আসলে সে মাকে বোঝাবে কী করে, যে বাড়িতে সে বর হয়ে যাবে সে-বাড়ির দেওয়া চাকরি সে তো নিতে পারে না! একবার উমেদার হয়ে গেলে আর কি রহস্য থাকে মানুষের?
রিখিয়া কেন যে আজ মাথাটা দখল করে আছে, কে জানে! মাঝে-মধ্যে আপন মনে মৃদু হাসল সোমেন। মনে মনে বলল, আসব রিখিয়া। আসছি।
হাঁটতেই হাঁটতেই বাড়ি পৌঁছে গেল সে। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে ঘরে ঢুকেই একটু অবাক হল। সোফার ওপর ব্রজগোপাল বসে আছেন। পাশে একটা চেয়ারে দাদা, মোড়ায় বসে। বউদি এঁটো চায়ের কাপ নিয়ে যাচ্ছে। একটি অপরূপ অসহনীয় সুন্দর সংসারের দৃশ্য।
॥ একুশ ॥
ঘরে ঢুকতেই তারদিকে তাকালেন ব্রজগোপাল। একটু বুঝি নড়ে উঠলেন। মুখখানায় কী একটা টান-বাঁধা উদ্বেগ ছিল সেটা সহজ হয়ে গেল। তাকিয়ে উৎসাহ-ভরে বললেন—এসো।
এ ঘর বাবার নয়। তবু যেন নিজের ঘরে ছেলেকে ডাকছেন, এমনই শোনাল গলা। সোমেনের সঙ্গে মাঝখানে অনেকদিন দেখা হয়নি। সে এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করল। বলল—বড়জামাইবাবুর কাছে শুনলাম, আপনি এসেছেন, আবার চলেও গেছেন।
ব্রজগোপাল সরে বসে জায়গা করে দিলেন সোমেনের জন্য। সোমেন একটু সংকোচের সঙ্গে বাবার পাশে বসে। ব্রজগোপাল বলেন—যাওয়ার কথাই ছিল। বহেরুর যে ছেলেটা জেলে ছিল সে মেয়াদের আগেই হঠাৎ ছাড়া পেয়েছে। দামাল ছেলে। বহেরু তাকে ভয় পায়। আজ তাই বাড়িতে আমার থাকার কথা। আমাকে কিছু মানে-গোণে, তাই বহেরুর ইচ্ছে ছিল এ সময়টায় থাকি। চলেই যাচ্ছিলাম, রণেন ধরে নিয়ে এল। এসে পড়ে ভাবলাম, একটু বসে যাই। তোমার সঙ্গে দেখা-টেখা হয় না, তো এই সুযোগে যদি এসে পড়ো।
এ বাড়িতে বেশিক্ষণ বসে থাকার জন্য যেন ব্রজগোপাল বড় লজ্জা পেয়েছেন, এমনভাবে কৈফিয়ত দেন। ঘরে ঢুকবার মুহূর্তে যে সুখী সংসারের ছবিটা দেখতে পেয়েছিল সোমেন তা কত ভঙ্গুর! নিকটতম আত্মীয় মানুষেরা নক্ষত্রের মতো পরস্পর থেকে বহু দূরে বসবাস করছে।
সোমেন হাসিমুখে বলে—আপনার শরীর কেমন আছে?
—মন্দ কী! মাটির সঙ্গে যোগ রেখে চলি, ভালই থাকি। তোমার চাকরিটা হল না।
না।
ব্রজগোপাল যেন খুশি হন শুনে। বলেন—পরের গোলামি যে করতেই হবে তারও কিছু মানে নেই। চাকরির উদ্দেশ্য তো ভাত-কাপড়, নাকি! তা সেটার বন্দোবস্ত করতে পারলে কোন আহাম্মক চাকরিবাকরিতে যায়। এই মোদ্দা কথাটা তোমরা বোঝো না কেন?
সোমেন অবাক হয়ে বলে—কীভাবে ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা হবে?
ব্রজগোপাল একবার ননীবালার দিকে চেয়ে নিলেন। ননীবালা একটু গম্ভীর, টুবাইটা কোলে আধশোয়া হয়ে কী একটা বায়না করছে। বিরক্ত হয়ে বললেন—বউমা, নিয়ে যাও তো একটু! কথা শুনতে দিচ্ছে না।
ব্রজগোপাল গলাখাঁকারি দেন। বলেন—দেশের অবস্থা তো দেখছই। চাকরির ভরসায় থাকাটা আর ঠিক নয়। এমন দিন আসতে পারে, যখন টাকার ক্রয়ক্ষমতা কিছু থাকবে না। তাই বলি, মাটির কাছে থাক। ফসল ফলানোর আনন্দও পাবে, ঘরে ভাতের জোর থাকবে। মরবে না।
সোমেন একটু হাসে। সেই পুরনো কথা। এর কোনও উত্তর হয় না। মৃদু স্বরে বলে—চাকরির সিকিউরিটি বেশি, ঝামেলা কম। চাষবাস বড় অনিশ্চিত।
ব্রজগোপাল রণেনের দিকে চেয়ে হেসে তাকে সাক্ষী মেনে বললেন—কথা শোনো। সবাই আজকাল বেশি সিকিউরিটি আর কম ঝামেলা খোঁজে। পাগল! চাকরির ঝামেলা কি কম! চাকরগিরি মানে তো মনিবকে খুশি করা। না কি?
রণেন আর সোমেনের চোখাচোখি হয়।
ব্রজগোপাল বলেন—চাকরিরও একটা মর্যাল আছে। সেটা মেনে যদি চাকরি করতে যাও, তা হলে ঝামেলা কমে না। অন্নদাতা মনিবের দায় যদি ঘাড়ে করে না নিলে, যদি সভাবে তাকে খুশি না করলে তো তুমি খারাপ চাকর। তোমার বাড়িতে যে ঠিকে-ঝি কাজ করে যায় সে যদি ফাঁকিবাজ বা আলসে হয়, যদি চোর হয়, যদি মুখে মুখে কথার জবাব করে তো তুমি কি তাকে ভাল বলো? তেমনি যদি চাকরগিরিই করো তো ষোলো আনা ভাল চাকর হতে হবে। ফাঁকিজুকি, চুরি-চামারি এ সব চলে না।
এই বলে ব্রজগোপাল রণেনের দিকে তাকান। রণেন যদিও তেমন বুদ্ধিমান নয়, তবু এই কথার ভিতরে ইঙ্গিতের ইশারাটি সে বোধ হয় বুঝতে পারে। চোখের পাতা ফেলে নীচের দিকে তাকায়।
বউমার হাতে টুবাইকে তুলে দিয়ে ননীবালা একটা শ্বাস ফেললেন। বললেন—ঝি-চাকরের সঙ্গে কি ভদ্রলোকদের তুলনা হয়? ঘোটলোকদের ধাত আলাদা। ওরা লেখাপড়া শিখেছে।
—লেখাপড়ার কথা না বলাই ভাল। এত শিখেও বিচি দেখে ফল চিনতে পারে না।
ননীবালার হঠাৎ সন্তানের প্রতি আদিম জৈব অধিকারবোধ বোধ হয় প্রবল হল। ঝংকার দিয়ে বললেন—ওদের চিনতে হবে না।
ব্রজগোপাল একটু উদাস গলায় বলেন—সব চাকরেরই একরকম ধাত। আমি কিছু তফাত দেখি না। যারা যারা চাকর তারা দেশময় কাজে ফাঁকি দিচ্ছে, চুরি করছে, ফাঁকতালে মাইনে বাড়ানোর ধান্দা করছে, কাজ বন্ধ করে বসে থাকছে। মনিবরা ধরা পড়েছে চোর-দায়ে। এটা কেমন কথা? জমিদারের সেরেস্তায় আমার বাপ চাকরি করতেন, মনিবকে খুশি রাখতে তাঁর কালঘাম ছুটে যেত। আমি করতাম সরকারি চাকরি, তাও বুড়ো বয়সে। সেখানে দেখতাম মনিব বলে যে কেউ আছে তা বোঝা যাচ্ছে না। তবু প্রাণপাত করেছি। কোথাও না কোথাও একজন মনিব তো আছে। কোথাও হয়তো ব্যক্তিবিশেষ, কোথাও প্রতিষ্ঠান, কোথাও বা দেশের মানুষ। খোরপোষের টাকা তো কারও না কারও তহবিল থেকেই আসছেই। সেটা খেটে শোধ না দিয়ে ভাত খাই কী করে? লজ্জা নেই?
