নিশুত রাতে পৃথিবীটা মস্ত বড় হয়ে ওঠে। ব্রজগোপাল শুলেই টের পান, চারধারে ঘুম, নিস্তব্ধতার ভিতরে মনটা নানা কথা কয়ে ওঠে। সে সব কথা ঢেউ-ঢেউ হয়ে চলতে চলতে কোথায় পৌঁছে যায়। আর ঠিক ওরকম সব ঢেউ যেন চারধার থেকে দূর-দূরান্ত পার হয়ে তাঁর দিকেও আসতে থাকে। যেমন নক্ষত্রের আলো, যেমন দূরদেশ থেকে আসা বাতাস, যেমন খঞ্জনা পাখি।
মনের বড় শত্রু নেই। এমনিতে বেশ থাকে, হঠাৎ কু-ডাক ডাকতে শুরু করে। কাজকর্মের মধ্যে থাকলে মনটা বেশ থাকে, কিন্তু একা হলেই মানুষ বোকা। রাতবিরেতে আজকাল ঘুম না হলে একটা ধন্দ ভাব চেপে ধরে ব্রজগোপালকে। বিষয়চিন্তা তাঁর অভ্যাস নয়। কিন্তু বহেরুর মাঝলা ছেলে কোকা জেল থেকে খালাস হওয়ার পর বিষয়-আশয়ের জন্য একটু উদ্বেগ হয়। ছেলেটা এই সেদিনও ছোট্টটি ছিল, পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করে বেড়াত, ফাইফরমাস খাটত। ব্রজগোপালের ঠাকুর পুজোর প্রসাদ একটু বাতাসার কণা কচি হাতখানা পেতে ভক্তিভরে নিত। চোদ্দো-পনেরো বছর বয়স পর্যন্ত কিছু বোঝা যায়নি। তারপরই তেড়া বাঁশের মতো নিজের ইচ্ছেয় বাড়তে লাগল। এখনও তেইশ-চব্বিশ বয়স, তবু চোখে ইতরামি এসে গেছে। কাউকে বড় একটা মানে গোনে না। মাঝেমধ্যে ব্রজগোপালের ঘরে এসে ‘বামুনজ্যাঠা’ বলে ডাক দিয়ে মেঝেয় বসে। কথাবার্তা কয়। কিন্তু ব্রজগোপাল বুঝতে পারেন, ছেলেটার মধ্যে জন্মসূত্রে কোনও দোষ আছে। এ ছেলে যেখানে থাকবে সেখানেই একটা সামাল সামাল পড়ে যাবে। হাতের পাতের টাকা দিয়ে নিজের নামে কিছু জমি কিনেছেন ব্রজগোপাল, স্ত্রীর নামে আছে ছ’বিঘে, আর আছে বাস্তুজমি। ছেলেরা আসবে না এসব দেখতে। তাই কোকার দিকে তাকিয়ে একটু উদ্বেগ বোধ করেন। এই বয়সেই খুন-খারাপি করে ফেলেছে এবং সেজন্য কোনও পাপবোধও নেই। জেলখানা থেকে হাতি হয়ে ফিরেছে। কোকা যে-ছোকরাকে কেটেছিল তাকে চিনতেন ব্রজগোপাল। সোমেনের মতোই বয়স, তেজি চেহারা। পুলিশের ভয়ে পালিয়ে এসে গোবিন্দপুরে এক আত্মীয়-বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। কিছু স্যাঙাৎ জুটিয়ে মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াত। তার রাগ ছিল জোতদারদের ওপরে। কিন্তু এমন কিছু করেনি যে পালটি নিতে হবে। তবু কোকা তাকে কেটে ফেলেছিল। মশা-মাছি মারলেও জীবহত্যা হয়, মানুষ মারলেও তাই। তবু মানুষ যখন মানুষ মারে তখন বোধ হয় তার নিজের রক্তেই একটা বিরুদ্ধ ভাব ওঠে। তার নিজের গড়া আর একটা জীবকে মারলে কি তার ভিতরে একটা আত্মীয়বধের অনুতাপ কাজ করে? নাকি সে, ফাঁসির দড়ি যাবজ্জীবনের মেয়াদ—এসব ভেবে দিশেহারা হয়? ঠিক জানেন না ব্রজগোপাল। তবে মনে আছে, সেদিন রাতে ফিরে কোকা পুকুরে ঝাঁপ খেয়ে দাপাদাপি করেছিল অনেকক্ষণ। যখন তাকে তুলে আনা হয় তখন দুচোখ ঘোলাটে লাল, বেভুল সব বকছে। রাতে গা-গরম হয়ে জ্বর এল। বহেরু লক্ষণ দেখেই চিনেছিল, ব্রজগোপালকে আড়ালে ডেকে বলেছিল—শুয়োরটা নিশ্চয়ই মানুষ খেয়েছে কর্তা। রক্তেরই দোষ। রাত না পোয়াতে বিড়াল পার করতে হবে।
ভোর রাতে কোকাকে প্রথম ট্রেনে কলকাতায় রওনা করে দিয়ে আসতে গিয়েছিল বহেরু। কলকাতা মানুষের জঙ্গল, পালিয়ে থাকার এমন ভাল জায়গা আর নেই। কিন্তু কোকা স্টেশনেই ধরা পড়ে। ধরা পড়বার পর ব্রজগোপাল গিয়েছিলেন দেখা করতে, উকিল সঙ্গে নিয়ে। ছেলেটাকে তখন দেখেছেন, শিবনেত্র হয়ে লাতন বেচারার মতো বসে আছে। ঘন ঘন মাথা ধোয়, চুল তখনও সপসপে ভেজা, মুখটা পাঁশুটে কেমনধারা যেন। অনেককাল রোগভোগের পর মানুষের এমন চেহারা হয়। ছেলেটা সোমেনের বয়সি একটা তাজা ছেলেকে কেটে ফেলেছে, ভাবলে ওর ওপর রাগ ঘেন্না হওয়ার কথা। কিন্তু মুখ দেখলে তখন মায়া হত। ব্রজগোপাল একটু মায়াভরে বলতেন—কেন কাজটা করতে গেলি রে নিব্বংশার পো?
কোকা তখন দিশেহারার মতো চারদিকে চেয়ে গলা নামিয়ে বলত—কাঁধের ওপর দাঁড়িয়েছিল একা। স্যাঙাৎ জুটিয়ে আমাদের ওপর মাতব্বরী করত খুব। পেছুতে লাগত, তাই রাগ ছিল। সেদিন একা দেখে মাথার ঠিক রাখতে পারিনি। এখন তো সবাই মানুষ-টানুষ মারে, কেউ কিছু বলে না। তাই ভাবলাম, একবার মেরেই দেখি না কী হয়। পালান, নেতাই ওরাও সব বললে—দে শালাকে চুপিয়ে। দিনকাল খারাপ বলে অস্তর সঙ্গে থাকত। হাতে অস্তর, মানুষটাও একা, মাথাটা কেমন গোলমাল হয়ে গেল। হাঁকাড় ছেড়ে দৌড়ে যেয়ে চুপিয়ে দিলাম।
ব্রজগোপাল আতঙ্কিত হয়ে বলেছেন—ওরে চুপ চুপ। ওসব কথা কোস না আর ভুলে যা। উকিলবাবু যা শেখাবেন সেই মতো বলবি।
সন্দেহ ছিল, জেরার সময়ে মাথা ঠিক রাখতে পারবে কিনা। কারণ, দেখা করতে গেলেই খুব আগ্রহের সঙ্গে ঘটনাটার বিশদ বিবরণ দিতে শুরু করত কোকা। চোখ দুখানা বড় বড় হয়ে যেত, দম ফেলত ঘন ঘন। বলত—মাইরি, মানুষ যে এমনভাবে মরে কে জানত! আঁ-আঁ করে একটা চিৎকার ছেড়ে ছেলেটা যখন পড়ে যায় তখন রক্তটা এসে গায়ে লাগল। কী গরম রক্ত রে বাবা! পড়ে হি-হি করে কাঁপছিল ছেলেটা। সে কী ভয়ংকর দৃশ্য! কোকাকে তখন চুপ করানো ভারী মুশকিল ছিল।
প্রথম কদিন ঝিম হয়ে পড়ে থাক। কোর্টে জেরার সময়ে নানা উলটোপালটা জবাব দিয়েছিল। সুবিধে ছিল এই যে, যাকে মেরেছিল তার নামে পুলিশের হুলিয়া ছিল। সে নাকি ভারী ডাকাবুকো ছেলে, কলকাতায় পুলিশ মেরে এসেছে। ফলে, কোকা আর তার দলবলের বিরুদ্ধে পুলিশ কেসটা খুব সাজায়নি। উকিলও সুযোগ পেয়ে ‘আত্মরক্ষার জন্য হত্যা’ প্রমাণ করার চেষ্টা পায়। মোকদ্দমা ফেঁসে যাওয়ার মতো অবস্থা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য চারজনের মেয়াদ হয়েছিল। তিনজন আগেই খালাস পেয়ে যায়। সবশেষে খালাস হল কোকা, মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই।
