এত উৎসাহে আর চিৎকারেই বোধ হয় দিশাহারা হয়ে স্তম্ভটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল। বুড়ির হাঁড়ির নীচে কালো, জীর্ণ মানুষের শরীর দলা পাকিয়ে গেল।
ব্রজগোপাল শ্বাস ছেড়ে বললেন—দূর! আগেই ভেবেছিলাম। বহেরু, এবার চল।
বহেরুর যেতে অনিচ্ছা। বলল—দেখে যাই। কেউ না কেউ তো পারবেই।
—পারলে পারবে। তা বলে কতক্ষণ দাঁড়াবি?
বহেরু আস্তে করে বলে—আমার দল থাকলে একবার দেখতাম কর্তা। হাঁড়িটা বড্ড উঁচুতে বেঁধেছে, কিন্তু পারা যায়। গা গতর থাকলে কিছু শক্ত কাজ নয়।
ব্রজগোপাল বললেন—জেদ করলে সব পারা যায়, লোভ করলেই কিছু হয় না।
বহেরু বলে—এ তাম্শাটা আমাদের ওখানে একবার দিলে হয়।
পরের দলটাও তিন থাক তৈরি করেছিল। শেষ লোকটাই পারল না। লোকজন চেঁচাচ্ছে লাউডস্পিকার আশ্বাস দিয়ে বলছে—কেউ না কেউ পারবেনই। এগিয়ে আসুন। হতাশ হবেন না।
এ খেলাটার মধ্যে ব্রজগোপাল লোভ দেখতে পান। বহেরু দেখে লড়াই। বুড়ির হাঁড়ির গায়ে মালার মতো পরানো নোটগুলোয় বাতাস এসে লাগে। মাটি থেকে হাঁড়ি, মাঝখানে নিশূন্য ফাঁকা জায়গাটা। সেটুকু জায়গার মাঝখানে কত কী খেলা করছে। খেলা, লোভ, লড়াই।
গোটা ছয়েক দল পর পর চেষ্টা করল। পারল না। বহেরু উত্তেজিত হয়ে বলে—কেউ পারল না! অ্যাাঁ। একটা দলে ঢুকে পড়ব নাকি কর্তা? এ বুড়ো কাঁধে এখনও যা জোর আছে তা এদের কারও নেই।
—দূর! শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢোকা! চল্। পিরামিডের খেলা অভ্যাস করতে হয়। শুধু ভার বইতে পারলেই হল না, ভারসাম্য রাখা চাই। সে বড় শক্ত।
বহেরু চমৎকার দাঁত দেখিয়ে হেসে বলে—কথার কথা বলছিলাম আর কী! সব হা-ঘরে কোত্থেকে এসে জুটেছে টাকার গন্ধে। এদের কম্ম নয়। তবে বড় ভাল খেলা, গোবিন্দপুরে একবার খেলাটা দেব। দুশো টাকা বেঁধে দেব, কে লড়বি লড়ে যা। সে মজা হবে!
বহেরু চমৎকার দাঁত দেখিয়ে হেসে বলে—কথার কথা বলছিলাম আর কী! সব হা-ঘরে কোত্থেকে এসে জুটেছে টাকার গন্ধে। এদের কম্ম নয়। তবে বড় ভাল খেলা, গোবিন্দপুরে একবার খেলাটা দেব। দুশো টাকা বেঁধে দেব, কে লড়বি লড়ে যা। সে মজা হবে!
এই সময়ে ডাকাবুকো হোঁতকা চেহারার একটা দল এসে নীরবে হাঁড়ির নীচে দাঁড়াল। তাদের সর্দার যে ছোকরা তার শরীর বিশাল। যেমন মাথায় উঁচু, তেমনি চওড়া কাঁধ। সে মাথা তুলে হাঁড়িটা একবার দেখে নিল। লাউডস্পিকারে ঘোষণা হতে থাকে—একবার বুড়ির হাঁড়ির দিকে হাত বাড়াবেন গোবিন্দপুরের কোঁড়ারপাড়া মিলন সমিতি ব্যায়ামাগারের যুবকবৃন্দ। এবার আমরা বেশ বুঝতে পারছি যে মিলন সমিতি বুড়ির হাঁড়ি প্রতিযোগিতা থেকে খালি হাতে ফিরে যাবেন না।
বহেরু হাঁ হয়ে সর্দারকে দেখছিল। মুখ ফিরিয়ে বলল—কর্তা, ওই কোকার দল এসে গেছে।
—কই?
—ওই দেখুন।
বহেরুর মাঝের ছেলে, সদ্য জেল-ফেরত কোকা এখন কোমরে হাত দিয়ে চারধারে চেয়ে দেখছিল। তার শরীরটা অঢেল। ভগবান ঢেলে দিয়েছে অস্থি-মজ্জা-মাংস। চোখ দুখানা ভয়ংকর। ব্রজগোপাল বহেরুকে বললেন—ডাকিস না। কী করে দেখি।
বহেরুনীরবে মাথা নাড়ল। চারদিকে প্রচণ্ড হাততালি। চেহারা দেখেই মানুষ বুঝে গেছে, এরা পারনেওয়ালা লোক।
কোকা দাঁড়াল নীচের থাকে। সেখানে চারজন সবচেয়ে মজবুত চেহারার ছোকরা। তাদের কাঁধে অনায়াসে নৈপুণ্যে উঠে গেল তিনজন। পা কাঁপল না, টলল না কেউ। মুহূর্ত পরে আর দুজন উঠে গেল তিজনের কাঁধে। সর্বশেষ একজন বানরের মতো চটুল হাত-পায়ে উঠে গেল ওপরে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বুড়ির হাঁড়িটা দুলিয়ে দিল হাত দিয়ে। হাততালিতে তখন ফেটে পড়ছে চারদিক, চেঁচানিতে কান পাতা দায়। ভিড় এতক্ষণ গোল হয়ে ঘিরেছিল জায়গাটা, এখন হাঁড়ি-ছোঁওয়া হয়ে গেলে মাঠময় ছেলেপুলে লোকজন হুটোপাটি লাগিয়েছে।
এত সহজে, অনায়াসে ওরা হাঁড়িটা ছুঁল যে বিশ্বাসই হতে চায় না। ওদের হাঁড়ি-ছোঁওয়া দেখে মনে হয় যে কেউ পারে।
বহেরু বলে—ধুস্! এ তো দেখছি ফঙ্গবনে খেলা। আনাড়িগুলোই নাজেহাল হচ্ছিল এতক্ষণ।
ব্রজগোপাল হেসে বলেন—দূর বোকা! সহজ মনে হয় বলে কি সহজ! দক্ষতা জিনিসটা এমনি, শক্ত কাজটাও এমনভাবে করে যেন গা লাগাচ্ছে না বলে মনে হয়।
বহেরু ভারী খুশি। বুড়ির হাঁড়িটা তার ছেলের দল ছুঁয়েছে। ভিড়ের দিকে খোঁটা-ওপড়ানো গোরুর মতো বেগে ধেয়ে যেতে যেতে বহেরু বলে—দাঁড়ান, একবার কোকাকে দেখে আসি।
ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে একটা ধমক দেন—তোর দেখা করার কী? ছেলেছোকরারা এ-সময়ে নানারকম ফুর্তিফাৰ্তা করবে এ-সময়ে সেখানে বাপ-দাদা হাজির হলে কি খুশি হয়? চলে আয়।
বহেরু থমকে যায়। কথাটা বড় ঠিক। এইসব পরামর্শ ঠিক সময়মতো দেন বলেই ব্ৰজকর্তাকে তার এত প্রয়োজন।
পিছিয়ে এসে বহেরু বলে—যাব না?
—কেন যাবি?
—তা হলে চলুন বরং। বলে হাঁটতে হাঁটতে একটা শ্বাস ফেলে সে। তারপর গলাটা নামিয়ে বলে—ছাওয়ালটাকে কেমন বোঝেন?
—কেমন আর! হাঁকডাকের মানুষ হবে, তোর মতোই।
বহেরু দুঃখিতভাবে মাথা নাড়ে। বলে—তাই কি হয়? আমি বরাবর মানী লোকের মান দিই। ও দেয় না। দিনেকালে ও সবকিছু দখলে নেবে। দেখবেন।
ব্রজগোপাল আস্তে করে বলেন—দেখার জন্য আমরা কেউ থাকব না। নেয় তো নেবে আমাদের কী রে? আমাদের ডংকা বেজে গেছে। সংসার নিয়ে অত ভাবিস না।
