বলে মেঘু রুখে দাঁড়ায়। তারপর বহেরু কিছু টানাটানি করতেই সটান শুয়ে পড়ে ধুলোয়। সে অবস্থা থেকে তাকে তোলা বড় সহজ হয় না।
ব্রজগোপাল সেই শেষবার দেখেছিলেন মেঘু ডাক্তাবকে বাজারের বটতলায় ধুলোমুঠো ধরে পড়ে আছে। মাতাল মানুষ। ইদানীং বোধবুদ্ধি খুব কমে যাচ্ছিল। কেমন ভ্যাবাগঙ্গারামের মতো চোখের নজর, দুটো ঠোঁট সবসময়ে ক্যাবলার মতো ফাঁক হয়ে থাকত। চোখের নীচে গদির মতো মাংস উচু হয়ে থাকত। চোখে আলো নিবে গেছে। ভিতরে ভিতরে বাঁচার ইচ্ছেটাও মরে গিয়েছিল বোধ হয়।
পরশু বুঝি পয়সার টান পড়ে। গোটা চারেক টাকার জোগাড় ছিল। দুপুরের দিকে বালবিধবা বোন তিনটে টাকা কেড়ে নেয়। না নিয়েও উপায় ছিল না, দু-চারদিন কুত্থি-কলাই সেদ্ধ অথবা গমের খিচুড়ি খেয়ে বাচ্চাদের পেট ছেড়েছে। কিছু ভদ্রলোকী খাবার না জোটালেই নয়। মেঘু ডাক্তার বোনকে মুখোমুখি বড় ডরায়। টাকাটা হাপিস হয়ে গেল দেখে নাকি সুস্থ মাথায় সদর দরজায় দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করেছিল—আমার মালের দাম ভেঙে গেল, একটা টাকায় শুড়ির মুখখানাও দেখা যায় না। এখন আমার শরীরটা যদি পড়ে যায় তো তোদের দেখবে কে শুনি?
দায়িত্বশীল গেরস্তের মতো কথাবার্তা। মালের দামটা ভেঙে গেছে বলে যে আবার টপ করে জোগাড় করে নেবে সে সাধ্য মেঘুর ছিল না। তার গুডউইল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন মেঘু মাতাল, আর মেঘু ডাক্তার দুটো মানুষ। মাতাল মেঘুর জন্য ডাক্তার মেঘু নষ্ট হয়ে গেছে। মাতাল অবস্থায় কী করেছে না করেছে ভেবে মেঘু ইদানীং বড় বিনয়ী হয়ে গিয়েছিল। যখন-তখন লোকের পা ধরত। তাতে শ্রদ্ধা আরও কমে যায়। ধারকর্জ দিয়ে দিয়ে লোকে হয়রান। দুপুর গড়িয়ে গেলেই ডাক্তারকে নিশি ডাকে। বাহ্যজ্ঞান থাকে না, পাপ-পুণ্য ভাল-মন্দর বোধ লুপ্ত হয়ে যায়। ধূর্তামিতে পায় তখন। সে সময়ে চেনা লোক তাকে দেখলেই গা-ঢাকা দেয়।
পরশু বিকেলে মেঘুকে যখন নিশিতে পেয়েছে, মালের দাম ভেঙে গিয়ে চূড়ান্ত দুঃখে মেঘুর চোখে জল, সে সময়ে গুটি গুটি একটি পাঁঠা নিজে হেঁটে এল হাঁড়িকাঠে গলা দিতে। সে একটু বোকাসোকা চাষি মানুষ, এক-আধবার মেঘর চিকিৎসা করিয়ে থাকবে। ‘কল’ দিতে এসেছিল। গোবিন্দপুর থেকে আরও মাইলখানেক উত্তরে তাদের গাঁয়ে। মেঘু তক্ষুনি রাজি। রুগি দেখার পর নাকি পয়সা না দিয়ে চাষি-বউ গুচ্ছের ধান, কলাই, দুটো বিচে-কলার মোচা, এসব দিয়েছিল। কিন্তু মেঘুর তখন হন্যে অবস্থা, ধান-কলাই-মোচা দেখে আরও মাথা খারাপ হয়ে গেল। চাষির ঘরে ঢুকে শিশিবোতল হাঁটকায়, ছিপি খুলে গন্ধ শোকে, আর বলে–তোর মাল খাস না? যা! মাল খাস না তো চাষবাস করার তাগদ পাস কীসে? মাল না খেলে শরীরে রক্ত হয় তোদের কী করে, অ্যাঁ! নগদা তিন চারটে টাকা থাকে না তোদের কাছে কেমন গেরস্তালী করিস তোরা! নাম ডোবালি।
ঠিক কী হয়েছিল তা বলা মুশকিল। তবে মেঘু ডাক্তার চলে আসার পর নাকি চাষা দেখতে পায় তার ঘরের একটা জিনিস খোয়া গেছে। তার বড় ছেলে বর্ধমানের কলেজে পড়ে, একটা সস্তার হাতঘড়ি শখ করে কিনেছিল। দেয়ালে পেরেকে ঝোলানো ছিল। নেই। মেঘু চারশো বিশ ছিল বটে, কিন্তু কখনও লোকের ঘরে ঢুকে কিছু সরায়নি এ যাবৎ। বেলদার সেই ঘড়ি দশ টাকায় বেচে কোকার এক স্যাঙাতের কাছে, তারপর তাদের সঙ্গে বসেই একনম্বর টেনেছে। কাল সকালে বহেরুর হেফাজতে। তারা কোকার স্যাঙাতদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। কোকার খোঁজেও এসেছিল। কিন্তু দলে ছিল না বলে ধরে নিয়ে যায়নি। পালান চোরাই ঘড়িটা কিনেছিল, সেটা বাড়িতে ফেলে রেখে বোকার মতো ফেরার হয়েছে। পুলিশ চোরাই ঘড়ির জন্য খুঁজছে, নাকি খুন সন্দেহ করছে, কিছু বলা যায় না। ঘড়িটড়ি সস্তা ব্যাপার নিয়ে তারা এত মাথা ঘামায় না। তবে কি খুন?
ব্রজগোপাল ভেবে পান না। মোদোমাতাল অপদার্থটাকে মেরে লাভটা কী? বহেরু তবু কাল বিকেলের দিকে ব্রজগোপালের কাছে এসে বলেছে—ডাক্তারটা রাজসাক্ষী ছিল বলে খুন হল না তো কর্তা!
ব্রজগোপাল অবাক হয়ে বলেন—খুন বুঝলি কীসে? এমনিতেই শরীরটা ঝাঁঝরা হয়ে ছিল, পট করে মরে যেত যে কোনও সময়ে।
বহেরু ধন্ধভাবে মাথা নেড়ে বলে—গ্যাঁজ উঠছিল যে মুখ দিয়ে।
ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে বলেন—ওসব খেলে তো ওরকম হবেই।
বহেরু হেসে বলেছিল—পুলিশ কিছু একটা গন্ধ পেয়েছে। কেলো শুঁড়ির দোকানে কাল নাকি মেঘুকে পালান ওরা শাসিয়েছে—তুমি রাজসাক্ষী দিয়ে আমাদের ঘানি ঘুরিয়েছ, তোমার গর্দান যাবে।
ব্রজগোপালের তবু বিশ্বাস হয় না। শুঁড়িখানায় বসে কত মশামাছির মতো মানুষ রাজা-উজির মারে। তিনি বললেন—লাশ তো তুই দেখেছিস। কিছু টের পেলি?
বহেরু মাথা নেড়ে বলল—না, শরীর দেখে কিছু বোঝা যায় না। তবে ডাক্তারটা মদের নেশায় মাথার ঠিক রাখতে পারত না। কেউ যদি সে সময়ে পোকামারার বিষ এগিয়ে দেয় তো তাই ঢাকাকে ঢেলে দেবে গলায়। এই বলে একটা শ্বাস ফেলে বহেরু বলল—কোকাটার জন্য ভারী চিন্তা হয় কর্তা।
ব্রজগোপাল চিন্তিত হয়ে বললেন—চিন্তা করিস না। ও তো দলে ছিল না। মাঠেঘাটে লাশ পাওয়া গেলে পুলিশ একটু নড়াচড়া করে। কাটাকুটি করে দেখবে। ওসব কিছু না।
—তা পালান পালিয়েছে কেন? সেটাও তো দেখতে হবে!
