—বহেরু কোথায় ছিল?
কোকা তাচ্ছিল্যের ঠোঁট উলটে বলে—কে জানে? কিন্তু পুলিশের একটু পরেই বাবা হাজির হয়ে গেল। কী কথাবার্তা বলল পুলিশের সঙ্গে কিছু বুঝতে পারলাম না। আমাকে ধরে নিয়ে গেল। পরে বড়বোনাই আমাকে ইশারায় বলেছে, পুলিশ বাবাই ডাকিয়েছিল। ওই রাতে স্টেশনে আমি কে, বা কী বৃত্তান্ত তা পুলিশ টের পায় কী করে? তখন অবশ্য কিছু টের পাইনি। পুলিশ যখন টেনে নিচ্ছে তখনও বাবাকে চেঁচিয়ে ডাকিয়ে ডাকাডাকি করছিলাম—ও বাবা, বাবা গো…
ব্রজগোপাল দাঁতনটা ফেলে দিলেন। বুকের মধ্যে একটা ভাব খামচে ধরে। চিরকালের একটা বাপের বাস বুকের মধ্যে। সেখানে একটা কাঁটা পট করে বিঁধে যায়।
মুখে ব্রজগোপাল বললেন—তখন কি আর তোর হুঁশ ছিল! জ্বরের ঘোরে, আর ভয়ে ডরে কী দেখতে কী দেখেছিস, ভুলভাল ভেবেছিস। কালীপদ কি আর মানুষের মতো মানুষ নাকি! আবোলতাবোল বুঝিয়েছে।
কোকার মুখে হাসি নেই। গম্ভীর মুখেই সে বলে-বাবা আমাকে দু-চোখে বিষ দেখে।
—দূর!
পাখিরা এ-ওকে ডাকে। ক্রমে বড় গোলমাল বাধিয়ে তোলে চারদিকে। পুবের আকাশে ফ্যাকাশে রং লাগে। চারদিকে মানুষের, পাখির, জন্তুজানোয়ারের জেগে ওঠার শব্দ হয়। আর তখন দিগম্বরের খোল মিহি শব্দের গুঁড়ো ছড়ায়।
ব্রজগোপাল জলের কাছে উবু হয়ে গাডু ভরতে থাকেন। জলভরার গুব গুব শব্দ হতে থাকে। পিছনে পৈঠায় কোকা দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়ের মতো নিশ্চল। কানে পৈতে জড়িয়ে ব্রজগোপাল ঘাট ছেড়ে উঠে আসেন। একবার তাকান কোকার দিকে।
কোকা হারিকেনটা তুলে কল ঘুরিয়ে নিবিয়ে দিয়ে বলে—আপনি মাঠের দিকে যান, আমি হারিকেন ঘরে রেখে আসছি।
ব্রজগোপাল বললেন—মনটাই মানুষের শত্রু। কাজকর্ম নিয়ে লেগে থাকবি মনটা বেশ থাকবে।
ব্রজগোপাল মাঠের দিকে হাঁটতে থাকেন। কোকা সঙ্গে সঙ্গে আসতে আসতে বলে—খুনখারাপি বাবাও কিছু কম করেনি। তবে আমাকে ভয় পায় কেন?
—ওসব তোর মাথাগরমের কথা।
কোকা একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ একটু হতাশার সুরে বলে—বামুনজ্যাঠা, আমাকে কিছু মন্ত্রতন্ত্র দেন।
—কেন?
—কিছু নিয়ে লেগে পড়ে থাকি। বলে কোকা হাসে।
তখন আবার হঠাৎ ভুরভুরে মদের গন্ধ আসে ওর শ্বাস থেকে। ছেলেটা স্বাভাবিক নেই। ব্রজগোপাল শ্বাস ফেলে বললেন—মনকে যা ত্রাণ করে তাই মন্ত্র। কিন্তু তোরা কি ত্রাণ পেতে চাস?
তাঁতিটা তাঁতঘরে বসে সারাদিন শানা মাকু নিয়ে খুটখাট করছে। সুতো ছিড়ে রাস করেছে। পেটের খোঁদলটা এখনও টোপো হয়ে ফুলে ওঠেনি বটে, তবে বহেরুর ভাতের গুণে শরীর সেরেছে একটু। দেঁতো মুখে একটু অপ্রতিভ হাসি। বহেরু তাঁতঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বাঘের মতো গুল্লু গুল্লু চোখে কাণ্ডটা চেয়ে দেখে। বাঘের মতোই হাঁক ছাড়ে মাঝে মাঝে—হচ্ছে তো তাঁতির পো?
তাঁতি তার দশ আঙুলে ছেড়া সুতো গোলা পাকাতে পাকাতে বলে—হয়ে যাবে।
দুশো সুতোর কাপড় শুনে সবাই হাসে। বহেরু হাল ছাড়ে না। লেগে থাকে। এখনও চন্দ্র-সূর্য ওঠে, সংসারের আনাচে-কানাচে ভগবান বাতাস ভর করে ঘুরে বেড়ান, মানুষ তাই এখনও পুরোটা পদার্থ ফেরেব্বাজ হয়ে যায়নি। লোকটা যদি দুশো সুতোর কাপড় বুনে দেখাতে পারে তবে বহেরুর এই বিশ্বাসটা পাকা হয়। তাঁতির এলেমে আর কেউ বিশ্বাস করে না, বহেরু করে। তাই সে মাঝে মাঝে বিড় বিড় করে বলে—পারবে, তাঁতিটা পারবে।
আজকাল প্রায় সারাদিনই বহেরু নানা কথা বিড় বিড় করে বকে। তে-ঠেঙে লম্বা সাঁওতালটা কদিন পড়ে পড়ে ধুঁকছে। অতখানি লম্বা বলেই তাকে আদর করে ঠাঁই দিয়েছিল বহেরু, দেখার মতো জিনিস। কিন্তু রুগ্ন-রোগা। লোকটা তার শরীরের ভার আর বইতে পারে না। লক্ষণ ভাল নয়। মেঘু ডাক্তার ওষুধপত্র দিয়েছিল, কাজ হয়নি। লোকটা ঘোরের মধ্যে পড়ে আছে, খেতে চায় না, ওঠে না, হাঁটে না। চিড়িয়াখানার ধার ঘেঁষে একখানা ঘর তুলে দিয়েছিল বহেরু। মস্ত লম্বা মাচান করে দিয়েছে। সেইখানে শুয়ে আছে লোকটা। দরজায় দাঁড়িয়ে বহেরু তাকে দেখে। বুঝতে পারে লোকটার কাল হয়ে এল। শরীরের লম্বা কাঠামোখানা কঙ্কালের মতো দেখাচ্ছে। চোয়াল আর খুলির হাড় চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছে ক্রমে। এত বড় শরীরটা কোনও কাজে লাগাতে পারল না হতভাগা। প্রায় ভাগাড় থেকেই লোকটাকে টেনে এনেছিল সে। নলহাটি স্টেশনে বিনা টিকিটে গাড়িতে উঠে পড়েছিল। পেটে খাবার নেই, গাড়ির কামরায় পড়ে ধুঁকছিল। সেই অবস্থায় বর্ধমানে তাকে রেলের বাবুরা ঢেলে দিয়ে যায়। বহেরু সেখান থেকে নিয়ে আসে। তিন মাসও টিকল না।
বহেরু একটা শ্বাস ফেলে। কী একটু বিড় বিড় করে। তার চিড়িয়াখানার বাঁদরটা চুপ করে বসে ঠিক মনিষ্যির মতো পেট চুলকোয়। বহেরুকে দেখে একটা কুক ছেড়ে ঝাঁপ খেয়ে আসে। দরজাটা তার দিয়ে বাঁধা। বহেরু তার খুলে বাঁদরটাকে কাঁধে নেয়। মানুষজন আর জীবজন্তুর প্রতি ইদানীং একটা মায়া এসে যাচ্ছে। বাঁদরটা বহেরুর মাথা দু-হাতে ধরে কাঁধে ঠ্যাং ঝুলিয়ে শিশুর মতো বসে থাকে। মাঝে মাঝে নিজের থেকেই কাঁধ বদল করে অন্য কাঁধে চলে যায়। ভারী একটা আদুরে ভাব। বহেরু বাঁদরটাকে খানিক আদর করে। গালে গাল ঘষে দেয়। একটা চিমসে গন্ধ হয়েছে গায়ে। বহেরু বাঁদরটার লোম উলটে পোকাটোকা খুঁজে দেখল গায়ে নেই। চোখ পিট পিট করে জানোয়ারটা আদর খায়। মুখখানা উল্লুকের মতো হলে কী হয়, কোথায় যেন একটু বাঁদুরে হাসি লুকিয়ে আছে ভ্যাংচানো মুখে। ‘খচ্চর’ বলে গাল দেয় বহেরু।
