—ভাবা ঠিকও নয়। বুঝি। তবু মনটা মানে না। কোকাটা এই বয়সেই খুন-খারাপি করে ফেলল!
—খুন-খারাপির কি বয়স আছে না কি! আজকাল কতটুকু কতটুকু সব ছেলে মানুষ মেরে বেড়ায়।
বহেরুর মুখে একটু উদ্বেগ দেখা যায়। বলে—আমিও তো কাটলাম ক’টা। সে-সব কর্মের দোষেই কি ছেলেটাও অমন হল! ওই একটাই একটু বেগোছ রকমের, অন্য ক’টা তো দেখছেন, ভালই।
ব্রজগোপাল অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়েন। মনের মধ্যে হঠাৎ একটা নিঃসঙ্গতা ঘনিয়ে আসে, মেঘলা দিনের মতো। ছোট ছেলেটাকে মনে পড়ে। মায়ের শ্রীই পেয়েছে ছেলেটা। লম্বা রোগাটে বুদ্ধিমান মুখশ্রী। সংসারের গাদ এখনও মনের মধ্যে কোনও তলানি ফেলেনি। ছেলেদের কাছে কিছুই চাওয়ার নেই ব্রজগোপালের। তবু বুক জুড়ে একটা দুর্ভিক্ষের চাওয়া রয়েছে। ভুলেই গিয়েছিলেন, কেন যে দেখলেন মুখখানা!
ব্রজগোপাল অন্যমনস্কভাবে মাথা নেড়ে বলেন—ভাবিস না। যত মায়া করবি তত দুঃখ।
বহেরু তত্ত্বকথা বোঝে না। তবু সায় দিল। বলল—জেলখানার মেয়াদটা বড় টপ করে ফুরিয়ে গেল। আরও কিছুদিন ঘানি টানলে রস মজত।
ব্রজগোপাল অবাক হয়ে বলেন—কেন রে! কোকা তোর কোন পাকা ধানে মই দিল! দিব্যি ঘুরছে-টুরছে, ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে, তোকে ও পায় কীসে!
বহেরু একটু লজ্জা পায়। অপ্রস্তুত চোখ দু’খানা ব্রজকর্তার চোখ থেকে সরিয়ে নিয়ে বলে—পায় না অবশ্য। কিন্তু ওর বড় দাপ্ কখন কী করে ফেলে বুঝে পাই না। ভয় লাগে।
—ছেলেদের ভয় পেতে শুরু করেছিস, তার মানে তোর বয়েসে পেয়েছে।
চিন্তিতভাবে বহরু আস্তে করে বলে—ওর মতলব ভাল নয়। আপনার ছাওয়ালরা যদি জমিটমি বুঝে না নেয় তো আমরা চোখ বুজলে ও সব হাতিয়ে নেবে। ভাবি, সৎ ব্রাহ্মণের সম্পত্তি খেয়ে শেষমেশ নির্বংশ হয়ে যাবে না তো! আপনাকে ও খুব মানে, কিন্তু বড় লোভ ছেলেটার।
ব্রজগোপাল উদাস গলায় বলেন—হাতানোর দরকার কী! তেমন বুঝলে আমি ওর নামে সব লেখাপড়া করে দেব।
—তাই কি হয়।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—আমার ছেলেরা আসবে না কখনও। ওদের কলকাতায় পেয়েছে।
বহেরু একটু আগ্রহভরে বলে—তার চেয়ে কেন বেচে দেন না কর্তা! আমি কিনে নেব।
—বেচব! বলিস কী? মা’টি হল মাটি। রামকৃষ্ণদেবের কথা। মা কি বেচবার জিনিস! একসময়ে আমার ঠাকুর বলেছিলেন—বড় দুর্দিন আসছে, সব সোনা মাটি করে ফেল। সেই তখন হাতের পাতের যা ছিল, আর সোনাদানা বেচে মাটি কিনতে লাগলাম। সে মাটি বেচব কী বলে? ছেলেরা যদি না বোঝে না বুঝুক।
বহেরু একটা শ্বাস ফেলল মাত্র। তার প্রকাণ্ড শরীরটার কোথায় একটা দুর্বলতা আর ভয়ের পচন শুরু হয়েছে।
॥ তেইশ ॥
এখানে দিন শুরু হয় সূর্য উঠবার অনেক আগে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, চারদিকে ফ্যাকাসে কুয়াশার ভূত। কালো পাহাড়ের মতো শীত জমে থাকে। শিশিরে মাটি ভিজে থাকে এমন, যেন বৃষ্টি হয়েছে। দিগম্বরের খোলের প্রথম বোলটি ফোটে, ব্রজগোপালের বউলঅলা খড়মের শব্দটি পাওয়া যায়, আর তখনই বহেরুর বড় জামাই কালীপদর গান শোনা যায়—জাইগতে হবে, উইঠতে হবে, লাইগতে হবে কাজে…।
ঘড়ির অ্যালার্ম আর বাজে না। তবু উঠতে কোনও অসুবিধে হয় না। ঘুম বড় একটা আসে না তো। এপাশ-ওপাশ করে রাত কাটে। হারিকেনের পলতে কমানো থাকে, ঘরে একটা পোড়া কেরোসিনের গন্ধ জমে। টিনের চালের ওপর টুপটাপ শিশির খসে পড়ার শব্দ হয়। আসেপাশে শেয়াল ডাকে, হাঁসের ঘর থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ আসে, ঘুমের মধ্যে মুরগি ভুল করে ডেকে ওঠে হঠাৎ। নিশুতি রাতে দূরের শব্দ সব শোনা যায়। গন্ধ বিশ্বেসের বহুমূত্র রোগ। অন্ধ-প্রায় মানুষ বলে ঘরে মেটে-হাঁড়ি রাখা থাকে। ঘুম-চোখে ঠাহর না পেয়ে মাঝেমধ্যে হাঁড়ি উলটে ফেলে ঘর ভাসায়। সেই পেচ্ছাপ কাচতে গিয়ে বিন্দুর মা বেহান বেলাটার বাপ-মা তুলে বকাঝকা করে বলে গন্ধ হাঁড়ি উলটে ফেলেই আর্তনাদ করে বেড়ালের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে চেঁচায়—হঃই শালা মেকুর, হঃই…অ্যা-অ্যা-অ্যা….। এভাবে সে সাক্ষী রাখার চেষ্টা করে। গোটা চারেক সড়াল কুকুর সারা রাত চেঁচিয়ে পাহারা দেয়। নমঃশুদ্র বৃন্দাবন লাঠি ঠুকে চৌকি দিয়ে ফেরে। ব্রজগোপাল প্রায় সারা রাত এসব শব্দ শোনেন। শরীরের তাপে বিছানাটা তেতে ওঠে। পাশ ফিরলেই একটা শীতভাব টের পান। আরাম লাগে। এ বয়সে শীতটা বেশ লাগার কথা। কিন্তু লাগে না। বোধ হয় রক্তের চাপ বেড়েছে। তাঁতি লোকটা এ ঘরে ঘুমোয়। ব্যবস্থাটা বহেরুর। সে বলে—বুড়ো মানুষ একা থাকেন, কখন কী হয়ে পড়ে, একটা লোক ঘরে থাকা ভাল। ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে বলেন—তোর বয়সটা কি কম নাকি! বহেরু হাঁ হাঁ করে বলে—ভদ্রলোকের জান আর ছোটলোকের জান কি এক! তা ছাড়া আমার জন আছে, আপনারে দেখে কেডা?
কথাটা আজকাল লাগে। একটু ভয়ও হয়। মৃত্যুভয় নয়, এ অন্য রকমের এক ভয়।
এখান থেকে কলকাতার দূরত্বটা হিসেব করে দেখেন, খবর পেলে মুখাগ্নি করতে সময়মতো ছেলেরা কেউ এসে পড়তে পারবে তো!
—তাঁতি লোকটার মশারি নেই। চটের ভিতরে খড় ভরে একটা গদি বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটার ওপর সটান মাটিতে পড়ে থাকে। মাথা পর্যন্ত কাঁথায় ঢাকা, তবু ফাঁকফোকর দিয়ে মশা ঢুকে কামড়ায়। ঘুমের মধ্যেই চটাস চটাস মারে। প্রায় রাতেই শোওয়ার সময় হারিকেনের টিপ খুলে কেরোসিন আধ কোষ তেলোয় ঢেলে সরষেতেলের মতো গায়ে মুখে মেখে নেয়। তবু ঠিক কামড়ায়। ক্রিমি আছে বোধ হয় ঘুমের মধ্যে দাঁত কড়মড় করে, স্বপ্নের মধ্যে কথা বলে। ব্রজগোপাল বিরক্ত হন! পাকা ঘুম তাঁতির, ডাকলে সহজে ওঠে না। আর এক চিন্তা ব্রজগোপালের, চৌকির তলায় স্যুটকেস আছে, টেবিলে ঘড়ি, দড়িতে কিছু জামাকাপড়, দামি একটা দশবাতির ল্যাম্প—একটা কিছু তুলে নিয়ে মাঝরাতে তাঁতি সটকায় যদি? এমন কিছু মহামূল্যবান দ্রব্য নয়, চোরের লাভ হবে না, কিন্তু গেরস্তর তো ক্ষতি! তাই সতর্ক থাকেন ব্রজগোপাল। কোথাকার সব উটকো লোকজন ধরে আনে বহেরু। এসব লোককে বিশ্বাস কী? এসব মিলেঝুলে আজকাল ঘুম কমে গেছে। বুড়ো বয়সে অবশ্য ঘুম কমে যায়। এ বয়সে শরীরের কল বড় আনমনা, নিজের ক্ষয়ক্ষতি আর পূরণ করে নিতে চায় না।
