আজকাল বড় ভুল হয়ে যায়। নাতি-নাতনির নাম ঠিকঠাক মনে থাকে না। সোমেনকে শতবার রণো বলে ডাকেন, চাবির গোছা কোথায় রেখেছেন মনে থাকে না। তবু শিশুবেলার কথা কেন স্পষ্ট মনে থাকে!
একেই কি বুড়োবয়েস বলে!
আজকাল একা থাকলে এই বুড়োবয়সটাই জ্বালায়। তাই দুপুরে ঘুমান না বড় একটা। শরীর খারাপ থাকলে পড়ে থাকেন বটে, কিন্তু বড় শাস্তি। ক্ষণে ক্ষণে উঠে জল খান, পান মুখে দেন, বেলা ঠাহর করেন জানালায় দাঁড়িয়ে। ছেলেপুলেরা ইস্কুল থেকে ফেরে দুপুরে। বীণার কড়া নিয়ম, বেলায় খেয়ে বাচ্চারা ঘুমোবে, যাতে সন্ধেবেলায় পড়ার সময়ে কারও ঢুলুনি না পায়। সবাই ঘুমোয় বলে নিঃঝুম বাড়িটা ফাঁকা আর বড় হয়ে যায়।
এমনি এক দুপুরে কড়া নড়ল। কত কেউ আসতে পারে। ননীবালা ঝিমুনি ভেঙে উঠে বসতেই পেটে অম্বলের চাকা নড়ে উঠল। বুকটা ধড়াস ধড়াস করে।
—কে? বলে উঠে এলেন কষ্টে।
বাইরে থেকে সাড়া এল—পিওন। রেজিষ্ট্রি চিঠি আছে।
ব্রজগোপালের টাকা এল বোধ হয়। বুকটা খামচে ওঠে হঠাৎ। আনন্দে না দুঃখে ঠিক বুঝতে পারেন না তিনি। দরজা খুলে অল্পবয়সি পিওনকে বললেন—কার চিঠি?
—ব্রজগোপাল লাহিড়ি।
—উনি তো নেই এখানে, দূরে থাকেন। আমি সই করে নিলে হবে? উনি আমার স্বামী।
পিওন একটু ভাবে। তারপর একরকম অনিচ্ছের সঙ্গে বলে—নিন।
উত্তেজনায় কলম খুঁজতে ঘরে ঢুকে খুঁজে পান না ননীবালা। ভীতকণ্ঠে বলেন—দাঁড়াও বাবা, কলম-টলম খুঁজে পাচ্ছি না, একটু দাঁড়াও।
পিওন হেসে বলে—কলম নিন না, আমার কাছেই রয়েছে।
পিওন ছেলেটা সই করার জায়গা দেখিয়ে দেয়, ননীবালা গোটা গোটা বাংলা হরফে দস্তখৎ করার চেষ্টা করেন। অক্ষরগুলো কেঁপে যাচ্ছে, জ্যাবড়া হয়ে যাচ্ছে। এই প্রথম একসঙ্গে অনেকগুলো টাকা এল হাতে। ব্রজগোপালের টাকা। বিশ্বাস হতে চায় না।
পিওন ছেলেটা চিঠি দিয়ে ক্ষণকাল বোধ হয় বকশিশের জন্য অপেক্ষা করে। তারপর চলে যায়। ননীবালা দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে আসেন। শরীরটা বড় খারাপ করেছে আজ। বুকটা বশ মানছে না। বুকের ধুকধুকুনিটা যেন হঠাৎ একটু থেমে আবার হঠাৎ আছড়ে পড়ছে বুকের ভিতর।
অনেক টাকা। অনেক। খামটা খুলে চেকটার দিকে চেয়ে থাকেন। টানা হাতের লেখাটা বুঝতে পারেন না। একটা খোপের মধ্যে সংখ্যাটা লেখা। দশ হাজারের চেয়ে অনেক বেশি। একটা বাড়ি উঠে যাবে না এতে? খুশি হবে না সবাই?
বোধ হয় হবে। তবু বুকের ভিতরটা কী একরকম যেন লাগে। এতকাল এই টাকা ক’টার পথ চেয়ে বসেছিলেন ননীবালা। টাকা তুলে ব্রজগোপাল তাঁর হাতে দেবেন তিনি ছেলেদের হাতে। জমিটা রেজিষ্ট্রি হবে। ছেলেদের আর ছেলের বউয়ের কাছে ননীবালার মুখরক্ষা হবে। এই সংসারে তিনি আর একটু জোরের সঙ্গে ভারের সঙ্গে থাকতে পারবেন।
কিন্তু তাই কি হয়! হয় না। বীণা খুশি হবে না, রণোটাও কি খুশি হবে!
ননীবালা চেকটা পিকদানির নীচে চাপা রেখে শুলেন একটু। শরীর ভাল না, মন ভাল না। চোখে হঠাৎ জল আসে কেন যে! মনে হয়, সংসারে কেউই আসলে কারও নয়, এই যে একা দুপুরে মন-খারাপ হয়ে পড়ে থাকা, দিনের পর দিন, কাছের কেউ থাকলে এ দশা হবে কেন তাঁর। কেন এমন ভার লাগে দিন! সময়ের চাকা ঘোরেই না যেন।
একেই কি বুড়োবয়েস বলে!
চেকটা আর একবারও হাতে নিলেন না তিনি। পিকদানির নীচে সেটা চাপা রইল। জানালা দিয়ে হাওয়া আসছে, তাতে ফরফর করে পাখা নেড়ে চেকটা জানান দিতে লাগল সে আছে। ননীবালা একটু বেশি সময় ধরে কাঁদলেন আজ। ঘুম হল না। ঠিকে ঝি কড়া নাড়তে চোখ মুছে উঠলেন।
সন্ধেবেলা রণেন এলে তাকে ডেকে চেকটা হাতে দিলেন ননীবালা, কেবল বললেন—দুপুরে এসেছে।
রণেন খুশি হবে না, এমনটাই আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু রণেন খুশি হল, চেকটা টেবিলে চাপা দিয়ে রেখে, জুতো মোজা খুলতে খুলতে সত্যিকারের খুশি হয়ে বলে—এসেছে! যাক, বাঁচা গেল। কালই অজিতকে খবর দেব। লক্ষ্মণের কোন পিসেমশাই খুব ঘুরঘুর করছেন জমির জন্য।
ননীবালা কথা বললেন না, শরীরটা বশ নেই। এ-বেলা বীণা রান্নাঘর সামলাচ্ছে, তিনি ছুটি নিয়েছেন। বীণা কৌতূহল দেখাল না। রান্নাঘরেই বসে রইল। তার এই চুপ করে থাকা, ওই গা-আলগা ভাব দেখে মনে মনে বড় কাহিল লাগে ননীবালার। শ্বশুরের টাকায় তার কোনও আগ্রহ নেই। গ্রাহ্য করে না।
গা ঘেঁষে ক্ষুদে নাতিটা দাঁড়িয়ে আছে। বলল—ঠানু, মশা কামড়াচ্ছে। কোলে নাও।
তাকে কোলে নিলেন ননীবালা। আঁচলে পা ঢেকে শিশু শরীরটায় গায়ের ওম্ দিতে দিতে মনটা হালকা হল। সংসারে এই বিচ্ছুগুলোকে ভগবান পাঠিয়ে দেন মানুষের মনের ধুলোময়লা ভাসিয়ে নিতেই বোধ হয়।
সোমেন আজকাল অনেক রাতে ফেরে। কোলের ছেলেটা ধাঁ করে ভিন্মানুষ হয়ে উঠেছে আজকাল। কথা বলেই না। কারও সঙ্গেই না। কেবল ভাইপো-ভাইঝির সঙ্গে একটু-আধটু। ননীবালা জানেন, ও অন্য জায়গায় বাসা খুঁজছে। শীলার বাড়িতে গিয়ে একদিন জানতে পেরেছেন। কাউকে বলেননি কিছু। কিন্তু বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, তাঁর আঁচলে বাঁধা ছেলেটা এ সংসার থেকে বার হতে চাইছে।
সেদিন ব্রজগোপাল এসেছিলেন, যাওয়ার সময়ে সোমেন গেল সঙ্গে। টিউশনি সেরে রাতে ফিরে এসে সে কী চোটপাট ননীবালাকে—তুমি কেন বাবাকে বলেছ যে আমি আলাদা বাসা খুঁজছি। তুমি জানলে কোত্থেকে?
