কুয়াশা আর লণ্ঠনের হলুদ আলোয় রহস্যের মাখামাখি। লোকটা মুখ ফিরিয়ে বলল—বামুনজ্যাঠা।।
ব্রজগোপালের চোখ আজকাল কমজোরি। লণ্ঠনের আলো থেকে চোখ আড়াল করে ঠাহর পেলেন, কোকা। তার কান মাথা ঢেকে একটা কমফর্টার জড়ানো, গায়ে চাদর। অলিসান চেহারা নিয়ে বসেছিল, ব্রজগোপালকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। গালে একটা দাঁতনকাঠি গোঁজা।
ব্রজগোপাল একটু অবাক হয়ে বলেন—কী রে!
কোকা নিঃশব্দে একটু হাসল। বলল—রাতে একদম ঘুম হল না। তাই উঠে ঠান্ডায় একটু বসে আছি।
ব্রজগোপাল খড়ম ছেড়ে লণ্ঠন হাতে জলের কাছে নামলেন। জল হিম হয়ে আছে। চবাক করে বড় মাছ ঘাই দেয়। ব্রজগোপাল কানে গোঁজা দাঁতনটা ধুয়ে নিয়ে বলেন—কাঁচা বয়সে ঘুম আসবে না কেন? সারাদিন দত্যিপানা করে বেড়াস, ঢলে ঘুমনোর কথা।
—মাথাটা গরম লাগে।
—কেন রে?
মেঘুখুড়ো ঝাঁৎ করে মরে গেল, পুলিশ ডাক খোঁজ করতে লেগেছে। আবার না পেছুতে লাগে।
ছেলেটা যে খুব স্বাভাবিক নেই, তা ব্রজগোপাল বাতাস শুঁকে বুঝতে পারলেন। অসম্ভব নয় যে ছোকরা সারা রাত ঘরে ছিল না। বোধ হয় ভোর ভোর গুঁড়িখানা থেকে ফিরেছে। তবে একেবারে বেহেড নয়।
ব্রজগোপাল বললেন—বৃত্তান্তটা কী, কিছু খবর পেয়েছিস?
—কে জানে! তবে বাবা কাল রাতে ডেকে বলল, তুই পালিয়ে যা।
—বহেরু বলেছে? ব্রজগোপাল অবাক হন।
—হ্যাঁ। তাই ভাবছি, পালাব কোথায়।
—পালাবি কেন! পালালে আরও লোকের সন্দেহ বাড়ে।
—পালান পালিয়েছে, আরও সব গা ঢাকা দিয়ে আছে। আমার ওরকম ভাল লাগে না। এই তো অ্যাদ্দিন মেয়াদ খেটে এলাম। ঘরের ভাত পেটে পড়তে না পড়তেই আবার সবাই হুড়ো দিতে লেগেছে। বেড়াল কুকুর হয়ে গেলাম নাকি!
ব্রজগোপাল সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারেন না। তাঁর ছোট ছেলেটারও এই বয়স। এই বয়সে অভিজ্ঞতার বা বোধবুদ্ধির পাকা রং লাগে না। দাঁতনটার তিতকুটে স্বাদ মুখে ছড়িয়ে যেতে থাকে। একটু ভেবে ব্রজগোপাল বলেন—পুলিশের পাকা খাতায় নাম উঠিয়ে ফেললি। এখন তো একটু ভয়ে ভয়ে থাকতে হবেই।
কোকা একটু অভিমানভরে বলে—যা করেছি তার তো সাজা হয়েই গেল। লাথি গুঁতো কিছু কম দিয়েছে নাকি! আমার বড়সড় শরীলটা দেখে ওদের আরও যেন মারধরের রোখ চাপত। তার ওপর বেগার দিয়ে তো পাপের শোধ করেছি। কিন্তু তবু এখন এলাকায় কিছু ভালমন্দ হলেই যদি পুলিশ পেছুতে লাগে তো বড় ঝঞ্ঝাটের কথা!
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। বুঝেছেন। একটু তেতো হাসি হাসলেন, বললেন—পাপের। শোধ কি মেয়াদ খেটে হয়! কত চোর-জোচ্চোর-খুনে জেল খাটছে, তারা সব জেলখানায় থেকে ভাল হয়ে যাচ্ছে নাকি! লাথি গুঁতো দেয়, আটকে রাখে, আর ভাবে যে খুব সাজা হচ্ছে। মানুষ ওতে আরও ক্ষ্যাপাটে হয়ে যায়। কর্তারা সব সাজা দিয়ে খালাস, মানুষ শোধরানোর দায় নেবে কে? নিজেকে নিয়েই ভেবে দ্যাখ, জেলখানায় তোর কোনও শিক্ষা হয়েছে? শোধরানোর চেষ্টা করেছে তোকে?
মাথাটা নেড়ে গুম হয়ে থাকে কোকা। বোধ হয় জেলখানার স্মৃতি মনে আসে। মুখটায় একটু কঠিন ভাব ফোটে। বলে—তো আশ্চিত্তির হয় কীসে? তার কী করা লাগবে?
ব্রজগোপাল বলেন—প্রায়শ্চিত্ত হল চিত্তে গমন। অত শক্ত কথা তুই বুঝবি না।
কোকা ব্রজগোপালের দিকে চেয়ে দাঁতনটা অন্যমনস্কভাবে চিবোয়। তারপর হঠাৎ বলে—আমি সেই ছেলেটার গায়ে হাত না দিলেও কিন্তু পুলিশ ওকে পেলে মেরে দিত। কাজটা তো একই।
ব্রজগোপাল স্লান হাসলেন। পুলিশ যে আইনসঙ্গত খুনি, এ সত্য কে না জানে বললেন- তোর সে সব কথায় দরকার কী? তুই নিজের কথা মনে রাখলেই হল। একটা পাতক করে ফেলেছিস, এখন হাত ধুয়ে ফ্যাল। আর কখনও ওসব দিকে মন দিস না। বেঁচে থাকাটা সকলেরই দরকার।
দিগম্বরের খোল তার বোল পালটেছে। বুড়ো হাতে খোলের চামড়ায় এক অলৌকিক ডেকে আনছে সে। ধ্বনি ওঠে, প্রতিধ্বনি হয়ে ফেরে, যতদূর যায় ততদূর বধির করে দেয় সব কিছুকে। কথার মাঝখানে ব্রজগোপাল উৎকর্ণ হয়ে শোনেন। তাঁর আজ্ঞাচক্রের জপ, তাঁর গোপন বীজধ্বনি যেন ওই শব্দের তালে তালে ধ্বনিত হয়।
কোকা বলে—বামুনজ্যাঠা।
অন্যমনস্ক ব্রজগোপাল একটা ‘হুঁ’ দেন কেবল।
—আপনাকে একটা কথা কয়ে রাখি।
—কী কথা!
—আমি যদি এখান থেকে না পালাই তো বাবা ফের আমাকে ধরিয়ে দেবে।
ব্রজগোপাল কথাটা বুঝতে পারলেন না। বললেন—কোথায় ধরিয়ে দেবে?
—পুলিশে।
কোকা মুখখানা এমনধারা করল যেন কাউকে ভ্যাঙাচ্ছে। বলল-বাবাই তো ধরিয়ে দিয়েছিল সেবার, যখন খুনটা হয়ে গেল হাত দিয়ে…বলে কোকা তার দুখানা অপরাধী হাত চাদরের তলা থেকে বের করে সামনে বাড়িয়ে দেখাল।
—বহেরু ধরাবে কেন? তোর যত বিদ্ঘুটে কথা!
—তবে আর ক’লাম কী! খুনটা হয়ে যেতে মাথাটা গোলমাল হয়ে গেল। সে রাতে জ্বরও এসেছিল খুব। বিকারের অবস্থা। চারদিকের কিছু ঠাহর পাচ্ছিলাম না। যেন ভূতে ধরেছে। ভোর রাতে বাবা ঠেলে তুলে দিল, একটা কম্বল চাপা দিয়ে বলল—চল। তখন কিছু বুঝতে পারছিলাম না। ভাবলাম, বাবা লাঠেল লোক আছে, ঠিক বাঁচিয়ে দেবে। কেবল ‘বাবা বাবা’ করছি। বাবা যেমন ভগবান। বাবা আর বড় বোনাই সঙ্গে নিয়ে স্টেশনে গেল, গাড়িতে তুলে দেবে। স্টেশনঘর থেকে দূরে গাছতলায় বেঞ্চের ওপর বসিয়ে রেখে দিল, গাড়ির তখন দেরি আছে। বড়বোনাই আমার হাতখানা ধরে রেখে ঠাকুর দেবতার নাম করছে, বাবা গেল গাড়ির খোঁজখবর করতে কি টিকিট কাটতে কে জানে। স্টেশন একদম হা-হা শূন্য, জনমানুষ নেই। আমি কম্বলমুড়ি দিয়ে বসে ভয়ে ডরে আর জ্বরের ঘোরে কাঁপছি। সময়ের জ্ঞান ছিল না। কতক্ষণ পরে হঠাৎ আঁধার ফুঁড়ে দুটো পুলিশ এসে সামনে দাঁড়িয়ে গেল। বড়বোনাই তখন ভিরমি খায় আর কি! আমিও কোনও কথা মনে করতে পারি না। পুলিশ নাম জিজ্ঞেস করল, নিজের নামটা পর্যন্ত তখন মনে আনতে পারছি না।
