—হ্যাঁ। বাথরুম, কিচেন নিয়ে কমপ্লিট ফ্ল্যাট, বড় ঘর, চারধার খোলা। কেন?
—আমাকে থাকতে দিবি?
অণিমা এগিয়ে আসে—কী বলছে রে পাজিটা?
পূর্বা ঘাড় না ঘুরিয়ে বলে—আমাদের বাড়িতে থাকতে চাইছে।
—থাকবে মানে? ঘরজামাই হয়ে নাকি? বলে হাসে অণিমা।
পূর্বা ভীষণ লজ্জা পেয়ে বলে—যাঃ। আমাদের তিনতলার ফ্ল্যাটটার কথা বলছে, তোরা যা মুখ পলকা না!
অপালা অণিমার বেণী ধরে টেনে বলে—ঘরজামাই হবে কিরে, ও তোর বর না? সেই যে বিয়ে করে এলি সেদিন, ভুলে গেছিস?
সোমেন ‘আঃ’ বলে ধমক দেয়। তারপর পূর্বাকে বলে—সত্যিই আমার বড় দরকার। একমাস আমাকে থাকতে দিবি?
অপালা বড় বড় চোখে চেয়ে বলে—বাড়ির সঙ্গে ঝগড়া করেছিস? না কি কোনও পরীক্ষা—ফরীক্ষা দিবি?
সসামেন বলে—তা দিয়ে তোর কী দরকার? আমি তো পূর্বার কাছে ঘরটা ভাড়া চাইছি। মাগনা নয়।
অপালা উত্তর দেয়—তোকে দেবে কেন? পূর্বা ওটা একজন প্রসপেকটিভ ব্যাচেলরকে ভাড়া দেবে, সব ঠিক হয়ে আছে। আই-এ-এস বা ইঞ্জিনিয়ার। ডাক্তার যদিও আমি দুচোখে দেখতে পারি না, তবু তাও চলবে। তোকে দেবে কেন? বেকার, এম-এ’র মতো সোজা পরীক্ষাটাও পাশ করিসনি। তোকে দিয়ে পূর্বার ভবিষ্যৎ কী? বরং ধারকর্জ দিতে দিতে ফতুর হতে হবে।
কথাটা পূর্বার লাগে, গম্ভীর মুখখানা ফিরিয়ে বলে—কেন, ব্যাচেলারকে ভাড়া দেব কেন, আমার বুঝি বর জুটছে না?
অপালা ধমক দিয়ে বলে—কোথায় জুটছে? ধুমসি হয়ে যাচ্ছিস!
—তোরই বা কোন বর জুটছে শুনি!
সোমেন বিরক্ত হয়ে বলে—তোদের কারো জুটবে না। এত ইয়ারবাজ হলে কারো বর জোটে! ছেলেপক্ষ যদি দেখতে আসে তো তাদের সঙ্গেও তোরা ইয়ারকি দিবি, পার্টি কেটে যাবে।
—মাইরি, মাইরি! অপালা লাফিয়ে উঠে বলে—আমাকে একটা পার্টি দেখতে এসেছিল কিছুদিন আগে, পাত্রের জ্যাঠামশাই আর একজন ভগ্নীপতি। আমি খুব সিরিয়াস হয়ে গিয়ে বসলাম। কিন্তু মাইরি জ্যাঠামশাইটা যা বাটকুল না, দেখেই হাসি এসে যাচ্ছিল, অনেক কষ্টে হাসি চেপেচুপে বসে রয়েছি। হঠাৎ শুনি ফঁক-ফঁ ফঁক-ফঁ একটা শব্দ। প্রথমে বুঝতে পারিনি শব্দটা কোথা থেকে আসছে। এদিক ওদিক চাইছি। পাত্রপক্ষকে খাবার-টাবার দেওয়া হয়েছে, তারা খাচ্ছিল আর আমার দিকে মাঝে মাঝে দেখছিল। হঠাৎ টের পেলাম, শব্দটা জ্যাঠামশাইয়ের নাক থেকে আসছে। যখনই খাবার মুখে দেয় লোকটা তখনই মুখবন্ধ অবস্থায় নাক দিয়ে শব্দটা হয়। নাকে পলিপাস থাকলে ও-রকম হয় অনেকের, মুখ দিয়ে শ্বাস টানে, কিন্তু মুখ বন্ধ করলেই বিপদ। আমি মাইরি, আর চাপতে পারলাম না, ফুড়ুক ফুড়ুক করে হেসে ফেললাম।
অণিমা জোরে হেসে ওঠে, বলে—সত্যি?
—মাইরি। কয়েকদিন পর ওরা রিগ্রেট লেটার দিল। বাবার সে কী বকা আমাকে—কিন্তু কী করব বল তো!
গঙ্গার উন্মুক্ত বিস্তারের সামনে এসে পড়তেই কনকন করে ওঠে ঠান্ডা বাতাস। সোমেন বলে—তোদের কারও জুটবে না, আমি বলে দিচ্ছি।
—ঠিক বলেছিস। অপালা দুঃখের গলায় বলে—কেবল আমাদের মধ্যে অণিমাটাই যা লাকি। ওর জুটে গেল বোধ হয়।
—কে? সোমেন অবাক হয়ে বলে।
—দুজন তো দেখতে পাচ্ছি। তুই আর ম্যাক্স। ম্যাক্স তো রোজ প্রোপোজ করছে, একটু আগে গাড়িতেও করছিল। অপালা বলে।
—যাঃ! অণিমা লজ্জার ভাণ করে—আজ করেনি।
—এই মিথ্যুক, তোরা যে ও-পাশের সিটে গিয়ে আলাদা হয়ে বসলি, তখন স্পষ্ট দেখলাম ম্যাক্স, তোকে কী বলল, আর তুই খুব মিষ্টি হেসে মাথা নিচু করলি!
—না, না, সে অন্য কথা।
—কী কথা শুনি? অপালা চোখ পাকায়।
—বলছিল কলকাতায় কলার দাম নাকি বড্ড বেশি। ও কলা ছাড়া থাকতে পারে না।
—যাঃ।
—মাইরি। আমি বলেছি, সস্তায় ওকে কলা কিনে দেব।
‘মিথুক, মিথুক’ বলে অপালা হাসতে থাকে। শীতের নদীর ধারটা বড় নিস্তব্ধ, জলের শব্দ নেই। ওরা ঢালু বেয়ে নামতে নামতেই দেখতে পেল, ডান ধারে একটু গাছপালার জড়াজড়ি, তার ওধারে দু-চারজন লোক। উনুনের ধোঁয়া উঠছে।
ভারী খুশি হয়ে পূর্বা চেঁচায়—ওই যে!
দূর থেকে তাদের দেখেই শ্যামল রাগারাগি করতে থাকে। কিন্তু কেউ চটে না। কারণ, শ্যামল চমৎকার ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে রেখেছে, রুটি-মাখন, ডিমসেদ্ধ, কলা, চায়ের জল ফুটছে ইটের উনুনে। রান্নার দুজন লোক এনেছে শ্যামল, আর একজন নিরীহ চেহারার বন্ধু। বলেছিল বটে, একজন বন্ধুকে আনবে, তাহলে এ-ই। সোমেন লক্ষ করে, লোকটার চেহারা নাদুসনুদুস, মুখে ভালমানুষি আর বোকামি, পরনে খুব দামি স্যুট, হাতে এক ঠোঙা আঙুর।
শ্যামল যথেষ্ট মিহি ও মিষ্টি গলায় পরিচয় করিয়ে দেয়। লোকটার নাম মিহির বোস। শ্যামলের স্কুলফ্রেন্ড, চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বড় ফার্মে চাকরি করে। পরিচয়ের পর হাতজোড় করে রেখেই অপালার দিকে চেয়ে বলে—সবাই বুঝি আপনারা এম-এ দিয়েছেন!
তার চেহারার ভালমানুষি আর বোকা ভাব সবাই লক্ষ করেছে। অপালার মুখে হাসি খেলে গেল বিদ্যুতের মতো। একটু চাপা গলায় বলে—দূর শালা, তা দিয়ে তোর কী হবে! বলেই নিপাট ভালমানুষের মতো গলা তুলে বলে—হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন তো!
মিহির বোস পরিষ্কার আগের কথাটা শুনতে পেয়েছে, বুঝতে পেরে সোমেন বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফেরায়। কিন্তু মিহির বোস শুনলেও রাগ করে না, বলে—ভারী সুন্দর স্পষ্ট কিন্তু এটা। সারাদিন এই জায়গাটায় আপনাদের সঙ্গে কাটাতে পারব ভাবতেই ভাল লাগছে।
