—তা হলে রওনা হয়ে পড়ো। আমার জন্য দেরি করার দরকার নেই।
—যাচ্ছি। বলে একটু ইতস্তত করে বলে—আমাকে কোনও দরকার হলে—
ব্রজগোপাল অন্ধকারে একটু অবাক গলায় বললেন—দরকার! সে তেমন কিছু নয়।
সোমেন প্রত্যাশা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে লাজুক গলায় বললেন—তুমি ভেবো না। দরকারটা বাপ ছাড়া কেউ বোঝে না।
—কী দরকার বাবা?
—তোমার গায়ের গন্ধটুকু আমার দরকার ছিল। আর কিছু নয়।
॥ বাইশ ॥
ভাগচাষির কোর্ট থেকে বেরিয়ে ফেরার পথে একজায়গায় দাঁড়িয়ে গেল বহেরু। রাস্তার ধার ঘেঁষে মাঠমতো জায়গায় খেলা জমেছে। রাজ্যের লোক ভিড় করে ঘিরে আছে, লাউডস্পিকার বাজছে। দু-ধারে দুটো মস্ত গাছে বিশ পঁচিশ ফুট উঁচুতে টানা দড়ি বাঁধা, দড়ির মাঝ বরাবর একটা মেটে হাঁড়ি ঝুলছে। হাঁড়ির গায়ে সুতোয় গাঁথা দশ টাকার নোট হাওয়ায় উড়ে উড়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে মানুষজনকে। কম নয়, এই দুর্দিনের বাজারে একশোটা টাকা। লাউডস্পিকারে হিন্দি গান থামিয়ে ঘোষণা হচ্ছে—বন্ধুগণ, এ হচ্ছে বুড়ির হাঁড়ি। হাঁড়ির গায়ে একশো টাকা গাঁথা আছে, যে ছুঁতে পারে তার। কিছু শক্ত নয়, খুব সোজা খেলা। দেখুন, এবার আসছেন সিমলেগড়ের যুবক সংঘ।
আবার হিন্দি গান শুরু হয়।
ব্রজগোপাল বিরক্ত হয়ে বলেন—দাঁড়ালি যে!
বহেরু একটু হেসে লাজুকভাবে বলে—বলে র’ন একটু দেখে যাই।
—তোর আর বয়স হল না।
বহেরু গায়ের চাদরখানা খুলে ঝেড়ে ভাঁজ করে। কাঁধে ফেলে বলে—দুনিয়ার হাজারো মজা। দেখে-টেখে যাই সব।
—তো তুই দাঁড়া। আমি এগুতে থাকি, তুই চোটে হেঁটে আসিস।
বহেরু তখন মজা দেখছে। একবার মাথা নাড়ল কেবল। দশজনের দল, চারজন গোল হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াল, তাদের কাঁধে ভর দিয়ে উঠল তিনজন। নীচের চারজন টলোমলো। তাদের মাঝখানের ফোকর দিয়ে সাবধানে আর দুজন উঠছে। কাঁধে পা রাখতেই নীচের চারজন ঠেলাঠেলি শুরু করে দেয়।
লাউডস্পিকারে গান থামিয়ে উৎসাহ দেওয়া হতে থাকে—আপনারা পারবেন। চেষ্টা করুন, শক্ত হয়ে দাঁড়ান। বুড়ির হাঁড়ি আপনাদের নাগালের মধ্যেই এসে গেছে প্রায়। শক্ত হয়ে দাঁড়ান, ভরসা হারাবেন না…
লাউডস্পিকারে গান থামিয়ে এদের উৎসাহ দেওয়া হতে থাকে-আপনারা পারবেন। চেষ্টা করুন, শক্ত হয়ে দাঁড়ান। বুড়ির হাঁড়ি আপনাদের নাগালের মধ্যেই এসে গেছে প্রায়। শক্ত হয়ে দাঁড়ান, ভরসা হারাবেন না…
কিন্তু মানুষের স্তম্ভটা ভেঙেই গেল। হুড়মুড় করে ওপরের ছোকরারা পড়ে গেল এ ওর ঘাড়ে। চারধারে একটা হাসির চিৎকার উঠল।
—যাঃ, পারল না! ব্রজগোপাল বললেন।
বহেরু মুগ্ধ হয়ে খেলাটা দেখছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে ব্রজগোপালকে দেখে বলল—যাননি?
—মজাটা মন্দ নয়, তাই দাঁড়িয়ে গেলাম।
—ভারী মজা। র’ন, একটু দেখে যাই।
লাউডস্পিকারে ঘোষণা হয়—এবার বুড়ির হাঁড়ি কারা ছোঁবেন চলে আসুন। কোনও প্রবেশমূল্য নেই, দশজনের যেকোনও দল চলে আসুন। বুড়ির হাঁড়ি আপনাদের চোখের সামনে ঝুলছে, হাতের নাগালের মধ্যেই। পুরস্কার নগদ একশো টাকা…নগদ একশো টাকা।
ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি হতে থাকে। রোগা-রোগা কালো-কালো চাষিবাসি গোছের কয়েকজন মাঠের মাঝখানে ফাঁকা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ায়। উপোসী চেহারা, গায়ে জোর বল নেই।
লাউডস্পিকার বলতে থাকে—এবার আসছেন বেলদার চাষিভাইরা। মনে হয়, এ-বছর এঁরাই বুড়ির হাঁড়ি জিতে নেবেন। এঁরা প্রস্তুত হচ্ছেন, আপনারাও এঁদের উৎসাহ দিতে প্রস্তুত থাকুন।
আবার হিন্দি গান বাজে।
ব্রজগোপাল বলেন—এরা কি পারবে?
বহেরু একটু হাসে—তাই পারে! শরীলে আছে কী? ভাল করে দম নিতে পারে না।
ব্রজগোপাল শ্বাস ফেলে বলেন—টাকা দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। লোক হাসাতে নেমে গেছে।
—সেইটেই তো মজা।
রোগা, আধবুড়ো, মরকুটে চেহারার লোকগুলো হাঁড়ির নীচে দাঁড়াতেই চারদিকে হুল্লোড় পড়ে গেল। লোকগুলোও অপ্রতিভভাবে হাসে চারদিকে চেয়ে। তারা যে মজার পাত্র তা বুঝে গেছে। তবু চারটে লোক কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়ায়, তিনজন আঁকুপাঁকু করতে করতে কাঁধের ওপর দাঁড়ায়। ভারী বেসামাল অবস্থা, চারজনের পিঠে তিনজন দাঁড়াতেই নীচের চারজনের পিঠ বেঁকে যাচ্ছে। মাটির দিকে নেমে যাচ্ছে মাথা। তবু ঠেলাঠেলি করে তারা সামাল দেয়। এখনও বুড়ির হাঁড়ি অনেক উঁচুতে। মাঝখানে অনেকটা শূন্যতা। বাতাসে ফুরফুর করে ওড়ে সুতোয় বাঁধা দশখানা নোট। বুড়ির হাঁড়ি দোল খাচ্ছে। চারজনের পিঠে তিনজন দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ দম নেয়। তারপর আর দুজন উঠতে থাকে চারজনের মাজায় পা। রেখে, পিঠ বেয়ে। ভারী কষ্টকর কসরত। তবু ধীরে ধীরে দুধার দিয়ে দুজন শেষ পর্যন্ত ওপরের তিনজনের কাঁধের ওপর গিয়ে খাড়া হয়। প্রবল চিৎকার ওঠে চারদিকে। লাউডস্পিকার বলতে থাকে—পেরেছেন, আপনারা পেরেছেন! আর মোটে একজন উঠে দাঁড়াতে পারলেই বুড়ির হাঁড়ি জিতে যাবেন। সাহস করুন, শক্ত হয়ে দাঁড়ান।
রোগা, জীর্ণ মানুষের তৈরি স্তম্ভটা অবিশ্বাস্যভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। পিঠগুলো বেঁকে যাচ্ছে, শ্বাস পড়ছে হপর হপর। টলছে, তবু দাঁড়িয়ে আছে। বুড়ির হাঁড়ি আর মাত্র এক-মানুষ উঁচুতে। সর্বশেষ লোকটা হালকা-পলকা, অল্পবয়সি। জিব দিয়ে ঠোটটা একবার চেটে আস্তে পা তুলল নীচের চারজনের একজনের মাজায় ভর রেখে উঠল। হাত বাড়াল দ্বিতীয় স্তরটায় ওঠার জন্য। প্রচণ্ড হাততালি দিয়ে উঠল লোকজন, চেঁচাল—বাহবা! সাবাস! লাউডস্পিকারে ঘোষক বলতে থাকে—পারবেন। নিশ্চয়ই পারবেন। উঠে পড়ুন।
