ননীবালা অসন্তোষের গলায় বলেন—ওসব ভাবতে গেলে গন্ধমাদন। সবাই যেমনভাবে চাকরি করে ওরাও তাই করবে।
ব্রজগোপালের আজকাল রাগ-টাগ কমে গেছে। হাসলেন। বললেন—জানি। ময়না এমনিতে কত কথা বলে, কিন্তু বেড়ালে সে ট্যাঁ-ট্যাঁ। সংসার রগড়ালে কত বাবাজি ভেক ছেড়ে ‘জন’ খাটতে যায়। তোমার ছেলেরাও তাই হবে। তবু বলি, আমার ওই এক দোষ।
বলে একটু শ্বাস ছেড়ে সোমেনের দিকে তাকান ব্রজগোপাল। বলেন—আমার সঙ্গে কোনও কিছুর বনে না। বুঝলে? আমি যা বুঝি তাই বুঝি। বুড়ো হয়েছি বাবা, বেশি কথা বলে ফেলি।
বাবার গলায় চোরা-অভিমানটা খুব গোপনে, কিন্তু তীক্ষ্ণভাবে আঘাত করে সোমেনকে। চোখের দৃষ্টিতে একটা অসহায় ভাব। দুনিয়াজোড়া সবাই তাঁর প্রতিপক্ষ বুঝি। বনল না। দান ওলটাবে না, লড়াই ছেড়ে সরে যাওয়ার জন্যই বুঝি প্রস্তুত তিনি। বাণপ্রস্থও শুরু হয়েছে।
সোমেন তাড়াতাড়ি বলে—না বাবা। আপনার কথাগুলো তো ভালই।
ব্রজগোপাল ক্ষণেক নীরব রইলেন। আস্তে করে বললেন—হবে। আমি মনিব কথাটা বড় মানি। চাষবাস করতে গিয়ে দেখেছি অমন খেয়ালি মনিব আর হয় না। মাটির পিছনে যত খাটবে, যত তাকে পুষ্টি দেবে, সেবা দেবে তত ফসল ঘরে অসবে। সেখানে দাবি আদায় সেই, চুরি-জোচ্চুরি চলে না, ধর্মঘট না। সেখানে সার্ভিস মানে চাকরি নয়, সেবা। মানুষের এই বুঝটা সহজে হয় না। যে দেশের যত উন্নতি হয়েছে সে দেশের লোক তত মনিবকে মানে। সে চাকরিতেই হোক, আর স্বাধীন বৃত্তিতেই হোক। বেশি সিকিউরিটি আর কম ঝামেলা বলে কিছু নেই। দেশ কথাটাই এসেছে আদেশ থেকে। যে বৃত্তিতে থাকো তার আদেশ মানতেই হয়। যত ঝামেলাই আসুক। ডিউটিফুল ইজ বিউটিফুল।
ননীবালা চুপ করে ছিলেন এতক্ষণ। এখন বললেন—ওসব কথা ওদের বলছ কেন? তোমার ছেলেরা কি খারাপ?
ব্রজগোপাল সন্ত্রস্ত হয়ে ছেলেদের মুখের দিকে একবার চেয়ে দেখলেন। তারপর খুব কুন্ঠার সঙ্গে প্রসঙ্গ পালটে বললেন—তা বলিনি। চাকরি পাওয়াও সোজা নয়। আর চাকরি পেলেই বা কী! বাঁধা মাইনে, গণ্ডীবদ্ধ জীবন, মানুষ ছোট হতে থাকে।
ননীবালা বাতাস শুকে কী একটা বিপদের গন্ধ পান। হঠাৎ ছোবল তুলে বলেন—তো তুমি ওকে কী করতে বলো?
ব্রজগোপাল যেন আক্রমণটা আশঙ্কা করছিলেন। একটু মিইয়ে যায় তাঁর গলা। বলেন—পেলে তো চাকরি করবেই। আমি তো ঠেকাতে পারব না। যতদিন না পাচ্ছে ততদিন আমার কাছে গিয়ে থাকতে পারে। যা আছে সব বুঝেসুঝে আসুক।
ননীবালা কুটিল সন্দেহে চেয়ে থাকেন স্বামীর দিকে। গলায় সামান্য ধার এসে যায়। বলেন—ও সেখানে যাবে কেন চাষাভুষোর সঙ্গে করতে? বহেরুরা লোকও ভাল না। চাষার ধাতও ওর নয় যে, জলে কাদায় জেবড়ে চাষ করতে শিখবে। ও সব বলে লাভ নেই।
ননীবালার কথার ধরনেই একটা রুখেওঠার ভাব। যেন বা তাঁর সন্তানকে কেড়ে নিতে এসেছেন ব্রজগোপাল। তিনি পাখা ঝাপটে আড়াল দিচ্ছেন পক্ষিণীর মতো।
ব্রজগোপাল রণেনের দিকে চেয়ে বলেন—তুমিও কি তাই বলো?
রণেন মুখটা তুলে বলে—আমার কথায় কী হবে? সোমেনের ইচ্ছে হলে যাবে। আমার আপত্তি নেই।
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। কিন্তু সোমেনের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন না। ননীবালার দিকে চেয়ে বললেন—আমি বললেই কি আর ও যাবে? তোমার ভয় নেই। সংসারটা যেভাবে ভাগ হয়ে গেছে সেভাবটাই থেকে যাবে। একদিকে আমি একা, অন্যদিকে তোমরা।
ননীবালা কথাটার উত্তর দিলেন না।
সোমেনের একটা কিছু করা দরকার। হাতে খবরের কাগজে মোড়া প্যান্টের কাপড়টা তখনও ধরা আছে। ঘরের ভারী আবহাওয়াটা হালকা করার জন্যই সে মোড়কটা খুলে মার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল—প্যান্টের কাপড়টা বড়দি দিল। লক্ষ্মণদা পাঠিয়েছে কানাডা থেকে।
—ওমা! বলে হাত বাড়িয়ে ননীবালা কাপড়টা নিলেন—বা! কী সুন্দর রং-টা রে! তোকে বড় ভাল মানাবে। রণেন, দ্যাখ!
রণেন আগ্রহে এগিয়ে ঝুঁকে দেখে। টুবাইকে ঘরে শুইয়ে রেখে বউদি ঘরে পা দিয়েই এগিয়ে এসে বলে—বাঃ, ফাইন! ইংরেজিটা বলেই শ্বশুরের কথা মনে পড়ায় একটু লজ্জা পায়।
এই অন্যমনস্কতার ফাঁকে ব্রজগোপাল ধীরে ধীরে উঠলেন। একটা ক্যাম্বিসের ব্যাগ সোফার কোণ থেকে তুলে নিয়ে বললেন—চলি।
প্যান্টের কাপড়টা বউমার হাতে দিয়ে ননীবালা কষ্টে উঠে বললেন—যাবে?
—যাই। রাত হয়ে যাচ্ছে।
ননীবালা সোমেনের দিকে চেয়ে বললেন—তুইও বেরোবি?
—টিউশনিতে যাব।
—তা হলে সঙ্গে যা। বাসে তুলে দিয়ে যাবি। দুর্গা দুর্গা।
রাস্তায় ব্রজগোপাল দু-কদম আগে হাঁটছেন। অন্যমনস্ক, ভারাক্রান্ত। পিছনে সোমেন। বাবার সঙ্গে বহুকাল হাঁটেনি সোমেন। এই স্টেশন রোডেই ছেলেবেলায় সে সকালে খালিপেটে বাবার সঙ্গে মাঝে মাঝে প্রাতঃভ্রমণে যেত। ফেরার সময় খিদে পেত না। ব্রজগোপাল তাকে ফেরার পথে মুড়ি আর বাতাসা কিনে দিতেন। আবছা মনে পড়ে। বাবার সঙ্গ সে খুব বেশি পায়নি।
লন্ড্রির সামনে কয়েকজন ছেলেছোকরা জটলা করছিল। তাদের পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে একজন আর একজনকে একটা খিস্তি করল। একটু চমকে উঠল সোমেন। রাস্তাঘাটে আজকাল অনর্গল খিস্তি কানে আসে। বাপ-দাদার সঙ্গে বেরোতে তাই লজ্জা করে। একা থাকলে এ সব কানে লাগে না।
সে বাবাকে লক্ষ করল। শুনতে পাননি তো! না। ব্রজগোপাল আজ একটু অন্যমনস্ক। সোমেন বলে-বাবা, ব্যাগটা আমার হাতে দিন।
