সোমেনের তখন খেয়াল হয়। ফিরে পূর্বাকে দেখে একটু হাসে।
পূর্বা চোখ বড় বড় করে তাকে দেখে, বলে কোথায় চলে যাচ্ছিলি আমাদের না নিয়ে?
সোমেন বলে—ওরা কোথায়?
—ওই তো! দেখিয়ে দেয় পূর্বা। একটু পিছনে অণিমা, অপালা, ম্যাক্স, অনিল রায়—সবাইকেই দেখা যায়। ওরা গেটের কাছে এগিয়ে আসে। অপালা তাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে বলে—যা খিদে পেয়েছে না রে! ব্রেকফাস্ট রেডি আছে তো!
সোমেন সিগারেট ধরাল। মানুষের স্রোত বেরিয়ে আসছে। সে সেই স্রোতের মুখে থেকে একটু সরে দাঁড়ায়! অপেক্ষা করে। অপালা বোধ হয় হাতব্যাগে টিকিট খুঁজছে। পাচ্ছে না। ভ্রূ কুঁচকে অধৈর্য হাতে হাঁটকাচ্ছে, তোলপাড় করছে ব্যাগ। পাচ্ছে না। বেড়ার ওপাশে দলটা একটু সরে দাঁড়িয়েছে তোকজনকে পথ দেওয়ার জন্য। পূর্বার মুখটা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে, সে বলল—ভাল লাগে না। কী যে সব কাণ্ড করিস না!
অপালা বলে—আহা, কাণ্ড আবার কী? ব্যাগ খুলে টিকিটগুলো ভিতরে ফেলে দিয়েছিলাম, বেশ মনে আছে।
অনিল রায় পাইপ খাওয়ার অভ্যাস করছেন। সেটা ধরাতে ধরাতে বেশ নিরুদ্বেগ রসিক গলায় বলেন—ভিতরেই ফেলেছিলে তো! না কি ব্যাগটা খুলতে ভুলে গিয়ে টিকিটগুলো বাইরে ফেলে দিয়েছ!
—না স্যার, স্পষ্ট মনে আছে। বলে অকারণে হাসে অপালা। অণিমাও। কারো কোনও উদ্বেগ দেখা যায় না।
কেবল পূর্বার চোখ ছলছল করে—ইস্ কী ইনসাল্ট স্যার! কী বিচ্ছিরি কাণ্ড! এই সোমেন চলে যাস না।
সোমেন দুপা এগিয়ে যায়, বলে—কী হল, টিকিট পাচ্ছিস না?
—নারে! অপালার ভ্রূ কুঁচকে আসে, চোখ ছোট আর তীক্ষ্ণ হয়। ব্যাগটা তুলে কাত করে ভিতরে খোঁজে।
সোমেন নিরুদ্বেগ গলায় বলে—কী আর করবি, মামাকে বলেকয়ে চলে আয়।
অপালা চোখ তুলে অবাক হয়ে বলে—মামা! মামা আবার কে?
সোমেন চোখের ইশারায় টিকিট চেকারকে দেখিয়ে দেয়। অপালা আর অণিমা অমনি ইয়ারকির গন্ধ পেয়ে টিকিটচেকারের মুখের দিকে চেয়ে হাসতে থাকে। অনিল রায় ধমকে দেন—কী হচ্ছে কী?
—স্যার, সোমেন বলছে ইনি নাকি আমাদের মামা, ছি—ছি—
এ লাইনে সবাই চেকারকে মামা বলে। কেন বলে খোদায় মালুম। অল্পবয়সি চেকারটি গা ছেড়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন হঠাৎ সোজা হল। একবার বিরক্তির একটু দৃষ্টিক্ষেপ করে সোমেনের দিকে। ততক্ষণে পূর্বা রুমালে চোখ মুছছে। অনিল রায় বললেন—কোথাও বোধ হয় পড়েটড়ে গেছে তাহলে। দেন উই হ্যাভ টু পে দি ফেয়ার। বলতে বলতে হিপ পকেটের ওয়ালেটে হাত দেন।
তৎক্ষণাৎ টিকিট খুঁজে পায় অপালা। চেঁচিয়ে বলে—পেয়েছি স্যার, ব্যাগের লাইনিঙের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল।
ওরা বেরিয়ে আসে। অনিল রায় বলেন—স্পটটা কি খুব দূরে সোমেন?
—জানি না স্যার।
—জানো না? অবাক হল অনিল রায়।
—না স্যার, আমিও এই গাড়িতে এলাম।
অণিমা কাছেই ছিল, বলল—সে কী? তোমার তো শ্যামলের সঙ্গে আসার কথা।
—আসিনি।
পূর্বা বলে—এ মা! কী হবে তা হলে?
অপালা রেগে গিয়ে বলে—ঠিক জানি, একটা ভণ্ডুল হবেই! এখন গঙ্গার ঘাটময় ঢ্যাঙস ঢ্যাঙস করে শ্যামলকে খোঁজো, ততক্ষণে নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাবে।
অনিল রায় নিরুদ্বেগ গলায় বললেন—তাতে কী! ব্যারাকপুর তো আর নিউইয়র্ক নয়। ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে। ব্যারাকপুরের গঙ্গার ঘাটে আমি অনেক এসেছি এক সময়ে। চেনা জায়গা।
অপালা বাতাস শুঁকে বলে—স্যার, জিলিপির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
সবাই জিলিপির গন্ধ পায়। গন্ধে গন্ধে তারা দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তেই সকালের শান্ত দোকানঘরটা সচকিত হয়ে ওঠে কলকাতার হাউড়ে ছেলেমেয়ের কলকলানো কথার শব্দে। জিলিপির পাহাড় ধ্বসে পড়তে থাকে।
সকাল নটাতেও রোদ ফোটেনি। কুয়াশায় আবছা গঙ্গার ধার বড় নিস্তব্ধ। এ অঞ্চলটায় বাগানঘেরা বাড়ি একের পর এক। লোকজন নেই। পাহাড়ি জায়গার মতো কুয়াশায় হিম হয়ে আছে এক প্রাচীন নিস্তব্ধতা। বাগানের মধ্যে কেবল মাথা উঁচু করে আছে কিছু মানুষের চেহারা। সত্যিকারের মানুষ নয়, পাথরের মূর্তি। কলকাতার রাস্তাঘাটে এক সময়ে যেসব সাহেবদের স্ট্যাচু ছিল তা তুলে এনে রাখা হয়েছে।
অনিল রায় পাইপের ডাঁটি তুলে ম্যাক্সকে দেখান, ইংরেজিতে বলেন—ওই হচ্ছে সত্যিকারের ব্রিটিশ স্কাল্পচার। আউট্রামের মূর্তিটা এখন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে রেখে দিয়েছে। সে মূর্তি ভোলা যায় না। টুপি পড়ে গেছে, আউট্রাম ঘোড়ার পিঠ থেকে ঘুরে দেখছে—এমন ডাইনামিক স্ট্যাচু খুব কম দেখা যায়। জীবন্ত পাথর। পার্ক স্ট্রিটে ওর পেডেস্টলে এখন গান্ধীর মূর্তি বসানো আছে—সেটাও মন্দ নয়। কিন্তু তার গ্র্যাঞ্জারই আলাদা।
কুয়াশার ভিতরে দেখা যায় আরও কয়েকজন পাথরের মানুষকে। ব্রিটিশ আমলের কলকাতার সব স্মৃতি। অনিল রায়ের বোধ হয় সেই সব মূর্তি দেখে যৌবন বয়সের কলকাতার কথা মনে পড়ে যায়। তিনি ম্যাক্সের কাঁধে হাত রেখে একটু পিছিয়ে চলতে থাকেন। এবং একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্পই বলতে থাকেন বোধ হয়।
অন্যমনস্ক সোমেন এগিয়ে হাঁটছিল। পিছনে মেয়েরা। পূর্বা একটু এগিয়ে এসে বলে—কী কাণ্ড করলি বল তো!
—কী?
—এখন যদি শ্যামলকে খুঁজে না পাই আমরা?
সোমেন কথাটায় কান না দিয়ে বলে—পূর্বা, তোদের বাড়ির ওপরতলায় একটা এক-ঘরের ফ্ল্যাট খালি আছে বলছিলি না?
