কথাটা ঠিক, তবু বহেরুর হাবভাব খুব ভাল লাগেনি ব্রজগোপালের। সে ছেলের ব্যাপারে একটু গা-আলগা দিয়েছিল যেন। মেঘুকে হাত করার কোনও চেষ্টা করেনি। ব্রজগোপাল নিজেই গিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এসেছিলেন মেঘূকে। পাঁটা টাকা দিয়েছিলেন, যদিও মেঘুকে টাকা দেওয়া মানে পরোক্ষে শুড়িখানার ব্যবসাকে মদত দেওয়া। স্বভাববিরুদ্ধ কাজটা তবু করেছিলেন ব্রজগোপাল।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কোকা বেরিয়ে এসেছে। এতে বাপ হয়ে বহেরুর খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু তার মুখেচোখে একটা নিরানন্দ ভাব। আর, তারচেয়েও বড় একটা ব্যাপার দেখতে পান ব্রজগোপাল। বহেরুকে জীবনে ভয় পেতে দেখেননি তিনি। এখন মনে হয় বহেরুর চোখে একটু ভয় যেন সাপের মাথার মতো উকি মারছে।
ভাবতে ভাবতে এপাশ থেকে ওপাশ হন তিনি। কাঁথাটা গায়ে জড়ান। তাঁতি লোকটা কী একটু কথা বলে ঘুমের মধ্যে হাসে। ব্রজগোপাল অন্ধকারে চেয়ে থাকেন। হারিকেনের পলতেয় একবিন্দু নীলচে হলুদ আলো জ্বলছে। ব্রজগোপাল চেয়ে থাকেন।
গতকাল মেঘু ডাক্তার মারা গেছে। কোকা খালাস হয়েছে মোটে কদিন। মেঘুটা আবার রাজসাক্ষী ছিল।
॥ চব্বিশ ॥
সেদিন ভাগচাষির কোর্ট থেকে ফেরার পথে মেঘু ডাক্তারের সঙ্গে দেখা। বেলদা-র বাজারে দাঁড়িয়ে মাতলামি করছে। লোকজন ঘিরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। বেঁটেখাটো কালোপানা বুড়ো মানুষ, ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল, গালে বিজবিজ সাদা দাড়ি, কষে ফেনা, দুচোখে জলের ধারা। হাপুস কাঁদে মেঘু ডাক্তার। মাতালের যা স্বভাব, কোথাও কিছু না, হঠাৎ একটা পুরনো অনাত্মীয় দুঃখকে খুঁচিয়ে তোলে। মেঘু কাঁদছে তার বালবিধবা বোনের কথা মনে করে—আমার জনমদুখিনী বোনটা, আহা-হা, আমার বিধবা বোনটার যে কী দুঃখ! আমি তার দাদা হাঁ আলবত তার মায়ের পেটের দাদা! বলে হঠাৎ কান্না ভুলে বড় বড় ঠিকরানো চোখে চারদিকে চেয়ে দেখে মেঘু ডাক্তার। পরমুহূর্তে ক্যাঁ করে কেঁদে ফেলে ভাঙা গলায় বলতে থাকে-মায়ের পেটের দাদা! মরার খবর হলে বোনাই কাছে ডেকে বলেছিল হাত ধরে—দাদাগো, ব্যবস্থা তো কিছু করে যেতে পারলাম না, ওর কী হবে! সেই বোনটা আমার বাসন মেজে খায়, আর আমি শালা মাতাল…শালা মাতাল…জুতো মার, জুতো মার আমাকে…বলতে বলতে মেঘু এর-ওর তার পায়ের দিকে দু-হাত বাড়িয়ে তেড়ে যায় জুতো ধরতে।
সাঁত সাঁত করে সবাই পা টেনে নিয়ে পালাতে থাকে। কেবল ধরা পড়ে যায় রেলের রাতকানা কুলি হরশঙ্কর। তার হাতে শিশিতে একটু কেরোসিন, দোকান থেকে ফিরছিল, মজা দেখতে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তার একখানা ঠ্যাঙ সাপটে ধরেছে মেঘু, হাঁটু গেড়ে বসে মুখ তুলে বলে—দে শালা জুতো আমার মুখে। দে! দিবি না? পয়সা জুটলে হরশঙ্কর নিজেও টানে, তাই খুব সমবেদনার সঙ্গে কী যেন বোঝাতে থাকে ডাক্তারকে।
গোবিন্দপুরের যে কজনকে একটু-আধটু পছন্দ করে বহেরু, তার মধ্যে মেঘু ডাক্তার একজন। কাণ্ড দেখে দাঁড়িয়ে গেল। বলল—খেয়েই ডাক্তারটা যাবে।
ব্রজগোপাল বলেন—দেখবি না কি!
—ও আর দেখার কী! চলে চলুন।
ব্রজগোপাল একটু ইতস্তত করে বলেন—কোথায় পড়েফড়ে থাকবে! হিম লেগে না রোগ বাধায়।
বহেরু বলে—পেটে ও থাকলে আর ঠান্ডা লাগে না।
ব্রজগোপাল একটা শ্বাস ফেলেন। বলেন—গুণ ছিল রে!
বহেরু থমকে দাঁড়ায়। হঠাৎ কী মনে পড়তেই বলে—ডাক্তারটা বামুন হয়ে ছোটলোকের পা ধরছে!
ব্রজগোপাল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন—মাতালের আবার বামুন।
বহেরু সে কথায় কান না দিয়ে বলে—আপনি এগোন কর্তা, আমি দেখেই যাই।
ব্রজগোপাল হাসলেন। বহেরুর ওই এক দুর্বলতা। বামুন দেখলে সে অন্যরকম হয়ে যায়। ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—দ্যাখ! একটা রিকশায় তুলে দিস বরং।
লম্বা পায়ে এগিয়ে গিয়ে বহেরু হ্যাঁচকা টানে তুলে ফেলে ডাক্তারকে, বলে—চলো ডাক্তার।
মেঘু কিছু বুঝতে পারে না কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, মারছিস? মার। বলে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদে। মুখের লালা, নাকের জল মিশিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাঙা গলায় বলে—মার আমাকে।
—তোমার ইজ্জত নেই। বামুন হয়ে দোসাদের পা চেপে ধরলে কোন আক্কেলে? চলো তোমাকে গোচোনা গেলাব আজ।
মেঘু সঙ্গে সঙ্গে কান্না ভুলে ফোঁস করে ওঠে—কেন শালা? আমাকে পেয়েছ কী? অ্যাঁ!
—ফের মাতলামি করবে না বলে দিচ্ছি। তোমাদের গাঁ হয়েছে এক নেশাখোরদের আচ্ছা।
—আমি মাতাল! ভারী অবাক হয় মেঘু—আমি! অ্যাাঁ?
—তুমি আজ বিস্তর গিলেছ। এত খাও কী করে হে! এই বলে বহেরু তাকে টানতে টানতে বটতলার রিকশার আড্ডায় নিয়ে যেতে থাকে। মেঘু চেঁচাতে থাকে—শালা, গোরু দেখেছিস? দেখেছিস গোরু সারাদিন খালি খায় আর খায়? সকালে জাবনা, বিকেলে জাবনা, তার ওপর দিনমানভর ঘাস ছিঁড়ছে আর খাচ্ছে! রাতেও শালা উগরে তুলে চিবোয়। গোরুর কখনও পেট ভরে, দেখেছিস? আমি হলুম মদের গোরু…।
লোকজন খ্যাল খ্যাল করে হাসছে। ছোকরা একটা রিকশাঅলা ঘন্টি মারে। রিকশাটা এগিয়ে আসতেই মেঘু তেড়িয়া হয়ে দাঁড়ায় রিকশায় যাব কেন, আমি কি মাতাল শালা? বহু কাপ্তান দেখেছি শুঁড়ির গায়ের ঘাম চাটলে শালাদের নেশা হয়ে যায়। আমি কি তেমন মাতাল নাকি। আমি হচ্ছি মদের গোরু, সারাদিন খাইয়ে যা, পেট ভরবে না। মেঘনাদ ভটচাষকে কেউ কখনও মাতাল দেখেনি। হটাও রিকশা…
