না পেলে কী করবে?
ননীবালা বেশি কথা বলেন না। কেবল গলায় একটা ক্ষীণ নিরুদ্বেগের ভাব ফুটিয়ে বলেন—বেশ, যাবি তো যা না! বিদেশে গেলে ছেড়ে তো দিতেই হবে। যতদিন এদিকে আছিস ততদিন বাইরে কোথাও না থাকলেই হয়।
সোমেন উত্তর দিল না। সিগারেট টানতে টানতে কী যেন ভাবে।
ছেলেটাকে ভয় পান ননীবালা। দুই ছেলের মধ্যে, বলতে নেই, এই ছেলেটার প্রতিই ননীবালার পক্ষপাতিত্ব একটু বেশি। কোলের ছেলে, একটু বেশি বয়স পর্যন্ত বুকের দুধ খেয়েছে, সংসারে আছে একটু কম জোরে। দেওয়া-থোওয়া করতে পারে না তো। সংসারে দেওয়া-থোওয়া করতে না পারলে আদর হয় না। সেই জন্যই অসহায় ছেলেটার দিকে তাঁর টান বেশি। কিন্তু এ ছেলেটাই তাঁকে একদম পাত্তা দেয় না। ডাকখোঁজ করে বটে, কিন্তু দড়ি-আলগা ভাব। জাহাজ যেন জেটিতে ঠিকমতো বাঁধা নেই। জলের ঢেউয়ে নড়েচড়ে দোল খায়। বুঝিবা যে কোনও সময়ে ভেসে চলে যাবে। ওর মনটা কি একটু শক্ত? মায়াদয়া একটু কি কম! চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে ননীবালা ভাবেন। সংসারে কেউ তো কারও নয়। বুড়ো বয়সে এইসব টের পাওয়া যায়।
আজকাল চলে-যাওয়ার একটা বাতাস এসেছে দুনিয়ায়। হুটহাট শুনতে পান, তরতাজা ছেলেরা সব বিলেত বিদেশে চলে যাচ্ছে। ছেলেধরা যেমন খেলনা বা লজেঞ্চুস দেখিয়ে ছেলে ভুলিয়ে নিয়ে যায়, এও তেমনি। গুণী ছেলেদের টেনে নেয় সাহেবরা। বড়জামাই অজিতের বন্ধু লক্ষ্মণকেও টেনে নিয়েছে ওইরকম। সে আর আসবে না। জমিটা তাই সস্তায় পাওয়া গেল। কিন্তু জমির কথা আর ভাবেন না ননীবালা। মাথার মধ্যে শৈলী, শৈলীর মেয়ে, বিলেত বিদেশ, সোমেন, সব জট পাকিয়ে যায়। আর মনে হয়, পৃথিবীটা মস্ত বড়, কূলহারা অথৈ, ছেলেবেলায় মনে হত যতদূর দেখা যাচ্ছে ততদূর পর্যন্ত পৃথিবীটা সত্যিকারের। তার পরের পৃথিবীটা ভূতপ্রেত দত্যি-দানোর রাজত্ব। বুড়ো বয়সে সেটাই আবার মনে হয়। চেনাজানার বাইরে পৃথিবীটা জিনপরি দত্যি-দানোর হাতে। ঘরের ছেলেকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ডেকে নিয়ে যাবে।
ননীবালা শ্বাস ছাড়েন, থাক সবাই নিজেদের মনে সুখে থাক। যেখানে খুশি থাক।
—বাতি নেবাব মা? সোমেন জিজ্ঞেস করে।
—হুঁ। বলে ননীবালা শুয়ে পড়েন। শরীরটা আজ বড্ড খারাপ। রক্তের চাপ খুব বেড়েছে। সকালে একবার ডাক্তারের কাছে যাবেন কাল।
কলকাতার শৌখিন শীত শেষ হয়ে এল। বাতাসে চোরা গরম টের পাওয়া যায়। খবরের কাগজে মহামারীর কথা লেখে। খুব ধুলো ওড়ে চারদিকে। এ শহরে কেন যে তেমন শীত পড়ে না ননীবালা বোঝেন না। মানুষ বেশি বলে সকলের গায়ের ভাপে শীত কমে যায় না কি! কিংবা সেই যে অ্যাটম বোমা ফাটিয়েছিল, তাইতেই শীত পালিয়ে গেছে। কথাটা একদিন সোমেনকে বলেছিলেন, সোমেন ধমকেছিল। ছেলেটা বড্ড বকে তাঁকে। শীতের। জন্য একরকম দুঃখ হয়। শ্বশুরবাড়িতে সেই কোন ভোরে উঠে কাঠের জ্বালে রোগা ছেলের জন্য কালোজিরে চালের ভাত বসাতেন। চারধারে পৃথিবীটা কী হিম, কী কনকনে ঠান্ডা! নাকে চোখে জল আসত, হাড়ের ভিতরে ব্যথিয়ে উঠ শীত। বাগানে কপির পরতে, পালংয়ের পাতায় কুয়াশা জমে থাকত। জলের ফোঁটা গড়িয়ে নামত টিনের চাল থেকে। বাচ্চাদের গায়ে গরম জামাটামা জুটত না, খাটো খাটো মোটা সুতির চাদর জড়িয়ে ঘাড়ের পিছনে গিট বেঁধে দেওয়া হত, দেখতে হত ছোট ছোট পা-অলা পাশ বালিশের মতো, সারা উঠোন দৌড়ে বেড়াত। রোদ যতক্ষণ না উঠত ততক্ষণ সিঁটিয়ে থাকত হাত পা, আঙুল অবশ হয়ে বেঁকে যেতে চাইত। গরমে গরম হবে, বর্ষায় বৃষ্টি, শীতে শীত এই জেনে এসেছেন এতকাল। কিন্তু কলকাতার ধারা আলাদা। এখানে সারা বছরই কেমন একরকমের ভ্যাপসা গরমি ভাব। মানুষের গায়ের তাপ, কিংবা অ্যাটম বোমা কিছু একটা কারণ আছেই। ছেলেরা বোঝে না। বহুকাল হয়ে গেল এ শহরে, তবু ঠিক আপন করতে পারলেন না জায়গাটাকে। মায়া জন্মাল না। কেবলই মনে হয়, আমার দেশ আছে দূরে, এখানে প্রবাসে আছি। অথচ তা তো নয়। কলকাতাতেই সবচেয়ে বেশি সময়টা কাটল জীবনের, ভগবান করলে এখানেই বাড়িঘর হবে, এখানেই গঙ্গা পেয়ে যাবেন। তবু কেন যে এটাকে নিজের জায়গা বলে ভাবতে পারেন না!
