কী বিশাল এই কলকাতা শহর, তবু কোথাও নিরুপদ্রবে বাস করার একটু জায়গা নেই তার জন্য। পূর্বা বলেছে, তাদের তিন তলার এক-ঘরের ফ্ল্যাটটা সোমেনকে দেওয়া যায় কি না তা তার বাবাকে জিজ্ঞেস করবে। হয়তো রাজিও করাবে পূর্বা। কিন্তু নেওয়া কি সম্ভব হবে? মাসে মাসে একশো পঁচিশ টাকা ভাড়া আসবে কোত্থেকে! চাকরিটা সম্বন্ধে এত নিশ্চিত ছিল সে যে রেলে ক্লার্কশিপের পরীক্ষাটা পর্যন্ত দেয়নি। দিলেই ভাল করত। রেলের চাকরি হলে ভালই হত। বদলির চাকরি, কলকাতা ছেড়ে দূরে দূরে থাকতে পারত।
ব্যাঙ্কের চাকরিটা কেন যে হল না! ভাবতেই বুকের মধ্যে একটা ব্যথার মতো যন্ত্রণা হয়। অলক্ষে একটা কুকুর গর্-র শব্দ করে, একটা আসাহি পেনট্যাক্স ক্যামেরার ঢাকনা-খোলা মস্ত লেন্স ঝিকিয়ে ওঠে। রিখিয়া বলেছিল—আবার আসবেন।
সোমেন কথা দিয়েছিল—আসব। মনে মনে ভেবেছিল, একদিন সুসময়ে তার সঙ্গে রিখিয়ার ভালবাসা হবে। কথা রাখেনি সোমেন। রিখিয়া তাকে ভুলে গেছে এতদিনে। কত চালাক-চতুর ছেলেরা চারদিকে রয়েছে, একজন বিষণ্ণ যুবককে ভুলে যেতে বেশিক্ষণ লাগে কি? মাঝে মাঝে সোমেনও ভাবে, ভুলে যাবে। কিন্তু ভোলে না। কত মেয়ের সঙ্গেই তো মিশেছে সোমেন, তবে কেন রিখিয়ার প্রতি এই অভিভূতি! ইচ্ছে করলেই অভিভূতি বা অবসেশনটা কাটিয়ে উঠতে পারে সে। কিছু শক্ত নয়। কিন্তু কাটিয়ে দিতে মায়া লাগে। মাঝে মাঝে মনে পড়ুক, ক্ষতি কী!
ভেজানো দরজা খুলে অজিত এসে সোফাটায় বসে। সিগারেট আর লাইটার তুলে নেয়। তার মুখ চিন্তান্বিত, ঠোঁটে রক্তহীন ফ্যাকাশে ভাব। সোমেন চেয়ে থাকে।
চোখে চোখ পড়তেই অজিত বলে—মেয়েরা কখনও কথা শোনে না। বুঝলে শালাবাবু?
—কী হয়েছে?
—এখনও কিছু বোঝা যাচ্ছে না। একটা পেইন হচ্ছে। বলে অজিত এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে চুলের ভিতরে আঙুল চালাতে চালাতে ধৈর্যহীন অস্থিরতার সঙ্গে বসে থাকে।
—ডাক্তার ডাকুন না! সোমেন বলে।
—কী লাভ? ডাক্তারের কোনও কথা কি শোনে! শুনলে এরকমটা হত না। লিভ ইট, এস অন্য বিষয়ে কথা বলি।
অজিতের মুখে চোখে একটা আশা ত্যাগের ভাব। তার সঙ্গে চাপা রাগ।
সোমেন উঠে বলল—দাঁড়ান, দেখে আসি।
সোমেন শোওয়ার ঘরে ঢুকতেই একটা হাহাকারে ভরা শ্বাস ফেলে বিছানায় পাশ ফিরল শীলা।
—বড়দি!
শীলা তার মস্ত চোখ দুখানা খুলে চেয়ে বলে—যাবি না সোমেন। রাতে খেয়ে যাবি।
—তোর শরীর কেমন লাগছে?
শীলার ঠোঁট দুটো কেঁপে যায়। সামলে বলে—এখন ভাল। বোস।
সোমেন বিছানায় বসে। শীলার শ্বাসে একটা মৃদু অ্যালকোহলের গন্ধ ছড়ায়। বোধ হয় একটু ব্রান্ডি খাইয়েছে অজিত।
—জামাইবাবু খুব আপসেট। সোমেন বলে।
শীলা উত্তর দিল না। ক্ষণকাল চোখ বুজে থেকে বলে—সারাদিন ঘরবন্দি থাকা যে কী অসহ্য!
—কোথায় গিয়েছিলি?
—স্কুলে। কী যে হল তারপর। বলেই বোধ হয় ভাইকে লজ্জা পায় শীলা। বলে—ওসব কিছু না। কিছু হয়নি। তুই নাকি তোর জামাইবাবুকে বলেছিস যে আমাদের বাসায় কদিন থাকবি!
সোমেন মাথা নাড়ে।
শীলার মুখখানা অন্তর্নিহিত যন্ত্রণায় সামান্য বিকৃত হয়ে গেল। চোখ বুজে একটু গভীর করে শ্বাস নেয় সে। তারপর বলে—বাসায় ঝগড়া করেছিস!
—না।
—বউদির সঙ্গে, না?
—না।
—তবে?
—ঝগড়া হয়নি। বাসায় আমার ভাল লাগছে না।
শীলা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে—লাগার কথা নয়।
শীলা আবার চোখ বুজে যন্ত্রণাটা সহ্য করে, বলে—শোন, তোর ইচ্ছে করলে এসে থাক, যতদিন খুশি। সারাটা দিন যা একা লাগে আমার! আর কতদিন যে ঘর থেকে বেরনো হবে না! থাকবি সোমেন? থাক না! মাকে কতবার বলেছি আমার কাছে এসে কদিন থাকার জন্য। কিছুতেই রাজি হল না। ও সংসারে কী যে মধু! উঠতে বসতে বউদি খোঁটা দেবে, কথা শোনাবে, তবু পড়ে থাকবে ওখানে।
—মারও দোষ আছে।
শীলা ধমক দিয়ে বলে —আহা! দোষ আবার কী! মুখে একটু-আধটু হয়তো বলে, কিন্তু মার মন সাদা। অমন শাশুড়ির সঙ্গে যে বনে খেতে পারে না…বলতে বলতে শীলা চোখ বোজে। যন্ত্রণা সহ্য করে।
মেয়েরা মায়ের দোষ কমই দেখে ভাজের ব্যাপারে। সোমেন তা জানে। সোমেন উঠতে উঠতে বলে—শোন বড়দি, আজ আমার নেমন্তন্নটা ক্যানসেল কর। তোর শরীর ভাল না। শুয়ে থাক চুপচাপ।
শীলা করুণ মুখ করে বলে—থাক না আর একটু।
সোমেন ঘড়ি দেখে বলে—টিউশনিটায় যেতে হবে। পরীক্ষার সময়।
শীলা চোখ বুজে বলে—যাকে পড়াস তার দিদি তোর সঙ্গে পড়ত না।
—হ্যাঁ।
—বেশি মিশবি-টিশবি না, বুঝলি!
সোমেন হাসে। বলে—মিশি না।
—খুব নাকি মেয়েদের সঙ্গে ঘুরিস আর আড্ডা দিস!
—কে বলল?
—পাশের বাড়ির মাধবী তোকে বঙ্গ-সংস্কৃতিতে দেখেছে।
—দেখেছে তাতে কী? ঘুরলে দোষ কী?
শীলা বড় চোখে চেয়ে বলে—তুই তো হাঁদা ছেলে! কোন খেঁদি পেঁচির পাল্লায় পড়ে যাবি।
—দূর! ওরা সব বড় ঘরের মেয়ে, পাত্তাই দেয় না বেকারকে।
—বেকার কি চিরকাল থাকবি নাকি! তোর মতো স্মার্ট আর চটপটে ছেলে কজন? দুম করে একটা ভাল চাকরি পেয়ে যাবি।
সোমেন হেসে ফেলে। বলে—এই যে বললি হাঁদা!
—হাঁদাই তো! মেয়েদের ব্যাপারে হাঁদা। বলে শীলা ভাইয়ের দিকে স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে হাসে। বলে—তোর বিয়ে আমি নিজে পছন্দ করে দেব। আমাদের সংসারে একটা লক্ষ্মী বউ দরকার।
—দিস। বলে সোমেন বাইরের ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
