—হরি-হরি! চাপা গলায় অণিমা শ্বাস ফেলে বলে।
—কী বললেন? মিহির একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে।
অণিমা অমায়িক হেসে বলে—কিছু না, হরির নাম…
অপালা হু-হু করে হাসছে। শ্যামল গাছতলায় শতরঞ্চি পাতছে, কী একটু আন্দাজ করে ধমক দিল—এই, কী হচ্ছে? আয় না তোরা, বোস এসে।
অপালা হাসি চাপতে চাপতেই চাপা গলায় বলে—এই মিহির, বোস, বোস। তারপর গলা তুলে বলে—আয় রে সবাই বসি।
থতমত খাওয়া মিহির বোস হাসতে চেষ্টা করে। অপালার দিক থেকে চোখ সরিয়ে অণিমার দিকে চায়। অণিমা সঙ্গে সঙ্গে হৃ দুটো নাচাতে থাকে। অপ্রস্তুত মিহির বোস চোখ সরিয়ে নেয়। অপালা, অণিমা আর পূর্বা গা টেপাটেপি করে হাসতেই থাকে।
শতরঞ্চিতে বসে অপালা খুব দুঃখের গলায় মিহির বোসকে বলে—বাড়ি ফিরে গিয়ে আজ আপনি নিশ্চয়ই আমাদের খুব নিন্দে করবেন?
ভালমানুষ মিহির বোস তটস্থ হয়ে বলে—না, না, সে কী!
অপালা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলে—করবে না রে অণি?
—হ্যাঁ করবে রে অপা। জানেন মিহিরবাবু, আমরা না খুব খারাপ। অণিমা মুখখানা চুন করে বলে।
—না, না। মিহির বোস ঠিক থই পায় না।
অপালা হাতজোড় করে বলে—আমরা সত্যিই ভীষণ খারাপ। সেইজন্য কেউ আমাদের ভালবাসে না, না রে পূর্বা?
পূর্বা মাথা নাড়ে। আঁচলে হাসি চাপতে গিয়ে কাশতে থাকে।
—আমাদের তাই বিয়েও হবে না। অণিমা করুণ স্বরে বলে।
অপালা তাকে একটা ঝাপটা মেরে বলে—না, না জানেন, আমাদের মধ্যে একমাত্র এই অণিমারই হবে। হত না কিন্তু। ভাগ্যিস লোকটা বাংলা তেমন জানে না। এই যে গঙ্গার ধারে উলোঝুলো সাহেবটা দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্যারের সঙ্গে—ওর সঙ্গে অণিমার ভাব। সাহেব বলেই করছে, বাঙালি হলে কিছুতেই—
অণিমা উৎকণ্ঠিতভাবে বলে—ও বাংলা শিখে গেছে অনেকটা। তাই আর একদম প্রোপোজ করছে না আজকাল। আপনার হাতে ওটা কীসের ঠোঙা মিহিরবাবু?
মিহির বোস এতক্ষণে কথা খুঁজে পেয়ে বলল—আঙুর। তারপর শ্বাস ফেলে বলে—খাবেন?
অপালা হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা নিঃসংকোচে নিয়ে নেয়। বলে—পেটুক ভাববেন না তো?
—না, না। বলে হঠাৎ মিহির বোস খুব হাসতে থাকে। সবাই তার দিকে ভ্রূ কুঁচকে চেয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিহির বোস বলে—আমার খুব ভাল লাগছে।
বলে চকচকে চোখে সে অপালার দিকে চেয়ে থাকে।
অণিমা শ্বাস ফেলে বলে—তোরও ব্যবস্থা হয়ে গেল অপা।
পাইপ মুখে অনিল রায়, আর চোখে নীলচে ফসফরাস নিয়ে রোগা সাহেব এগিয়ে আসে। অনিল রায় বলেন—কী হচ্ছে?
পূর্বা এতক্ষণে একটা রসিকতা করে—ম্যাট্রিমণি স্যার।
—ম্যাটিনি? অনিল রায় অবাক হন।
—না স্যার, ম্যাট্রিমণি।
সবাই এত জোরে হাসে, কেউ কিছু বুঝতে পারে না।
ম্যাক্স কথা বলে খুব কম। কদিন দাড়ি কামায়নি, সাদা দাড়িগোঁফে মুখটা আচ্ছন্ন। সবুজ পাঞ্জাবির ওপর জহরকোট, নীচে পায়জামা, উলোঝুলো চুল, ন্যালাক্ষ্যাপার মতো দেখাচ্ছে। সোমেনের পাশে এসে বসে পড়ল।
সোমেন দুঃখ করে বলল—তুমি পুরো ভেতো বনে গেছ সাহেব।
ম্যাক্স হাসল। দীন এবং মলিন একরকম হাসি। বাংলা বোঝে আজকাল। বলল—হুঁ, হুঁ, ঠিক কথা।
—এবার গরমকালে তোমাকে বাঁদিপোতার গামছা পরিয়ে আম আর কাঁঠাল খাওয়াব। আমার গ্র্যান্ডফাদার আর ফাদার ওইভাবে খেত। কনুই পর্যন্ত রস গড়াবে, আর চেটে চেটে খাবে।
অপালা হাসতে হাসতে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলে—যাঃ! গরমকাল পর্যন্ত ও থাকবে নাকি? সেদিন ফেয়ারওয়েল দেওয়া হল, দেখলি না? ও চলে যাচ্ছে।
—যাচ্ছে কোথায়! কবে থেকে তো শুনছি যাবে-যাবে!
—যাবে। অণিমা আজও পাকা কথা দেয়নি যে।
অণিমা ফের লজ্জার ভাণ করে বলে—ও প্রোপোজ করে না আজকাল, মাইরি। বাংলা শিখে যাওয়ার পর থেকে—
॥ চোদ্দো ॥
এদের দঙ্গলে সোমেন বড় একটা আসে না। ভাল লাগে না। একসঙ্গে পড়ত, কিন্তু এখন ওরা এগিয়ে রইল, সোমেন পড়া ছেড়ে দিয়েছে। পিকনিকেও আসত না, কিন্তু কাল গাব্বুর পড়ার ঘরে এসে অণিমা খুব ধরল—আমরা চার-চারটে মেয়ে যাচ্ছি, পুরুষ মোটে তিনজন—ম্যাক্স, অনিল রায় আর শ্যামলের কে এক বন্ধু। তাই ব্যালান্স অফ পাওয়ার থাকছে না। তুমি চলো সোমেন। সোমেন অবাক হয়ে বলেছে—কেন, শ্যামল যাবে না? অণিমা অবাক হয়ে বলে—শ্যামলকে ধরেই তো চারজন মেয়ে! সোমেন হেসে ফেলে বলেছে—তাই বলল।
কথাটা মিথ্যে নয়। মেয়েদের সঙ্গ ছাড়া শ্যামল কখনও থাকতে পারে না। পুরুষ-বন্ধু শ্যামলের আছে কি নেই। থাকলেও তাদের সঙ্গ ও খুব পছন্দ করে না বোধ হয়। আশ্চর্যের বিষয়, মেয়েদের সঙ্গে মিশে ওর গলার স্বর আজকাল মিহি হয়ে গেছে। মিষ্টি করে হাসে, চোখের চাউনিতে কটাক্ষ দেখা যায়। অণিমা একটা শ্বাস ফেলে বলেছিল—জানো না তো, শ্যামল আজকাল পুরুষ মানুষ দেখলে বুক ঢাকার চেষ্টা করে।
সোমেনের মন ভাল নেই। কাল রাতে দাদার কাণ্ডটা সারাক্ষণ মনে পড়ছে। মাঝে মাঝে শীতে কেঁপে উঠছে সে। এতকাল সংসারের ভিতরের গণ্ডগোলটা এমনভাবে তাকে স্পর্শ করেনি। দাদা এত নীচে নেমে যায়নি কখনও। বড়দি মাকে ইনল্যান্ডে একটা চিঠি দিয়েছে, দাদা নাকি টালিগঞ্জের জমিটা বউদির নামে কিনবার চেষ্টা করছে। কেনে কিনুক, সোমেনের কিছু যায় আসে না। কিন্তু সেটা দাদা, বা সোমেনকে জানাতে পারত। জানায়নি। এটা নিয়েও হয়তো কথা তুলবে মা। সংসারে আর একটা অশান্তি লেগে যাবে। পিকনিকে এসে সোমেনের তাই মন ভাল নেই।
