নয়নতারা মুঠো করে ধুলো তুলে চারদিকে ছিটিয়ে দিতে থাকে। বলে—থুঃ, থুঃ…সব অন্ধকার হয়ে যা, সব শ্মশান হয়ে যা…
অবাক ভাবটা আর নেই। তার বদলে শরীরে একটা থরথরানি উঠে আসে বহেরুর। শীতটা জোর লাগে। সে একবার তার বাঘা গলায় ডাক ছাড়ে—তারা! ভাল হবে না বলে দিচ্ছি!
শুনে খলখল করে হেসে ওঠে নয়নতারা, বলে—শ্মশান হয়ে যাবে, বুঝলি! সব বসে যাবে মাটির নীচে। রক্তবৃষ্টি হবে।
ফ্যাকাশে বেলাটা যাই-যাই করেও দাঁড়িয়ে আছে। চারধারে পাতাঝরা গাছের কঙ্কাল দুর্ভিক্ষের মানুষের মতো রোগা হাত-পা ছড়িয়ে ঘিরে আছে। রং নেই, সৌন্দর্য নেই। একটা দাঁড়কাক ডাকছে খা-খা করে।
বহেরু চোখের জল মুছে নিল। জীবনে তার চোখ বেয়ে জল নেমেছে বলে মনে পড়ে না। এই বোধ হয় প্রথম। পাথর থেকে জল বেরিয়ে এল। চারধারে বড় অলক্ষণ। বহেরু ধরা গলায় ডাকল—মা! মাগো!
নয়নতারা আকাশের দিকে দু-হাত তুলে কাকে যেন ডাকতে থাকে—আয়! আয়!
শরীর শিউরে ওঠে বহেরু। কোন পিশাচ, ভূতপ্রেত, কোন ভবিতব্যকে ডাকে মেয়েটা! নাকি মরণ ডাকছে প্রাণভরে!
বহেরু আর ভাবল না। ইটটা তুলল ফের। তার প্রকাণ্ড হাত, হাতে অসুরের জোর। দু-পা এগিয়ে ‘মা’ বলে একটা হাঁফ ছেড়ে ইট-টা সই করে দিল সে।
লাগল বাঁ-ধারে স্তনের ওপরে। পাখি যেমন জোরালো গুড়ুল খেয়ে গুড়ুলের গতির সঙ্গে ছিটকে যায়, তেমনি নয়নতারাকে নিয়ে ইটটা ছিটকে গেল। ব্যথা-বেদনার কোনও চিৎকার দিল না নয়নতারা। কেবল মাটিতে পড়ে খিঁচুতে থাকে। তার হাত পায়ের ঘষটানিতে ধুলো ওড়ে!
একটু দূরে দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে বহেরু দৃশ্যটা দেখতে থাকে। ফাঁকা জায়গা দিয়ে একটা হলদে শেয়াল দৌড়ে গেল চোর-পায়ে। পিছনের শিমুল গাছে একটা বড় পাখি নামল ঝুপ করে। কিছুক্ষণ নড়েচড়ে নয়নতারা স্থির হয়ে পড়ে থাকে। চারধারে বেঁটে বেঁটে আগাছা, ন্যাড়া জমি।
এইখানে শান্তিরামের ভিটে ছিল একসময়। বংশটা মরে হেজে গেছে। জমিটার দক্ষিণ অংশটা বহুকাল দখল করে আছে বহেরু। বাকিটা পড়ে আছে, দাবিদার নেই। সন্ধ্যা ঘুলিয়ে উঠছে চারধারে। প্রেতছায়া ঘনিয়ে আসে। কঙ্কালসার গাছের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে শেয়ালের চোখ। মগডাল থেকে নজর দিচ্ছে বড় কালো পাখি। শান্তিরামের পোড়ো ভিটেয় অশরীরীরা হাওয়া বাতাসে ফিসফাস করে।
বহেরু নয়নতারার ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখে, মেয়েটা গলাটানা দিয়ে পড়ে আছে। গোরুর ঝিমুনিরোগ হলে এরকম পড়ে থাকে। শিবনেত্র, মুখে গ্যাঁজলা। শ্বাস বইছে, তবে কাঁপা-কাঁপা দীর্ঘশ্বাসের মতো, ফোঁপানির মতো, হিক্কার মতো। ডানকাত হয়ে আছে। বহেরু তাকে আস্তে উলটে চিৎ করে শেয়াল। নিজের যুবতী মেয়ের নগ্ন শরীরটা এতক্ষণ মানুষের মতো চেয়ে দেখেনি বহেরু। রাগে অন্ধ হয়েছিল। এইবার দৃশ্যটা দেখে লজ্জায় চোখ বুজে জিভ কাটল। কোমর থেকে চাদরটা খুলে ঢাকা দিল শরীর। কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিল যত্নে। আগেই মেয়েটা পড়ে গিয়েছিল কোথাও, ঠোঁটটা কেটে ফুলে আছে। রক্ত গড়াচ্ছে। চোখের জল মুছে, মুখের লালা জড়ানো ঠোঁটে একবার অস্ফুট ডাকল—মা! মাগো!
তারপর পাঁজাকোলে শরীরটা তুলে নিল সে।
চারধারে বড় অলক্ষণ দেখা যাচ্ছে আজকাল। কলির শেষ হয়ে এল নাকি!
পরের দিন। মেঘুর মড়া পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। তার শরীরে বিষক্রিয়া পাওয়া যায়নি, চোট একটু-আধটু যা ছিল তা আলের ওপর থেকে পড়ে গিয়েও হতে পারে। অতিরিক্ত কড়া মদেই কমজোরি কলজেটা গেছে। পেটে বিদঘুটে আলসার ছিল। হার্টের রোগ ছিল, কিডনি ভাল ছিল না। সব মিলেজুলে গ্রহদোষে খণ্ডে গেছে। শুদ্ধ মুক্ত মেঘু কি এখন অন্তরীক্ষে তার বউয়ের পাশটিতে গিয়ে বসেছে! কলজেটা কি এবার ঠান্ডা হয়েছে তার? বউ মরার শোকেই না অমন পাগল হয়েছিল মেঘু! মরার পর ক্ষ্যাপা লোকটার সব শান্তি হয়েছে কি!
ব্রজগোপাল মেঘুর উঠোনের মধ্যেখানে দাঁড়িয়ে এসব ভাবেন। পাশে কালীপদ উবু হয়ে বসে হাতের পাতার আড়াল দিয়ে বিড়ি টানছে। গাঁয়ের ছেলেরা গেছে মেঘুর মড়া আনতে। যখন-তখন এসে পড়বে।
বারান্দায় ঠেসান দিয়ে মেঘুর বাল-বিধবা বোনটা বসে আছে। মৃত্যু সংবাদ পেয়ে পাড়া-প্রতিবেশীরা কিছু এসেছিল। আজ মড়া আসবে শুনে দু-চারজন এসেছে। একটা কুপি জ্বলছে দাউ দাউ করে, তার আগুনে দু-একজন ভূতুড়ে চেহারার সাদাটে বিধবাকে দেখা যায়। ছেলেপুলেরা কেউ তেমন কচিটি নয় মেঘুর, সবচেয়ে ছোট ছেলেটার বয়সই হবে সাত-আট বছর। বড় জনের বছর বারো বয়স। গোবিন্দপুরের হাটে তাকে বখে-যাওয়া ছেলেদের সঙ্গে বিড়ি খেতে ব্রজগোপাল নিজের চোখে দেখেছেন। কাপড় জড়িয়ে সেই ছেলেদুটো এখন শীতে ঠকঠকিয়ে কাঁপছে ছাঁচতলায় দাঁড়িয়ে। দুটি মেয়ে মেঘুর। অভাব দুঃখ কষ্টের মধ্যেও তাদের বাড় বিস্ময়কর। আট-দশ বছরের মধ্যেই দু-জনের বয়স হবে। মাথায় বেশ লম্বা, শরীরও কিছু খারাপ না। ঘরের মধ্যে মাদুরে শুয়ে দু-জন কাঁদছিল। একবার উঠে এসে উঠোনের দরজা দিয়ে রাস্তার দিকে দেখে আসছে।
সবচেয়ে বেশি শোকটা লেগেছে বাল-বিধবা বোনটারই। ছেলেমেয়েগুলোর বয়স কম, এ বয়সের শোক গভীর হয় না, জলের দাগের মতো, বিস্মৃতির ভাপ এসে মুছে দেয়। কিন্তু বোনটার আলো নিবে গেছে। পৃথিবীটা এখন বিশাল, দিকহারা, অনিশ্চয়। কদিন এত কেঁদেছে যে আর কাঁদার মতো দম নেই। চুপ করে বসে আছে। ব্রজগোপাল কুড়িটা টাকা দিয়েছিলেন হাতে। দুটো দশ টাকার নোট এখনও দুমড়ে পড়ে আছে পাশে। আঁচলে বাঁধার কথাও খেয়াল হয়নি।
