জাড়ের সময় প্রায় শেষ হয়ে এল। উত্তরে কাঁটাঝোপের জঙ্গলে একটিও পাতা নেই। গাছের কঙ্কাল কাঁটা আর ডালপালা মেলে সুভুঙ্গে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকটায় শ্মশান দেবে বলে ঠিক করে রেখেছে, তাই চাষ দেয়নি। সাপখোপ আর শেয়ালের আড্ডা হয়ে আছে। বহেরুগাঁয়ে এ পর্যন্ত মরেনি কেউ। তাই শ্মশানটা কাজে লাগেনি। কাকে দিয়ে বউনি হবে তা বহেরু ভেবে পায়নি। আজ একবার উদাস চোখে চেয়ে দেখল জঙ্গলটার দিকে। সাঁওতাল লোকটা আর কদিনের মধ্যেই যাবে।
সন্ধের মুখে পশ্চিম দিকের আকাশে এক পোঁচড়া সাদাটে কুয়াসা আলোটাকে ভণ্ডুল করে দিয়েছে। দুনিয়াটা কেমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। শুকনো মাঠঘাট থেকে একটা ধুলোটে হাওয়া উঠে চারপাশের রং মেরে দিল। আর সেই ফ্যাকাশে আলোয় কাঁটাঝোপের মধ্যিখানে একটা মেয়েছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বহেরু। প্রথমে ভাবল কাঠকুটো কুড়োতে এসেছে কেউ। কত আসে! পরমুহূর্তেই বুঝতে পারে, মস্ত চুলের রাশি এলো করে দাঁড়িয়ে আছে কে এক এলোকেশী! পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানো। কয়েক কদম এগিয়ে বহেরু ভারী চমকে যায়। মেয়েছেলেটা ল্যাংটা। বুক পর্যন্ত গাছপালায় আড়াল থাকায় এতক্ষণ ঠাহর হয়নি। অচেনা মানুষ নয়, তা হলে কুকুরগুলো খ্যাঁকাত।
—কোন শালি রে! বলে দাঁত কড়মড় করে বহেরু। বাঁদরটাকে নিঃশব্দে ছেড়ে দিয়ে গায়ের চাদরটা কোমরে পেঁচিয়ে নেয় সে। সত্তর বছরের ঋজু শরীরটায় রাগ যেন যৌবনকাল এনে দেয়। মড় মড়াৎ করে আগাছা ভেঙে বহেরু চোটেপটে এগোয়। একটা হাতের থাবা চুলের মুঠিটা ধরার জন্য উদ্যত হয়ে আছে।
সাড়া পেয়ে মেয়েটা হেলা ভরে ফিরে তাকায়। আর তৎক্ষণাৎ ভেড়া হয়ে যায় বহেরু। এ যে তার মেয়ে, নয়নতারা!
ঘোলাটে দুখানা চক্ষু। তাতে আঁজি আঁজি সোনালি আভা। কপালে মস্ত তেল-সিঁদুরের টিপ। মোটা দু-খানা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। মানুষখেকো পেতনির মতো খোনাসুরে বলল—খবর্দার, কাঁছে আসবি না। আমি বামুন জাঁনিস।
বহেরু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে। ওপরে ঘোলা ময়লা একটা আকাশ, চারধারে কুয়াশার আস্তরণ পড়ে যাচ্ছে। আলো, রংমরা এক বিটকেল বেলা। কাঁটাঝোপের ফাঁকে আঁকাবাঁকা অন্ধকার। নয়নতারা ভিন-জগতের জিনপরির মতো দাঁড়িয়ে।
বহেরু জিজ্ঞেস করে—কে তুই? নয়নতারা?
—নয়নতারাকে খাঁব। আমি মেঘু ডাক্তার।
রাগে মাথাটা হঠাৎ বাজপড়া তালগাছের ডগার মতো জ্বলে ওঠে। দুই লাফ দিয়ে এগিয়ে যায় বহেরু—হারামজাদি, দুই চটকানে তোর ভূত যদি না ভাগাই তো…
—খবর্দার! বলে একটা বুকফাটা চিকার দেয় নয়নতারা। তারপর হঠাৎ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে থাকে। যম-নখের মতো কাঁটা ওঁত পেতে আছে চারধারে। কাঁটায় যেমন কাপড় ফেঁসে যায় ফ্যাঁস করে, তেমন ছিঁড়ে ফেঁসে যাচ্ছে গায়ের চামড়া। বুক ছিঁড়ে হাপর হাপর শ্বাস। নয়নতারা তবু লঘু পায়ে দৌড়োয়, চেঁচিয়ে বলে—ধরবি তো মেয়েটাকে শেষ করে ফেলব!
বহেরু কাঁটাগাছ চেনে। তার গায়ে পিরান, কোমরে চাদর, পরেনে ধুতি। কাঁটায় কাঁটায় সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে থাকে। কাঁটা খিমচে নিচ্ছে চামড়া, মাংস। বহেরু দৃকপাত করে না। দাঁতের ভিতর দিয়ে কেবল একটা রাগি সাপের শিসানীর শব্দ তুলে সে এগোয়।
মাঝখানে কয়েকটা বুড়ো খেজুর গাছ। তার চারপাশে একটু খোলা জমি। ভাঙা ইট, পাথর আর সাপের খোলস পড়ে আছে। একটা মজা ডোবা, তার গায়ে শেয়ালের গর্ত। মেঠো ছুঁচো কয়েকটা দৌড়ে গেল। জায়গাটা গহীন, বাইরের কিছু নজরে আসে না। নয়নতারা সেখানে পৌঁছে গেল প্রথমে।
বহেরু গাছগাছালি ভেঙে সেখানটায় পা দিতে না দিতেই নয়নতারা আধখানা ইট তুলে ছুঁড়ে মারে বহেরুর দিকে। চেঁচিয়ে বলে—তোঁকে নির্বংশ করব হারামজাদা।
ইট লাগে না। কিন্তু তেজে উড়ে বেরিয়ে যায়। নয়নতারার গায়ে আলাদা শক্তি ভর করেছে। বহেরু থমকে ঠাকুর-দেবতার নাম নেয়। তারপরই বেড়ালের মতো পায়ে কোলকুঁজো হয়ে, তীব্র চোখে চেয়ে এগোতে থাকে।
—গু খা, গু খা, গু খা, মড়া খা, মড়া খা…চিৎকার করতে থাকে নয়নতারা। দু-হাতে মাটি খামচে তুলে বুকে মাখে, থুথু ছিটায় চারদিকে—থু…থুঃ..থুঃ…
—হারামজাদি দণ্ডী কাটছে! এই বলে বহেরু একখানা ইট তুলে নেয়। বিশাল হাতে আস্ত ইটটা উঁচু করে লক্ষ্য স্থির করে।
॥ ছাব্বিশ ॥
নয়নতারা চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। শেষ বেলার রক্ত-আলো কুয়াশা আর মেঘ ছিঁড়ে তিরের মতো এসে বিঁধেছে ওর মুখে। দুটো পদ্মপাপড়ির মতো চোখ এখন ঝলসাচ্ছে টাঙ্গির ফলার মতো। ন্যাংটো, ভয়ংকরী চামুণ্ডা এলোচুল কালসাপের মতো ফণা তুলে আছে ওর পিছনে।
নয়নতারা রক্তমাখা থুথু ছিটোয়। বলে—থুঃ থুঃ…মর, মর সব মরে যা…
ইট ধরা ডানহাতখানা তুলে ধরে তাকিয়ে আছে বহেরু। মারবে! কিন্তু সে নিজেই টের পায়, তার ভিতরে আগুনটা সেঁতিয়ে গেছে। সামনে ওই ন্যাঙটা উদোম যুবতী, তার তেজি মেয়েটা ও যেন-বা বহেরুর কেউ নয়। দুনিয়ার মানুষের পাপ বেনো বর্ষার জলের মতো কুল ছাপিয়ে উঠেছে। এই কালসন্ধ্যায় বহেরুর মেয়ের শরীরে নেমে এসেছে কলকি-অবতার। নাকি মেঘু? ঠিক বুঝতে পারে না বহেরু। তবে তার শরীর কেটে ইঁদুরের মতো একটা ভয় ভিতরে ঢুকে গেছে ইদানীং। সেই ভয়ের ইঁদুরটা নড়াচড়া করে ভিতরে।
