—শোন। ওই আলমারির পাল্লাটা খুলে দেয়, মাঝখানের তাকে একটা প্যান্টের কাপড় আছে না?
—কেন?
শীলা ধমক দিয়ে বলে—খোল না!
সোমেন আলগা পাল্লাটা টেনে খোলে। বাদামির ওপর হালকা ছাইরঙা চেক দেওয়া সুন্দর টেরিউলের প্যান্ট লেংথ। দামি জিনিস।
—এখানে নিয়ে আয়। শীলা বলে।
সোমেন কাপড়টা নিয়ে কাছে আসে। শীলা ওর মুখের দিকে চেয়ে বলে—পছন্দ হয়?
—হলেই বা।
—তোর জামাইবাবুকে তার বন্ধু পাঠিয়েছে আমেরিকা থেকে। ওটা তোর জন্য রেখে দিয়েছে। নিয়ে যা।
—যাঃ! ভারী লজ্জা পায় সোমেন?
—পাকামি করবি না। আজকেই করাতে দিবি, দরজির খরচ আমি দিয়ে দেব।
—জামাইবাবুকে পাঠিয়েছে, আমি কেন নেব?
—তোর জামাইবাবু কত পরবে? প্রতি মাসেই এটা-ওটা রাজ্যের জিনিস পাঠাচ্ছে, পান্ট শার্ট সিগারেট ঘড়ি ক্যামেরা কলম। আমার জন্য শাড়ির মাপে কাপড় পাঠিয়েছে এ পর্যন্ত গোটা দশেক। এত দিয়ে কী হবে! তুই নিয়ে যা। ভাল দরজিকে দিয়ে করাস। খবরের কাগজে মুড়ে নিয়ে যা। আর ওঘর থেকে তোর জামাইবাবুকে একটু পাঠিয়ে দিস।
আচ্ছা, বলে সোমেন বেরিয়ে আসে। হাতে ধরা মোলায়েম ঈষদুষ্ণ কাপড়টা একটা আরামদায়ক আনন্দের মতো তার হাত ছুঁয়ে আছে। কিছু অপ্রত্যাশিতভাবে পেলে মনটা কেমন ভাল হয়ে যায়।
বাইরের ঘরে আলো-আঁধারির মধ্যে সিগারেট জ্বলছে। অজিত মৃদু গলায় বলে—কাপড়টা পছন্দ হয়েছে তো শালাবাবু?
—খুব। এমন সুন্দর জিনিসটা আমাকে দিয়ে দিলেন?
তোমার জন্যই রেখেছিলাম। বলে সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে কয়েকটা সিগারেটও নিয়ে যাও।
—না, না।
—নাও হে নাও, ফ্রায়েড রাইস আর মুরগির মাংস খাওয়াতে পারলাম না, একটু কমপেনসেট করে দিই। পুরো প্যাকেটটাই নিয়ে যাও, গোটা আষ্টেক আছে।
সোমেন প্যাকেটটা পকেটে পোরে। বলে—আজ দারুণ বাণিজ্য হল।
আবছায়ায় অজিত একটু হাসে। আলো-আঁধারিতে ওর মুখটা তরল হয়ে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে। মুখখানা অস্পষ্ট একটা চিহ্নের মতো। সিগারেটের একবিন্দু লাল আগুনের পাশে ওর হাসিটা ভৌতিক দেখায়। মুখে স্বেদ ঝিকিয়ে ওঠে। ভ্রূর ছায়ায় চোখ দুটো অন্ধকার। লম্বা নাকটা তর্জনীর মতো উঁচু হয়ে আছে।
শীলা পাশের ঘর থেকে ক্ষীণ গলায় ডাকে—ওগো!
—যাচ্ছি। উত্তর দেয় অজিত, কিন্তু নড়ে না। সিগারেটটা ধীরে টান দেয়।
—জামাইবাবু, যাই।
অজিত মাথা নাড়ে। তারপর বিষণ্ণ গলায় বলে—দি ওয়ার ইজ লস্ট ফর এ নেইল।
—কী বলছেন?
—কত তুচ্ছ কারণে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল শালাবাবু!
সোমেন উত্তর খুঁজে পায় না।
অজিত বলে—আমার বয়স চল্লিশ, তোমার দিদিরও ত্রিশ-বত্রিশ। কত ধৈর্য, কত অপেক্ষা, কত কষ্টের পর এই ভরাডুবি। শালাবাবু, আজ বিকেল থেকে গোটা জীবনের রংটাই বোধ হয় ফিকে হয়ে গেল।
সিগারেটটা অ্যাসট্রের মধ্যে ছ্যাঁক করে ওঠে। অজিত মুখ তুলে দাঁড়িয়ে-থাকা সোমেনের দিকে তাকায়। আলো-আঁধারিতে মুখখানা ব্রোঞ্জের স্ট্যাচুর মুখের মতো দেখায়। সন্তানের জন্য সমস্ত মুখখানায় কী বুভুক্ষা আর পিপাসা কাতরতা ফুটে আছে।
সোমেন বিষণ্ণ গলায় বলে—ডাক্তার ডাকবেন না?
—ডাকব। তবু দি ওয়ার ইজ লস্ট। মানুষের ক্ষমতা বড় সীমাবদ্ধ। এই অবস্থা থেকে কে আমাদের বাঁচাতে পারে! ডাক্তার যা করার তা করেছে। এখন আর কী করার আছে তার! আমি আজকাল নিয়তি মানি। ভাগ্যে নেই।
—এ সব বোগাস। আপনি উঠুন তো, দিদির কাছে যান। ভেঙে পড়ার কিছু হয়নি।
—যাচ্ছি। বলে অজিত অন্ধকারে বসে রইল। উঠল না। কেবল হাত বাড়িয়ে হাতড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা খুঁজল। পেল না। সোমেন নিঃশব্দে প্যাকেটটা পকটে থেকে বের করে টেবিলে রেখে দিয়ে বেরিয়ে আসে। অজিত লক্ষ করল না।
সন্তানের জন্য বুভুক্ষা কেমনতর তা পুরোপুরি বোঝে না সোমেন। কিন্তু একটু একটু টের পায়। গোবিন্দপুরে সে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে অমনি এক তীব্র অসহায় ক্ষুধাকে প্রত্যক্ষ করেছে ব্রজগোপালের মুখে। সেই থেকে বাবার জন্য ক্ষীণ সুতোর টান সে টের পায়। যে ঘুড়িটা কেটে গিয়েছিল বলে ধরে নিয়েছে সে, আসলে তা কাটেনি। রক্তে রক্তে বুঝি টরেটা বেজে যায় ঠিকই। টান তেমন প্রবল নয়, কিন্তু মাঝে মাঝে মন বড় কেমন করে, মনে হয়—আহা রে, লোকটা! বড় একা হয়ে হা-ভাতের মতো চেয়ে আছে ছেলেদের দিকে। মায়া হয়।
সিগারেটের দোকান থেকে একটা সস্তা সিগারেট কিনে দড়ির আগুনে ধরিয়ে নেয় সোমেন। ট্রামরাস্তার দিকে হাঁটতে থাকে। ভাবে, অণিমাদের বাড়ি থেকে রিখিয়াদের বাড়ি বেশি দূর নয় তো। তবে কেন সে একবারও শৈলীমাসি আর রিখিয়ার কাছে যায়নি এত দিন! আজ একবার গেলে হয়। প্যান্টের কাপড়টা অপ্রত্যাশিত পেয়ে গিয়ে মনটা হঠাৎ ভাল হয়ে গিয়েছিল, জামাইবাবুর শেষ কথাগুলোয় আবার মন খারাপ হয়ে গেছে। গাব্বদের বাড়িতে যাওয়ার পথে একবার ওবাড়ি হয়ে যাবে।
আনোয়ার শা রোড দিয়ে আজকাল বাস যায় ঢাকুরিয়া পর্যন্ত। সেই আশায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে সোমেন হাঁটতে থাকে। প্যান্টের কাপড়টা বাড়িতে রেখে, হাতমুখ ধুয়ে, একটু ফরসা জামাকাপড় পরে বেরোবে।
মা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে-হ্যাঁরে, শৈলী চাকরির কথা কী বলল?
সোমেন ঝেঁঝেঁ বলে—চাকরি কি ছেলের হাতের মোয়া!
