—উ! বলে ব্রজগোপাল মুখটা ঘুরিয়ে হাসলেন। বললেন, না, এ ভারী কিছু নয়।
—দিন না!
একটু লাজুকভাবে সংকুচিত ব্রজগোপাল বললেন—ক্যাম্বিসের ব্যাগ, এ তোমার নিতে লজ্জা করবে। মানায়ও না।
সোমেন একটু হেসে ব্যাগটা প্রায় কেড়েই নেয়। ব্রজগোপাল খালি হাতটা ব্যাপারের মধ্যে টেনে নেন। সোমেন টের পায়, বুড়োর মনটা ভাল নেই। ভরভরতি সংসারটা দুটো চোখে দেখে ফিরে যেতে হচ্ছে। সোমেনের মনটা কেমন করে। বলতে কী এই প্রথম বয়সকালে সে বাবাকে একটু একটু চিনছে।
ব্রজগোপাল দু-কদম পিছিয়ে তার পাশ ধরে বললেন—আমি আজ তোমার জন্যই বসেছিলাম। ভাবলাম দেখাটা করে যাই। নইলে সন্ধের গাড়িটা ধরতে পারতাম।
সোমেন একটু বিস্মিত হয়ে বলে—কোনও দরকার ছিল বাবা?
—না, না। তেমন কিছু নয়। এমনিই। ভাবলাম বসেটসেই তো আছে, অথচ ওদিকে এক-আধবার যাও-টাও না।
—হাতে একটা টিউশনি আছে।
—সে তো সন্ধেবেলা একটুখানি। বাদবাকি দিনটা তো ফাঁকা। ছুটিছাটার দিনও আছে।
সোমেন উত্তর দেয় না।
ব্রজগোপাল বলেন—টিউশনিটা করছ করো। কিন্তু বাড়ি বাড়ি ঘুরে পড়ানো অনেকটা ফিরিঅলার কাজ। ওটা অভ্যাসগত করে ফেললা না।
—পেয়েছি তাই করছি। বসেই তো থাকি।
—খারাপ বলছি না, ব্রজগোপাল নিজেকে সামলে নেন। বলেন—কিন্তু তোমরা মাঝেমধ্যে ওদিকে গেলে জমিজমার একটা বুঝ-সমঝ হয়। ব্রজগোপাল আবার আস্তে করে বলেন—অবশ্য আমি তোমাদের টেনে নিতে চাইছি না। তোমার মায়ের সেটা বড় ভয়ের ব্যাপার। আমি বলছিলাম, বসেই যখন আছ তখন—
কথাটা শেষ করতে পারে না ব্রজগোপাল। গলায় কী একটু আটকায় বোধ হয়।
সোমেন বলে—একা আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে ওখানে।
—না, না। একা বেশ আছি। বহুকালের অভ্যাস। কাউকেই দরকার হয় না তেমন। কিন্তু তোমার মায়ের সন্দেহ, আমি ছেলেদের কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। পাগল! তাই কি হয়!
হাঁটতে হাঁটতে তারা ব্রিজের তলার কাছে চলে আসে। একটা ট্রেন সাঁ করে বেরিয়ে গেল। ব্রিজের ওপরে মহাভার নিয়ে চলে যাচ্ছে ডবলডেকার, বিমগুলো কাঁপে। ব্রজগোপাল একবার ওপরের ছুটন্ত বাড়িঘরের মতো বাসের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। থেমে ব্যাপারটা ভাল করে জড়িয়ে নিলেন গায়ে। বললেন—তোমার সঙ্গে দেখা করাটাই দরকার ছিল। ভাবছিলাম, হয়তো আজও দেখা হবে না। হয়ে গেল।
সোমেন বলল—কিছু দরকার থাকলে বলুন।
—দরকার! বলে ব্রজগোপাল সামান্য হাসেন—তেমন কিছু নয়। ছেলেকে যে বাপের কেন দরকার হয় তা বাবা না হলে কী বোঝা যায়!
ব্রজগোপাল একটু শ্বাস ফেললেন। সোমেন সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে। ফাঁকা থেকে ক্রমে ভিড় আর আলোর মধ্যে এসে পড়ে। বাসস্টপ আর দূরে নয়। ব্রজগোপাল খুব আস্তে হাঁটেন। সামান্য রাস্তাটুকু যেন দীর্ঘ করে নেওয়ার জন্যই। বলেন—রণো কদিন আগে হঠাৎ গিয়ে হাজির। স্টেশনে দেখা হল, ও তখন ফিরছে। নানা কথার মধ্যে হঠাৎ বলে ফেলল- বাবা, সংসারে বড় অশান্তি। ভেঙে কিছু বলল না। সেই থেকে মনটা বড় খারাপ হয়ে আছে। চাপা ছেলে, সহজে কিছু বলে না। কীসের অশান্তি তা তো আর আমার বুঝবার কথা নয়। আমি বাইরের মানুষ। কিন্তু শুনলে পরে মন ভাল লাগে না।
সোমেন সতর্ক হয়ে গিয়ে বলে—ওসব কিছু নয়। একটু বোধ হয় মন কষাকষি হয়েছিল, মিটে গেছে।
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। বুঝেছেন, বললেন—তাই হবে। তোমার মা কী কথায় যেন আজই বলছিলেন, তুমি নাকি আলাদা বাসা খুঁজছ!
মার মুখ বড় পলকা। কিছু চেপে-ঢেকে রাখতে পারে না। মনে মনে বড় রাগ হল সোমেনের। মুখে বলল—ও বাড়িতে জায়গা কম, লেখাপড়ার একটা ঘর দরকার। তাই ভাবছিলাম।
ব্রজগোপাল বুঝদারের মতো বললেন—ও।
কিন্তু কথাটা যে বিশ্বাস করলেন না তাঁর নিস্পৃহতা থেকে বোঝা গেল। একটা শ্বাস ফেললেন। এবং শ্বাসের সঙ্গে বললেন—মানুষের সওয়াবওয়া বড় কমে গেছে।
—বাবা, আপনি ষোলো নম্বর বাসে উঠে পড়ুন।
—তাই ভাল।
স্ট্যান্ডে বাস দাঁড়িয়ে আছে। বসার জায়গা নেই। ব্রজগোপাল বাসে উঠে রড ধরে দাঁড়ালেন। একা ব্রজগোপালই দাঁড়িয়ে আছেন, আর সবাই বসে। বাসের দরজা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে সোমেন। একা দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে বড় অদ্ভুত দেখাচ্ছে। বলল—বাবা, আপনি নেমে আসুন। পরের বাসে যাবেন।
—থাকগে, দেরি হয়ে যাবে।
—দাঁড়িয়ে যেতে আপনার কষ্ট হবে।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বললেন—না, কষ্ট কী! পারব।
সোমেন ছাড়ল না, উঠে গিয়ে বাবার হাতের ব্যাগটা নিয়ে বলে—আসুন।
ব্রজগোপাল এই আদরটুকু বোধ হয় উপভোগ করে একটু হাসলেন। এই ছেলেটা তাঁর বড় মায়াবী হয়েছে। নেমে এলেন। পরের ষোলো নম্বর বাসটা ফাঁকা দাঁড়িয়ে আছে। স্টার্টারকে জিজ্ঞেস করে নিয়ে সোমেন বাবাকে ফাঁকা অন্ধকার বাসটায় তুলে দেয়। অবশ্য একেবারে ফাঁকা নয়। অন্ধকারে দুটো একটা বিড়ি বা সিগারেটের আগুন শিসিয়ে ওঠে। ব্রজগোপাল বসলেন। বললেন—আজকাল সব জায়গায় বড় ভিড়।
—হ্যাঁ।
—তবু মানুষ কত কম।
কথাটার মধ্যে একটা নিহিত অর্থ আছে। সোমেন বুঝল। কিছু বলল না। ব্রজগোপাল জিজ্ঞেস করলেন—তুমি কোথায় যাবে?
সোমেনের একটু বিপদ ঘটে। সে যাবে বালিগঞ্জ সারকুলার রোডে। গাব্বুকে পড়াতে। সেখানে এই বাসেও যাওয়া যায়। কিন্তু বাবার সঙ্গে আর বেশিক্ষণ থাকতে তার এরকম অনভ্যাসজনিত অনিচ্ছা হতে থাকে। একটা সিগারেটও খাওয়া দরকার। সে বলল—এই কাছেই যাব।
