—কেন?
—এই যে নয়নতারার ওপর ভর করল! গাঁ গঞ্জে সবাই বলাবলি করছে।
ব্রজগোপাল বিরক্ত হন। উত্তর দেন না। কালীপদটা কিছু বোকা। বোকা না হলে কেউ ঘরজামাই থাকে। জামাই হয়েও বহেরুর বন্ধু লোক, একসঙ্গে বসে গাঁজাটাজা খায়। এখানেই গেঁথে গেছে।
কালীপদ আবার বলে—চুরির দায়টা ঘাড়ে নিয়ে গেল, তার ওপর অপঘাত!
ব্রজগোপাল একটা গম্ভীর ‘হুঁ’ দিয়ে হাঁটতে থাকেন।
কালীপদ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে। তারপর হঠাৎ গুণ গুণ করে গান ধরে—কে হে বট, বাঁশের দোলাতে চইড়ে যাইচ্ছ চইলে শ্মশান ঘাটে! তোমার পোটলাপাটলি রইল পইড়ে, জুড়ি গাড়ি কে হাঁকাবে…
তুলসী গঙ্গাজলের ছিটে গায়ে দিয়ে ব্রজগোপাল ঘরে এসে ল্যাম্পটা জ্বালেন। জামাকাপড় ছেড়ে শুয়ে পড়বেন। রাতে খই আর দুধ খান, আজ সেটাও খেতে ইচ্ছে করছে না। বাচ্চাকাচ্চা কাউকে ডেকে দুধটা দিয়ে দেবেন বলে উঠতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় আঁধার ফুড়ে বহেরু এসে দরজায় দাঁড়াল। উদ্ভ্রান্ত চেহারা। বলল—কর্তা!
—কী রে?
বহেরু মেঝের ওপর বসে মুখ তুলে বলে—কলিকালের কি শেষ হয়ে আসছে?
ব্রজগোপাল বহেরুর দিকে চিন্তিতভাবে চেয়ে থাকেন।
বহেরু বলে—যদি রক্তবৃষ্টি হয়! যদি পৃথিবী ডেবে যায় মাটির ভিতরে!
॥ সাতাশ ॥
অবশেষে একদিন দুপুরে কড়া নড়ে উঠল।
বীণা ভিতরের ঘরে এ সময়টায় দরজা বন্ধ করে ঘুমোয়। ননীবালা খুটুর-খাটুর করে কাজকর্ম করেন। একটু শুয়ে চোখ বুজবেন তার উপায় নেই, ঝিম হয়ে পড়ে থাকলেই নানা অঘটনের চিন্তা আসে মাথায়। ঘুম যদি আসে তো সেই সঙ্গে দুঃস্বপ্ন দেখা দেয়।
কদিন হল শরীরটা ভাল না। মাঝে মাঝে মাথাটা পাক দেয়। প্রেসারটা বেড়েছে বোধ হয়। পাড়ার চেনা ডাক্তারের কাছে সময়মতো গেলেই প্রেসার দেখে দেয়। আলিস্যিতে যাওয়া হয় না, এ বয়সে ভালমন্দ যদি কিছু হয়ে যায় তো হোক। তাতে তাঁর আক্ষেপ নেই। বেঁচে থাকা একরকমের শেষ হয়েছে। দেখতে না দেখতেই একটা জীবন কেমন শেষ হয়ে গেল। তেমন করে কিছু বুঝতেই পারলেন না ননীবালা। এই তো সেদিনও শিশুটি ছিলেন, বগুড়ায় রেলস্টেশনের ধারে তাঁদের পাড়ার রাস্তায় ঘাটে খেলে বেড়িয়েছেন, ধারে-কাছের কথা তেমন মনে পড়ে না, কিন্তু শিশু বয়সের কথা মনে পড়ে ঠিকই। স্পষ্ট, যেন বায়স্কোপের ছবি। বিন্দি, কাতু, শৈলী—সব মিলেমিশে সে এক পরির রাজ্য। বৃষ্টি পড়ত, শীতের কুয়াশা ঘিরে থাকত, রোদ উঠত—সবই কেমন অদ্ভুত গন্ধমাখা, নতুন বুক-কেমন-করা। সে আমলে মেয়েদের লেখাপড়ার চাপ ছিল না। কেবল সারাদিন শিশু ভাই বা বোন টানতে হত। সে তেমন খারাপ লাগত না। নাজিরের বারান্দায় থুবা করে বসিয়ে রেখে চুলে আলগা হাতে বড় খোঁপা বেঁধে এক্কা-দোক্কার কোর্টে ঝাঁপিয়ে পড়া তারপর কিছু মনে থাকত না। ঘামে ভিজে যেত অঙ্গ, গায়ে ধুলোবালি লাগত, নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠত দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসে, তবু খেলার কী যে নেশা ছিল! একদিন দেড়-বছরের বোকা ভাইটা বারান্দা থেকে গড়িয়ে পড়ে কপাল ফাটাল, মা মেরেছিল খুব চিরুনি দিয়ে। এখনও যেন কনুইয়ের হাড়ে ব্যথাটা চিনচিন করে। মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা সব। শৈলী নাকি বুড়ো হয়ে গেছে! হায়রে! কতটুকু ছিল শৈলী। ঢলঢলে চেহারা, ফরসা ঠোঁটদুটো একটু বোকাটে ভাবে ফাঁক হয়ে থাকত সব সময়ে, সামনের দাঁতে একটা ফাঁক ছিল মাঝখানটিতে। সাহেবি সব নাম ছিল ওদের। চার বোন ছিল মাইথলী, মেয়রা, পিকলি আর বিউটি, দুই ভাই ছিল শচীন আর বুয়া। শৈলীর ইস্কুলের নাম ছিল বিউটি। বিলিতি ফ্রক পরত, বিলিতি সাবান মাখত, বিলিতি বিস্কুট খেত, ওদের বাড়িতে আসত সব সাহেব মেম। জজের বাড়ি, না হবেই বা কেন! যে কোনও মেয়ের সঙ্গে শৈলীরা মিশত না। কেবল ননীবালার চুল দেখে ইস্কুলে সেধে ভাব করেছিল শৈলী। সেই ভাব থেকে সই। এসব কি গতজন্মের কথা! নৌকোর মতো দেখতে ঝকঝকে পালিশওয়ালা একটা ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে শৈলী আর পিকলি তাঁদের বাড়িতে এসে কতবার একটা বেলাই কাটিয়ে গেছে হয়তো। আবার ননীবালাও গেছেন। ভারী চপচাপ বাড়িটা ছিল ওদের, সে বাড়িতে কুকুর পর্যন্ত গম্ভীর। জজ নাকি হাসে না। তা হবে। শৈলীর বাবাকে কখনও হাসতে দেখেননি ননীবালা। কিন্তু সেই জজসাহেবও একবার ননীবালার খোলা চুল দেখে বলেছিলেন—বাঃ, এ তো অরণ্য! মনে আছে। সব স্পষ্ট মনে আছে, গলার স্বরটা পর্যন্ত কানে বাজে এখনও। সেই স্বপ্নের ছেলেবেলা থেকে এক হ্যাঁচকা টানে কোনও অচেনা, অকূল পাথারে রওনা হলেন একদিন। তখনও তাঁর শরীরটুকু ঘিরে শিশুরই গন্ধ, ভাল করে ভাবতে শেখেননি, বুঝতে শেখেননি। খুলনা থেকে বর এল, টোপর পরে। সে কি ভয়াবহ হুলুধ্বনি, শঙ্খনাদ! বুকের ভিতরে ভূমিকম্প, ভেঙে পড়ছে পুতুলের ঘর, ফাটল ধরে গেল এক্কা-দোক্কার কোর্টে, ছিঁড়ে গেল জন্মাবধি মা-বাপের ভাই-বোনের শক্ত বাঁধন। যেন রশি ছিঁড়ে স্টিমার পড়ল দরিয়ায়। অচেনা একদল লোক লুটেরার মতো ঘিরে নিয়ে চলল তাঁকে, আঁচল বাঁধা একটা অচেনা লোকের আঁচলে, কত কান্নাই কেঁদেছিলেন ননীবালা! সে কান্না যেন ফুরোবার নয়। হিক্কার মতো উঠতে লাগল অবশেষে। ব্রজগোপাল চোরের মতো অপরাধী চোখে চেয়ে দেখছিলেন তাঁকে গোপনে। অবশেষে ননীবালা ভারী অবাক হয়ে দেখেছিলেন, তাঁর অচেনা স্বামীটি উড়নির প্রান্ত দিয়ে লুকিয়ে চোখের জল মুছছে। সেই দেখে খানিকটা ধাতস্থ হয়েছিলেন। ননীবালা, যা হোক একেবারে পাষণ্ডের হাতে পড়েননি। মনটা নরম-সরম আছে। ফুলশয্যার রাতে কথাটা উঠতে ব্রজগোপাল প্রথমে স্বীকার করেননি, পরে অনেক ঝুলোঝুলি করলে লাজুক মুখে বলেছিলেন—কী জানো, কান্না দেখলে আমার কান্না পায়। কথাটা ঠিক নয়। ননীবালা জানেন, ব্রজগোপাল কান্না দেখে কাঁদেননি। ননীবালার জন্যই কেঁদেছিলেন। এসব কি বহুদিনের কথা!
