এই মামলায় রাজসাক্ষী ছিল গোবিন্দপুরের মেঘু ডাক্তার। সে মাতাল-চাতাল মানুষ। বেলদা-র শুঁড়িখানা থেকে বাঁধ ধরে ফিরছিল। সে ঘটনাটা চোখের সামনে দেখতে পায়। সে অবশ্য লোকজনদের ঠিক চিনতে পারেনি। উলটোপালটা সেও বলেছিল সাক্ষী দিতে গিয়ে। তবু সবচেয়ে জোরদার সাক্ষী ছিল সে-ই।
এ তল্লাটে মেঘুর মতো ডাক্তার নেই। পুরনো আমলের এল এম এফ। সে রুগির মুখে ওষুধ বলে জল ঢেলে দিলেও রুগি চাঙ্গা হয়ে যেত—মানুষের এমন বিশ্বাস ছিল তার ওপর বউ মরে গিয়ে ইস্তক সে ঘোর মাল। বাল-বিধবা এক বোন তার সংসার সামলায়, মেঘু সকাল থেকেই ঢুকু ঢুকু শুরু করে দেয়। রোজগারপাতি বন্ধ হয়ে গেছে প্রায়, সংসার চলে না, রুগি দেখে যে পয়সা পায় তা শুড়িকে দিয়ে আসে। ইদানীং পাগলামিতে পেয়ে বসেছিল। এক মুসলমান বৃষ্টির সন্ধেবেলা এসে হাজির, সান্নিপাতিকে তার তখন যা-দশা! মেঘুর আলমারিতে ওষুধের নামগন্ধও ছিল না তখন। রুগি হাতছাড়া হয়ে দেখে ইঞ্জেকশনের দাম নিয়ে উঠে ভিতর বাড়িতে গিয়ে গোয়ালঘরের খোড়ো চালের লালচে জল সিরিঞ্জে ভরে এনে ঠেলে দিয়েছিল রুগির শরীরে। এ ঘটনা দেখে ভয় পেয়ে বাল-বিধবা বোন চেঁচামেচি শুরু করাতে মেঘু গাঁ ছেড়ে পালাল ক’দিনের জন্য। তার তখন ধর্মভয় নেই, লোকলজ্জাও না, কেবল ছিল জীবজন্তুর মতো মারধরের ভয়। ফেরার অবস্থায় সে ভারী মজা করেছিল। বর্ধমানের এক বিখ্যাত তান্ত্রিকের নাম করে বহেরুকে চিঠি দিল একদিন। চিঠির ওপর সিদুরের ছাপ, লাল কালি দিয়ে ত্রিশূল আঁকা। তাতে লেখা—ক্ষীরোগ্রাম শ্মশানেশ্বরী শ্রীশ্রী১০৮ কালীমাতার আদেশক্রমে লিখি, বৎস বহেরু, গোবিন্দপুরের শ্রীমান মেঘনাধ ভট্টাচার্য আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া অতি অল্প দিনেই সর্বসাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়াছে। অতঃপর সে মেঘুতান্ত্রিক নামে লোকপ্রসিদ্ধ হইবে। তাহার আধার অতি উচ্চ। ক্ষীরোগ্রাম শ্মশানে মায়ের স্বপ্নদেশক্রমে একটি মন্দির নির্মাণকল্পে সে অর্থ সংগ্রহে তোমার নিকট যাইতেছে। তাহাকে সাহায্য করিলে শ্মশানেশ্বরী মাতার সিদ্ধ বর লাভ করিবে। বিমুখ করিলে শ্রীশ্রীমাতার কোপে পড়িবে ইত্যাদি। হাতের লেখা মেঘু ডাক্তারের নিজেরই, চিনতে কারও অসুবিধে হয় না। চিঠির প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রক্তাম্বর রুদ্রাক্ষে সিঁদুর ত্রিশুলে সেজে মেঘুতান্ত্রিক এসে হাজির। লোকে হেসে বাঁচে না। বহু লোককেই ওরকম চিঠি দিয়েছিল মেঘুতান্ত্রিক। বাল-বিধবারা খর-ঝগড়ুটে হয়। মেঘুর বোন আরও এক ডিগ্রি বেশি। সে মেঘুর মালা রক্তাম্বর ছিঁড়েকুটে একশা করল। সেই থেকে মেঘুর মাথা বড় সাফ, সাহসীও বটে। গায়ে একরকম ঘা নিয়ে শেওড়াফুলি থেকে একজন লোক এসেছিল, বহু চিকিৎসায় সারেনি। মেঘু তার ডান হাত থেকে রক্ত সিরিঞ্জে টেনে নিয়ে বাঁ হাতে ভরে দিয়েছিল। লোকটা আশ্চর্যের বিষয়, ভাল হয়ে গিয়েছিল তাতে।
গোবিন্দপুরের যে কজন লোককে বহেরু পছন্দ করে তার মধ্যে মেঘু একজন। খামারবাড়িতে কারও অসুখ হলে মেঘুই এসেছে বরাবর। ব্রজগোপালের সঙ্গে তার ভাবসাব ছিল খুব। প্রায় বলত—ব্রজঠাকুর, দু-বেলা খাওয়ার পর চ্যাটকানো প্লেটে মধু খাবেন দু- চামচ। মধুটা ছড়িয়ে নেবেন, আস্তে ধীরে খাবেন। যত স্যালিভা মিশবে মধুর সঙ্গে, তত ভাল।
কথামতো খেয়ে দেখেছেন ব্রজগোপাল, উপকার হয়।
একদিন বলেছিল—ব্রজঠাকুর, একটা মুষ্টিযোগ দিয়ে রাখি। পাতিলেবুতে মেয়াদ বাড়ে। আর নিরামিষে।।
—মেয়াদটা কী বস্তু? ব্রজগোপাল জিজ্ঞেস করেছেন।
—দুনিয়ার গারদের মেয়াদ। লনজিভিটি।
পুদিনা, সুল্পো আর ধনেপাতা আমলকি দিয়ে বেটে খেলে আর অন্য ভিটামিন দরকার হয় না। ক্ষ্যাপাটে ডাক্তারটা এরকম হঠাৎ হঠাৎ বলত। অব্যর্থ সব কথা। কিছু কিছু ডায়েরিতে লিখে রেখেছেন ব্রজগোপাল। ইচ্ছে ছিল ডাক্তারের পুরো জীবনটাই লিখবেন। কিন্তু মোদো-মাতালের কাণ্ডে তা হয়ে ওঠেনি। পয়সাকড়ি ফুরলে ডাক্তারটা পাগলের মতো হন্যে হয়ে যেত। কুমোরপাড়ার হরিচরণ এক সময়ে তাড়ি বানাত। পুলিশের রগড়ানিতে ছেড়ে দিয়ে একখানা ওষুধের দোকান দিল। গাঁ-ঘরের দোকান, তাতে কবরেজি, হোমিওপ্যাথি, অ্যালোপাথি সবই কিছু কিছু জোগাড় করে রেখেছিল সে। মেঘু ডাক্তার একদিন মৌতাতের সময়ে বিছুটি-লাগা মানুষের মতো সেখানে হাজির। তাড়ির কারবার যে আর নেই তা খেয়ালই করল না। চারপাশটা ক্ষ্যাপা চোখে দেখে নিয়ে ‘শিশিতে তাড়ি বেচিস?’ এই বলে তাক থেকে এলোপাতাড়ি গোটা দুই বোতল তুলে নিয়ে ঢাকাঢ়ক মেরে দিতে লাগল। হরিচরণ হাঁ-হাঁ করে এসে ধরতে না ধরতে আধবোতল অ্যালক্যালাইন মিকশ্চার সাফ। অন্য বোতলটা ছিল ফিনাইলের, সেটা হরিচরণ সময়মতো কেড়ে না নিলে মুশকিল ছিল। পয়সা না পেলে এমন সব কাণ্ড করত মেঘু।
এই মেঘু যখন রাজসাক্ষী হয় তখন ব্রজগোপাল বহেরুকে বলেছিলেন—ওকে হাতে রাখ।
হাতে রাখা সোজা। মেঘুকে মদের পয়সাটা দিয়ে গেলেই চমৎকার। ঝামেলা ঝঞ্ঝাট নেই। কিন্তু বহেরু কেমন একধারা চোখে ব্রজকর্তার দিকে চেয়ে বলেছিল—দেখি।
—দেখাদেখির কী? ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন—এ সময়টা আর তেসিয়ে নষ্ট করিস না। আগে থেকে টুইয়ে রাখ।
কিন্তু কেমন যেন গা করেনি বহেরু। আলগা দিয়ে বলল—মাতাল চাতাল মানুষ, হাত করলেও কী বলতে কী বলে ফেলবে!
