—দূর বোকা। ও পালিয়েছে ভয়ে। ঘরপোড়া গোরু, একবার পুলিশ ছুঁলে আঠারো ঘা। তার ওপর চোরাই ঘড়িটা কিনেছে, ভয় থাকবে না?
বহেরু বুঝল। তবু একটু সন্দেহ প্রকাশ করে বলে—খুন যদি নাও হয়ে থাকে মেঘু, তবু কিন্তু মনে লয় কোকার স্যাঙাতরা সব খালাস হয়ে এসেছে, শাসাচ্ছে-টাসাচ্ছে দেখে ডাক্তারটা ভয় খেয়ে মরে গেল না তো। তেমন তেমন ভয়-ডরের বাতাস লাগলে মানুষ সিঁটিয়ে মরে যায়।
সেটাও ব্রজগোপালের বিশ্বাস হয় না। মেঘু বাস্তব জগৎ সম্পর্কে খুব খেয়াল করত না ইদানীং। এক-একটা বোধহীনতা মানুষকে পেয়ে বসে, যখন বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার তফাত করতে পারে না। বউ মরে যাওয়ার পর থেকে পরশু ইস্তক মেঘু ডাক্তারের আত্মবোধ ছিল বলে মনে হয় না। ‘আমি আছি’ এমনতর হুঁশ থাকলে তবে তো ভয়ডর? কেবল নেশায় বাধা দিত বলে বালবিধবা বোনটাকে সমঝে চলত। আর সুস্থ অবস্থায় মেঘু ডাক্তার ভয় খেত মাতাল মেঘুকে। কতবার মেঘু এসে ব্রজগোপালের পা চেপে ধরে বলেছে—দাদা, কাল সাঁঝের ঘোরে শীতলাতলায় আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, অবিহিত কিছু বলে ফেলেছি হয়তো, সম্মান রাখতে পারিনি। মাতাল-টাতাল মানুষ, ক্ষমা ঘেন্না করে নেবেন। মেঘুর তাই সমস্যা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, নিজের মধ্যে দুটো মানুষকে সামাল দেওয়া। একটার সঙ্গে অন্যটার দেখা হয় না। একটা জাগলে অন্যটা ঘুমোয়। একটা ঘুমোয় তো অন্যটা জাগে। কতদিন মেঘু তার বোনের পা চেপে ধরে চেঁচিয়েছে—বেঁধে রাখ, বেঁধে রাখ আমাকে গোশালে। ঢেঁকিতে লটকে রেখে দে। তখন অন্য মেঘুটা অশরীরী হয়ে এসে এই মেঘুটাকে ইশারা-ইঙ্গিত করত ভূতের মতো। ছাইগাদায় দাঁড়িয়ে, ঘের পাঁচিলের ওপর উঠে, মাদার গাছের ডালে বসে দাঁত কেলিয়ে হাসত মেদুর কাণ্ড দেখে। নিঃশব্দে মেঘুর কানে কানে বলত—দূর বাবু, রসের বানে দুনিয়া ভেসে যাচ্ছে, তুমি কেন গা শুকনো সন্নিসি হয়ি থাকবে? কোন কচুপোড়া হবে তাতে? এই দুনিয়া তোমার জন্য কোন সুখ-শান্তির বন্দোবস্ত রেখেছে শুনি! তাই যদি ভেবে থাকো তো থাকো বোনের পায়ে লটকে, কিন্তু কিছু হওয়ার নয়। দুনিয়া এখন তোমার কাছে বাওয়া ডিম বাবা, এ থেকে আর কিছু বেরোবে না। তখন মেঘু উঠে চোর-চোখে চারদিকে চাইত। বোন সে চাউনি চিনত। ঘরের বাসন-কোসন বা দামি জিনিস সব তালাচাবি বন্ধ, পয়সাকড়ি লুকনো। নিজেকে গালমন্দ করতে করতে মেঘু তখন খারাপ হওয়ার জন্য অন্য মেঘুর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ত।
তাই ব্রজগোপাল ভাবেন মেঘুর কাছে দুনিয়ার ঘটনাবলির কোনও অর্থ ছিল না। দু-দুটো মেঘুর টানা-হ্যাঁচড়ায় সে তখন নিজের ঘায়ে কুকুর-পাগল। সে যে রাজসাক্ষী হয়েছিল, এ হুঁশই ছিল না।
তবু নানা চিন্তা এসে চেপে ধরে। পাপের এক হাওয়া-বাতাস এসে গেছে দুনিয়ায়। কিছু বিচিত্র নয়। কোকা সেই ছোকরাকে খুন করার পর যেমন বলেছিল—আজকাল তো সবাই মানুষ মারে, কারও কিছু হয় না। কোকা কেবলমাত্র সেই কারণেই ছোকরাকে মেরে দেখেছিল কেমন লাগে। এমন তুচ্ছ কৌতূহলে যদি মানুষ মারা যায় তা হলে বলতেই হয়, সবার ঘাড়ে ভূত চেপেছে।
আবার এও মনে হয় মেঘুটা এমনিতেই মরল। মরার সময় হয়েছিল, দুনিয়ার মেয়াদ শেষ হয়েছে। এখন শুদ্ধ-মুক্ত হয়ে বউয়ের পাশটিতে বসেছে কলজে ঠান্ডা করে, একটা বউয়ের জন্য যে একটা মানুষ এমন শোক-পাগল হতে পারে তা আর দেখেননি ব্রজগোপাল।
গভীর রাতে তিনি একটা শ্বাস ফেলে পাশ ফিরলেন। গায়ের কাঁথাটা সরে গেল। ঠান্ডা ঢুকছে। হারিকেনের একবিন্দু নীল আগুন স্থির হয়ে আছে। নীলের ওপর একটু হলদে চুড়ো। ঘরময় কেরোসিনের গন্ধ। তাঁতি লোকটা ঘুমের মধ্যে একবার বলল—ডাঁড়াও না…আ্ তারপর চুপ করে ঘুমোত থাকে। ঘড়িটা বন্ধ, সময়টা ঠিক বুঝতে পারেন না ব্রজগোপাল।
এমনি সময়ে গন্ধ বিশ্বেস হা-হা করে চেঁচিয়ে উঠল। আজও মুতের হাঁড়ি উলটে ফেলেছে। বহেরুর বড়জামাইয়ের গলার স্বর আসে। গলায় সুরের নামগন্ধ নেই, তবু একরকম একঘেয়ে পাঁচালির মতো আবেগে গাইতে থাকে—জাইগতে হবে, উইঠতে হবে, লাইগতে হবে কাজে…
তারপর হঠাৎ সমস্ত পৃথিবী চমকে উঠে চুপ করে যায়। দিগম্বরের খোলে প্রথম চাঁটিটি পড়ে গুম করে। তোপের আওয়াজের মতো ওই একটি ধ্বনিই সবাইকে জানিয়ে দেয়, শব্দে ভগবান আছেন। শব্দ নমস্য।
নিঃশব্দে ব্রজগোপাল ওঠেন। বাইরে এখনও নিশুত রাতের মতো অন্ধকার। কুয়াশায় আবছা হিম। বৃষ্টির মতো শিশিরে ভিজে আছে চারধার। তবু ভোরের অনেক আগেই এখানে দিন শুরু হয়। দিগম্বরের আনন্দিত খোল শব্দে মাতাল হয়ে লহরায় ভাসিয়ে নিচ্ছে জগৎসংসার।
হারিকেন হাতে, খড়মের শব্দ না করে ব্রজগোপাল পুকুরের ঘাটে পা দিয়ে একটু চমকে ওঠেন। পৈঠায় কে যেন বসে আছে, অন্ধকারে একা। এটা ব্রজগোপালের নিজস্ব ঘাট। ব্রাহ্মণের ঘাট কারও কোনও কাজ করার নিয়ম নেই। ব্রজগোপাল হারিকেনটা তুলে বললেন—কে?
॥ পঁচিশ ॥
গার্ড সাহেবের মতো লণ্ঠন উঁচুতে তুলে ধরে ব্রজগোপাল ঠাহর করে দেখলেন। খেজুর গাছ চেঁছে, খোঁটা পুঁতে মজবুত ঘাট তৈরি করে দিয়েছে বহেরু। সবাই বলে, বামুনকর্তার ঘাট, এ ঘাটে আর কেউ ধোয়া পাখলা করে না। অন্য মানুষ তাঁর ঘাটে বসে আছে দেখে ব্রজগোপাল অসন্তুষ্ট হন। আচার-বিচার সহবত সব কমে আসছে নাকি!
