একজন বিধবা দাওয়ায় একটা ছোট্ট মাদুরের আসন পেতে কাছে এসে বলল- ঠাকুরমশাই, আপনি বসুন গিয়ে।
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। বসবেন না।
বিধবাটি বলে—কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন! ওদের আসতে দেরি আছে।
শোকের বাড়িতে একটা অদ্ভুত হবিষ্যির ঘি ঘি গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। এটা বহুবার লক্ষ করেছেন ব্রজগোপাল। আর বাতাসে একটা মৃদু সূক্ষ্ম জীবাণু সংক্রমণের মতো অশুচিতার স্পর্শ।
মেঘুর ছেলেরা পিসির পাশে গিয়ে বসল খানিক। বড়জনকে ব্রজগোপাল বলতে শুনলেন—ও পিসি, শ্মশানে আমাকে দিয়ে কী করবে? বাবার মুখে আমি আগুন দিতে পারব না।
পিসি উত্তর দেয় না। মেয়ে দুজন হুড়মুড় করে উঠে আসে বাইরে। অস্ফুট রামনাম করে। শ্মশান আর বাবার কথা শুনে ভয় পেয়েছে। বেঁচে থাকতে মানুষ আপন, মরে গেলেই ভূতকে ভয়।
ব্রজগোপাল জরিপ করে দেখেন। মেঘু এই ছেলেপুলে, বিধবা বোন, দুটো তক্তপোষ, ভাঙা বাড়ি, গোটা দুই অকেজো আলমারি এইসবই রেখে গেছে। এই দুর্দিনে মেঘু ডঙ্কা মেরে চলে গেল। গেছে খারাপ না। ভোগেনি, কাউকে ভোগায়নি। পড়েছে, আর মরেছে। কিন্তু এ দৃশ্যটা মেঘু যদি দেখত! দাউ দাউ কুপির আগুন আবছায়া তার রক্তের সন্তান, তার শোকাতাপা বোনটা কেমন শীতবাতাসে, সামনের দীর্ঘ অভাবগ্রস্ত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে ভয়ে-ভাবনায় মোয়া বেঁধে বসে আছে মানুষের পিণ্ডের মতো! মেঘুটার আক্কেল ছিল না। এতকটা প্রাণীকে সে কখনও গ্রাহ্য করেনি। ভালবাসার বউ মরে গিয়ে ভগবান ভবিতব্য সব কিছুর ওপর ক্ষেপে গিয়ে একটা পরিবার লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল।
অবশ্য মানুষ তার সন্তান-সন্ততির জন্য কীই বা রেখে যেতে পারে! ব্রজগোপাল তাঁর মামাবাড়ির কথা মনে করেন। দাদামশাই তাঁর এগারোটি সন্তানের জন্য যথেষ্ট রেখে গিয়েছিলেন। ঢাকা শহরে বাড়ি, বঙ্গলক্ষ্মীর শেয়ার, আটাচাক্কি, বগুড়ার লোনব্যাঙ্কে টাকা, নগদ আর সোনাদানায় আরও লাখ দেড় দুই; সে আমলের টাকার দামে এখনকার আরও বেশি। বড় দুই মামা কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো সম্পত্তিটা ফুঁকে দিল। বাপ মরার পর তাদের বড়লোকি চালচলন বেড়ে গিয়েছিল হাজার গুণ। মেজোজন রেলের চাকরি ছেড়ে বাপের টাকায় ব্যাবসা দিল। ব্যাবসার বারফাট্টাই ছিল খুব, পিছনে না ছিল নিষ্ঠা, না পরিশ্রম অন্য মামা মাসিরা তখন নাবালক! বড় হয়ে তারা দেখে, চারদিকে দুঃখের সংসার। সেই যে ভাইয়ে ভাইয়ে বখেরা লেগে গেল তা শেষজীবনতক মেটেনি।
ব্রজগোপাল ভাবেন, মানুষ কী রেখে যেতে পারে সন্তানের জন্য? এমনকী আছে যা নষ্ট পায় না, ঠকবাজে ঠকিয়ে নিতে পারে না, যা স্থায়ী হয় এবং বর্মের মতো ঘিরে রক্ষা করে মানুষের সন্তানকে?
কালীপদ লুকিয়ে বিড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। একটু কেশে বলে—ঠাকুরমশাই, এখন মেলা করবেন নাকি?
ব্রজগোপাল চিন্তিত মুখে বলেন—দেরি যখন হচ্ছে তখন আর কতক্ষণ দাঁড়াব! চল।
এই বলে টর্চটা একটু জ্বালেন ব্রজগোপাল। অন্ধকারের মধ্যে চারপাশটা একটু দেখে নেন। পৃথিবীটা ঘোর অন্ধকার হয়ে আসছে ক্ৰমে। ছেলেপুলের কথা বড্ড মনে পড়ে। ছোট মেয়েটা বহুকাল দেখেন না। মেয়েটা বড় বাপভক্ত ছিল।
এ সব কথা মনে হলে পৃথিবীটা অন্ধকার লাগে। টর্চবাতিটা জ্বেলে অন্ধকারটা তাড়ানোর চেষ্টা করেন ব্রজগোপাল। কেশে নিয়ে কমফর্টারটা খুলে আবার গলায় জড়িয়ে নেন। মেঘুর বোন উঠে আসে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে মুখটা ঘোমটায় আড়াল করে কী যেন বলে। ওর গলা ভেঙে বসে গেছে, আওয়াজ হচ্ছে না। ব্রজগোপাল দু-পা এগিয়ে বলেন—কিছু বলছ মা?
মেঘুর বোন মাথা নেড়ে কষ্টে স্বর বের করে বলে—দাদা বড় পাপী ছিল। আপনাকে কেবল দেবতার মতো দেখত। শ্রাদ্ধটা আপনি করবেন।
—শ্রাদ্ধ! ব্রজগোপাল অবাক হন। ইতস্তত করে বলেন, ওসব তো আমি করিই না মা।। আচ্ছা, দেখব। শরীর গতিক যদি ভাল বুঝি তো…
—দাদার খুব ইচ্ছে ছিল কোনও সৎ ব্রাহ্মণ যাতে শ্রাদ্ধ করে। বউদি সতীলক্ষ্মী ছিল। তার কাছে পৌছুতে হলে পুণ্যি লাগে। দাদা বড় পাপী ছিল।
পাপী ছিল। ছিল বই কী। ঠাকুরের একটা কথা আছে, রক্ষা থেকে যা পাতিত করে তাই পাপ। জীবনধর্মের বিরুদ্ধে চলা যদি পাপ হয় তো মেঘু পাপী নিশ্চয়ই। সঠিক ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকাটা ধর্ম বলো ধর্ম, পুণ্য বলো পুণ্য। ব্রজগোপাল এই শোকের বাড়িতে দাঁড়িয়েও মনে মনে হাসেন। সৎ বিপ্রের হাতে কি চাবিকাঠি আছে যে এ-পাড় থেকে কল টিপে ওপাড়ের আত্মাদের একের সঙ্গে অন্যকে মিলিয়ে দেবে? একটু দীর্ঘশ্বাসও ফেলেন ব্রজগোপাল। মেঘুটা তার বউকে সত্যি ভালবাসত। সবাই চায়, মরার পর মেঘু তার বউয়ের সঙ্গে মিলেজুলে থাক।
ব্রজগোপাল আর কালীপদ গোবিন্দপুর ছেড়ে বরাবর খামারবাড়ির দিকে হাঁটা দেওয়ার পর মাঝ রাস্তায় হরিধ্বনি কানে আসে। উলটোদিক থেকে হারিকেন আসছে। সামনে মাচানের ওপর মেঘুর শরীরটা। ব্রজগোপাল রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ান। চোখের সামনে দিয়ে ভাসতে ভাসতে মেঘু চলে যায়। কালীপদ জোড়হাত কপালে ঠেকায়। হারিকেন কোকার হাতে। সে একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে লণ্ঠন তুলে বলে—বামুনজ্যাঠা!
—হুঁ।
—আমি শ্মশানে যাচ্ছি।
—যা।
ভক করে মদের গন্ধ ভেসে আসে। ব্রজগোপাল উদ্বিগ্ন বোধ করেন।
আবার হাঁটতে হাঁটতে কালীপদ পিছন থেকে হঠাৎ বলে, ঠাকুরমশাই, মেঘু ডাক্তারের গতিমুক্তি হল না তা হলে?
