উৎসবের এত হইচইয়ের মধ্যেও ননীবালা উদগ্রীব হয়ে আছেন রাস্তার দিকে। কেউ কি আসবে না? বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। কলকাতার গাড়ির খোঁজ নিচ্ছেন বার বার। মনে মনে। নিজেকে বোঝাচ্ছেন—ওরা তো সব দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর চা-টা খেয়ে রওনা হবে, হাওড়া তো কম দূর নয়। হাওড়া থেকে প্রায় দুঘণ্টা গাড়িতে এসে আবার এতখানটা পথ। সময়ের হিসেব করে ননীবালা দেখেন, বারোটা একটার আগে এসে পৌঁছোবে না। কেউ। তবু যদি আসে। কাউকে জোর করার নেই, দাবিদাওয়া নেই, দয়া করে যদি আসে।। বড় অভিমান হয় ননীবালার। একটা জীবন বুক দিয়ে ছেলেপুলে আগলে রেখে মানুষ। করলেন, ওরা তবু কী করে সব ভুলে যায়!
ব্যাপার-বাড়িতে কিছু গণ্ডগোল হবেই। কপিলের ছেলে গাছে উঠেছিল, পড়ে গিয়ে তার। ড্যানা ভেঙেছে! হইচই কাণ্ড। বৈচীর হাসপাতালে তাকে নিয়ে রওনা হল কজন। এর মধ্যে রব উঠল, নন্দলালের পাঞ্জাবির সোনার বোতাম চুরি হয়েছে। নন্দলাল থানা-পুলিশ করবে। বলে চেঁচাচ্ছে। বিন্দু এসে ননীবালাকে বলে—এ হচ্ছে মেঘু ডাক্তারের ছেলেদের কাজ। ওরা বড্ড চোর! নন্দলাল ঘেমো পাঞ্জাবি খুলে বেড়ার গায়ে রোদে দিয়ে পাশ ফিরতে না। ফিরতে চুরি। এত চটপটে হাত আর কার হবে! ফকিরসাহেবের ভূতুড়ে বাড়িতে দিনমানে লোক যায় না, সেইখানে পর্যন্ত গিয়ে ওরা ফকিরসাহেবের পেতলের মোমদানী চুরি করেছিল। অমন ডাকাবুকো আর কে আছে!
এই সব গোলমালে ননীবালা একটু আনমনা হয়েছেন, ঠিক এই সময়ে নয়নতারা ধেয়ে এসে চেঁচিয়ে বলল—ও মা, তোমার ছেলেরা সব এসেছে, নাতিপুতি সব। দেখো গে যাও, চার রিকশা বোঝাই।।
ননীবালা বড্ড তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়েছেন উঠে। মাথাটা চন করে পাক মারল, বুকটায় ধরল। চাপ। শ্বাসকষ্ট। উপোসী শরীরের দুর্বলতাও আছে। চোখ অন্ধকার করে ধীরে ধীরে এসে বসে পড়েন ফের। নয়নতারাই এসে ধরে তাঁকে—ও মা, কী হল গো?
ফ্যাকাসে ঠোঁটে ননীবালা বলেন—নয়ন, তুই যা, ওদের নিয়ে আয়। আমার বুকটা —
কিছুক্ষণ কথা বলতে পারেন না। বুড়ো বয়সের শরীর, বেশি সয়বয় না। নয়নতারা হাপুর-হুপুর হাতপাখার হাওয়া করে, বুক মালিশ করে দেয়। বলে—চিন্তা করো না মা, এসেছে যখন সবাই ঠিক তোমার কাছে আসবে।
—তবু তুই যা। বলে ননীবালা নিজেই ওঠেন আবার। বলেন—এখন একটু ভাল। লাগছে।
ননীবালা বাইরে আসেন। বিশ্বাস হয় না, তবু দেখেন, কুঞ্জলতায় ছাওয়া শুড়ি পথ ধরে অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে চারদিক দেখতে দেখতে সব আসছে। পথ দেখিয়ে আনছে বহেরু। সে ননীবালার দিকে চেয়ে একটা ডাকাতে হাঁক পেড়ে বলে—মাঠান, সব আসে পড়েছে! দেখেন। জয় ভগবান।।
ভগবানের বড় দয়া। বড় দয়া। ননীবালার বুকের অন্তস্থলে থিতিয়ে ছিল চোখের জল। নাড়া খেয়ে তারা উঠে এল। চোখ ঝাপসা, কণ্ঠায় আটকে আছে কান্নার দলা।
প্রথমে সোমেন, তার হাত ধরে টুবাই, পিছনে রণেন, বীণা, বুবাই আর বেলকুঁড়ি। কিন্তু তার পিছনে ছেলে কোলে সুন্দর মেয়েটা কে? ও মা! শীলা নাকি! কী সুন্দর হয়েছে শীলা! কোল ভরা মোটাসোটা ছেলেটাই বা কী সুন্দর! স্বয়ং গোপাল। ও কি অজিত? তাই তো! হায় সর্বনাশ, এ আবার কাকে দেখছেন ননীবালা? এ কি সত্যি? ইলা না! মুম্বই থেকে ইলা আবার কবে এল? হাত ধরে গুটগুটিয়ে তার ছেলেও আসছে। ইলার পিছনে ইলার বরকেও দেখা যাচ্ছে যে! এ কি স্বপ্ন দেখছেন ননীবালা? সত্যি তো! ভগবান এটা যেন স্বপ্ন না হয়। এটুকু দয়া করো ভগবান।
রণেনের হাতে বিশাল এক মিষ্টির হাঁড়ি, সোমেনের হাতে মস্ত সন্দেশের বাক্স, রণেন। এসে সোজা পায়ের ওপর পড়ে কান্না—মাগো, আমাদের কি আর মনে পড়ে না?
তাকে ধরে তুলবেন কী, তার আগেই রক্তের ছানাপোনারা সব ঘিরে ধরেছে তাঁকে—মা ঠাকুমা ডাকে অস্থির করে তুলল বাতাস। এত সুখ বুঝি সইবে না শরীরে। বুজি দম ফেটে মরে যাবেন। বুকের ভিতর তুফান ছুটছে। নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে অবিশ্বাস্য আনন্দে। অবিরল বয়ে যাচ্ছে চোখের জল। ফোঁপাচ্ছেন।
ইলা এসে জড়িয়ে ধরে ঘরে নিয়ে যায়। টুবাই কোলে চড়ে বসে থাকে। শীলা তার। ছেলেকে বিছানায় শুইয়ে নিয়ে বলে—বাব্বা! কী রাস্তা!
ননীবালা একটাও কথা বলতে পারেন না। অবিশ্বাস্য বোবা হয়ে যান। ছেলেরা জামাইরা প্রণাম করে যাচ্ছে, আশীর্বাদটুকু পর্যন্ত মনে করতে পারছেন না। কেবল মাথায় হাত রাখছেন। কাঁদছেন। বিশ্বাস হয় না।
ব্রজঠাকুরের ছেলেপুলে শহর থেকে এসেছে শুনে বিস্তর ভিড় হয়ে গেল ঘরের মধ্যে। বহেরুর বউরা সব ঘোমটা টেনে এসে দাঁড়াল, বড় মেয়ে এল, পড়শিরা এল। বামন মতিরামও ঝলমলে পোশাক পরে এসে কয়েকটা ডিগবাজি দেখিয়ে দিল সবাইকে।
ব্রজগোপাল এসে দাঁড়ালেন একটু দূরে পর মানুষের মতো। তিনি জানেন একটু দূরত্ব থাকলেই সঠিক নিরীক্ষণ হয়। যত মাখাজোখা করবে, যত কাছে টানবে, তত দেখাটা হবে। অস্পষ্ট। তাঁর মুখে স্মিত সংযত ভাব। ছেলেমেয়ে জামাই আর নাতি-নাতনিরা প্রণাম করছে, তিনি চোখ বুজে দয়াল ঠাকুরকে স্মরণ করছেন। দয়াল, ওরা যেন সুখে থাকে। যেন ওরা কারও দুঃখের কারণ না হয়। ওদের সুখ যেন কাউকে দুঃখী না করে। নিজে সুখী হয়ে ওরা যেন সবাইকে সুখী করে।
এই সুখ-দুঃখের তত্ত্বের মধ্যেই পৃথিবীর সব সত্য নিহিত আছে। বড় শক্ত ব্যাপার। নিজে সুখী হও, সবাইকে সুখী করো—এ কি পারবে তোমরা?
