ননীবালা ভয় পেয়ে বলেন—আমাকে শীলা বলেছে তুই নাকি ওদের বাসায় কদিন থাকতে চেয়েছিস!
—তার মানে কি বাসা খোঁজা! দিদির বাড়িতে ভাই গিয়ে থাকলে ভিন্ন বাসা হয় নাকি।
—না হয় ভুল বুঝেছি, রাগিস কেন?
রাগব না! বাবাকে সংসারের সব কেলেঙ্কারি জানানোর দরকার কী? বাবার না জানলেও চলত।
ননীবালা একটু কঠিন হওয়ার চেষ্টা করে বলেন—তাকে জানাব না কেন? সে কি তোদের পর?
রাগী ছেলেটা ফুঁসে উঠে বলে তখন—পর কি না সেকথা জিজ্ঞেস করতে তোমার লজ্জা হয় না?
এ কথার উত্তরে কিছু বলার নেই, ছেলেরা বড় হলে আলাদা বোধ বুদ্ধি হয়। মায়ের শেখানো কথা তোতা পাখির মতো বলেছে এক সময়ে এই ছেলেই। এখন সংসারের নানা দাঁড়ে বসে নানা কথা শিখেছে। বোধ হয়, বাপের ওই দূরে দূরে থাকা ছেলেটার ভাল লাগে না। বোধ হয় ছেলেটা বাপের জন্য খোঁড়ে মনে মনে আর সেজন্য দায়ী করে রেখেছে ননীবালা আর রণেনকে।
তবু সেজন্য ছেলেটার ওপর রাগ হয় না ননীবালার। বরং আলাদা একটা গভীর মায়া জন্মায়। সে লোকটাকে ভালবাসার কেউ তো নেই আর। ছেলেমেয়েরা পর, বউ চোখের বিষ। যদি এই ছেলেটার টান থাকে তবে ব্রজগোপালের ওইটুকুই আছে। ছেলের ভিতর দিয়ে তার বাপের প্রতি একরকম আবছা কী যেন ভাব টের পান ননীবালা। বোধ হয় বুড়োবয়সের জন্যই।
একেই কি বুড়োবয়েস বলে!
আজ ননীবালা রাতে শোওয়ার সময়ে একটু সেধে কথা বলেন ছেলেটার সঙ্গে। বলেন—হ্যাঁরে, চাকরির কিছু হল না?
—কী হবে!
—শৈলীর কাছে আর একবার গেলি না! মুখচোরা ছেলে, নিজে না পারিস আমাকে একদিন নিয়ে যাস। কতকাল দেখি না।
—গিয়েছিলাম আর একদিন। সোমেন নরম গলায় বলে।
—গিয়েছিলি? কী বলল?
সোমেন বড্ড সিগারেট খায় আজকাল। একটার আগুন থেকে আর একটা ধরিয়ে নিয়ে বলল—বলার অবস্থা নয়।
—কেন?
—ওরা খুব ব্যস্ত।
—কীসে ব্যস্ত? শৈলীর শরীর খারাপ নাকি!
—না, শুনলাম মেয়ের বিয়ের ঠিকঠাক হচ্ছে। তাই নিয়ে ব্যস্ত। বলে সিগারেটটা পুরো খেয়ে ফেলে দেয় সোমেন।
॥ আঠাশ ॥
ননীবালা অবাক হয়ে বলেন—ও মা! সে তো গুয়ের গ্যাংলা মেয়ে শুনেছি! ওইটুকু মেয়ের বিয়ে দেবে!
কেমন নিরাসক্ত গলায় সোমেন বলে—ওইটুকু আবার কী! তোমার কত বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল?
ননীবালা শ্বাস ফেলে বলেন—সে তখন জ্ঞানবুদ্ধি হয়নি। কিন্তু আমাদের আমলে যা হত তা কি আজকাল হয়? তার ওপর বড়লোকের মেয়ে, আদুরে, এত তাড়াতাড়ি তাকে বিদায় করবে কেন শৈলী!
—সে তোমার শৈলীই জানে!
এই বলে সোমেন আবার সিগারেটের জন্য হাত বাড়ায়।
ননীবালা বলেন—এক্ষুনি তো খেলি? বুকটা শেষ করবি নাকি! ওসব বেশি খেলে কী। যেন সব রোগ বালাই হয়, লোকে বলে।
—কিছু হবে না। এই বলে অস্থির হাতে আবার দেশলাই জ্বালে সোমেন।
আর তখনই ননীবালা ছেলের মধ্যে একটু গোলমালের গন্ধ পান। কী যেন হিসেবে মিলছে না।
সময়ের একটু ফাঁক রাখেন ননীবালা, তারপর আস্তে করে জিজ্ঞেস করেন—হ্যাঁ রে, শৈলীর মেয়ে দেখতে-শুনতে কেমন?
—কেন?
—এমনিই জিজ্ঞেস করছি, শৈলী দেখতে বেশ ছিল, একটু হাবা মতন ছিল অবিশ্যি। মেয়েটা কেমন?
—কালো।
—চোখমুখ?
—ভালই। আলগা চটক আছে।
—তোর সঙ্গে কথাটথা বলল না?
—বলবে না কেন? এ কী তোমাদের আমলের মেয়ে পুরুষের সম্পর্ক নাকি?
ননীবালা বললেন—তা নয়। বলছিলাম, বড়লোকের মেয়ে বলে দেমাক নেই তো!
—থাকলেই বা, কে পরোয়া করে!
এটা উত্তর নয়। রাগ। ননীবালা বুঝলেন। একটু ছায়া মনের মধ্যে খেলা করে গেল। বুড়ো বয়সে সব মনে পড়ে। ছেলেবেলায় তিনি কতবার শৈলীর পুতুলের সঙ্গে নিজের পুতুলের বিয়ে দিয়েছেন। এখন যদি বুড়োবয়সে পুতুল খেলার ইচ্ছে হয়? ভাবতেই একটু শ্বাস বেরিয়ে যায় বুক থেকে। তাই কি হয়! শৈলীরা কত বড়লোক। জজের বাড়িতে জন্মেছে, বিয়েও হয়েছে আর এক মস্ত বড় ঘরে। সুখ ছাড়া আর কিছু কি ওরা জানে! ননীবালার ঘরে কী আছে? ওই তো ছেলে, চেহারাটি কেমন রোগার মধ্যে তিরতিরে সুন্দর। বলতে নেই। থুঃ থু! অমন সুন্দর ছেলেটা তাঁর সারাদিন ছন্নছাড়ার মতো ঘোরে। কোন বাড়িতে বুঝি একটু পড়ায়। ব্যস। এ ছাড়া কোনও কাজ নেই। এই ছেলে কবে দাঁড়াবে, কবে তার বিয়ের কথা ভাববেন তা বুঝতে পারেন না তিনি। বড় রাগী আর অভিমানী ছেলে। শৈলীর মেয়ে ওকে আবার তেমন কিছু বলেনি তো!
ননীবালা হঠাৎ একটু আদুরে গলায় বলেন—ওরে ছেলে, আমাকে একবার শৈলীর বাড়ি নিয়ে যাবি? সে যে খুব দেখতে চেয়েছিল আমাকে!
—বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর যেয়ো। এখন ওই ঝঞ্ঝাটের মধ্যে গিয়ে লাভ কি? কথাবার্তা বলতে পারবে না, সবাই ব্যস্ত।
—বিয়ের পাকা কথা হয়ে গেছে?
সোমেন একটু ঝাঁঝ দিয়ে ওঠে—অত জানি না।
রাগ দেখে ননীবালা দমেন না, সুর খুব নরম করে বলে—ধমকাস না বাবা। মরে যদি তোর ঘরে জন্মাই ফের, তবে তো শাসনের চোটে দম বের করে দিবি। মা হয়ে বকা খাচ্ছি, মেয়ে হয়ে তো খাবই।
সোমেন হাসে হঠাৎ। বলে—মরতে বলেছে কে?
—বলতে হয় না, হঠাৎ কার কখন মেয়াদ শেষ হয়। তা শৈলী তোকে বিয়ের কথা কী বলল?
—বলবে আবার কী! বাবাকে বাসে তুলে দিয়ে সেদিন হাতে সময় ছিল। গিয়েছিলাম। দেখি, বাড়িতে বেশ কিছু লোকজন। সবাই ব্যস্ত। শৈলীমাসির ঘরেও কয়েকজন বসে আছে। আমাকে দেখে খুব আদর করে বসাল, অনেক মিষ্টি খাওয়াল। বলল—বাবা, রিখির বিয়ে দিচ্ছি। ফাল্গুনে, নয়তো বৈশাখে। তোমাকে বলা রইল কিন্তু।
