বহেরু ময়দানবের মতো খেটে বাড়িটা খাড়া করে দিল। ছাদ ঢালাইয়ের অনেক ঝামেলা বলে ওপরটায় টিন লাগাল। জানলা দরজা বসে গেছে। গৃহ প্রবেশের নেমন্তন্ন করে ফের কলকাতায় চিঠি দিলেন ননীবালা। বুকটা দুরদুর করে। আসবে তো কেউ?
ননীবালা সবিস্ময়ে একটা জিনিস বুঝতে পারেন। আগে ভেবে রেখেছিলেন যে, হাভাতে স্বামীর ঘর করতে এসে বুড়ো বয়সে বড় অভাবের কষ্ট পাবেন। কিন্তু এসে দেখছেন, কোনওদিন অভাবের ছায়াও মাড়াতে হচ্ছে না। যা চাইছেন তাই জুটে যাচ্ছে। শুধু যে বহেরু দেয় তা নয়, হঠাৎ কোত্থেকে কোন দূরান্তের মানুষ এসে ঝপাস করে একজোড়া চওড়াপেড়ে শাড়ি পায়ে ফেলে উবু হয়ে প্রণাম করে যায়। কেউ বা একঝুড়ি তরকারি এনে ফেলে গেল। ব্রজগোপাল যাজনে বেরিয়ে যখন ফেরেন তখন কত কী বয়ে আনেন। বলেন, সব জোর করে গছিয়ে দেয়, ফেলতে পারি না। তা দেওয়ার অভ্যেস ভাল। যে দিতে শেখে, তার বুদ্ধি অনেকটা ঠিক আছে। ব্রজগোপাল নিজে গুরু নন, গুরুর নাম বিলিয়ে বেড়ান ঋত্বিক বা পুরোহিত হিসেবে। কেউ তাঁকে গুরু বলে ভুল করলে হেসে বুঝিয়ে দেন—গুরু মানে হচ্ছে। ওজনে ভারী। যার জ্ঞানের ওজন, উপলব্ধির ওজন যত বেশি সে তত বড় গুরু। সেই হিসেব। ধরলে দুনিয়ার কে গুরু নয় বলো, কাঙালের কাছেও শেখবার আছে, তার নিজস্ব অর্জিত জ্ঞানও তো কম নয়! কিন্তু সদগুরু যিনি, সন্ত যিনি, তাঁর মধ্যে থাকে সর্বজ্ঞত্ব বীজ। আমি তাঁর পাঞ্জাধারী পুরুত, লোককে তাঁর ঠিকানা দিয়ে বেড়াই। তোমরা নিজের চেষ্টায় পৌঁছেও বাবারা। তো পুরুত হয়ে তাঁর যজমান কম নয়। ব্রজগোপালকে হাত পাততে হয় না, লোকে হাত পাতবার আগেই দেয়। তাই ব্রজগোপালের কোনও অভাব নেই।
এইটে দেখে বড় বিস্ময় ননীবালা। হাড়-হাভাতে বাউণ্ডুলে তাঁর স্বামী। তিনি কষ্ট পাবার জন্য তৈরি হয়েই এসেছিলেন। এসে দেখেন, ঘরে সোফাসেট বা রেডিয়োগ্রাম না থাকলেও ব্রজগোপালের ঘরে লক্ষ্মীর গায়ের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে তরিতরকারি বিলিয়ে। দিতে হয়। দুমাসে প্রায় তিরিশখানা মিহি জমির শাড়ি পেয়েছেন। প্রণামীর টাকা প্রতি মাসেই অন্তত শখানেক কেবল তাঁর হাতে এসেছে। ননীবালা এসব নিয়ে খুব খুশি। বলেন—তোমার। যে খুব রবরবা গো।।
ব্রজগোপাল গম্ভীর হয়ে বলেন, এ কী দেখছ। বিবেকানন্দের নামে কত হাজার বিদেশি কারেন্সির প্রণামী আসে একবার জেনে এস। চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে। তাই ভাবি, ফরেন ক্যাপিটালের জন্য হা-পিত্যেশ করে না থেকে যদি একশো বিবেকানন্দ তৈরি হত দেশে তো টাকাপয়সায় ভাসাভাসি কাণ্ড হত। লোককে যদি ধর্মদান করতে পারো তো পঞ্চভূত এসে তোমার সংসারে বেগার খেটে যাবে।
গৃহপ্রবেশের আয়োেজন নমোনমো করে সারতে চাইলেও হল না। ব্রজঠাকুরের বাড়ি হচ্ছে শুনে বৈঁচী, গোবিন্দপুর, বর্ধমান থেকে বিস্তর লোক খোঁজখবর করতে এল। জানালা দরজার কাঠ পাওয়া গেল বিনা পয়সায়, রং পাওয়া গেল, সস্তায় কিছু লোহালক্কড়ও দিল একজন। সবাইকে বলতে হয়, তাই বলেন ননীবালা, বাদ রাখলেন না।
উৎসবের দিন মচ্ছব লেগে যাবে আন্দাজ করে বহেরু বলে দিল—কর্তা, সোজা খিচুড়িভোগ, লাবড়ার তরকারি, আর চাটনির ব্যবস্থা করুন। শেষ পাতে কিছু মিহিদানা আর দই।
কলকাতার জমিতে বাড়ি হবে-হবে করেও হল না। কত আশা ছিল ননীবালার। একবার কৌশল করে রণেনের বউ জমিটা নিজেও কিনতে চেয়েছিল। জমিটায় অভিশাপ আছে বোধ হয়। কতকাল পড়ে থাকবে কে জানে! ছেলেরা কী করবে তাও ঠাকুর জানেন। কিন্তু এখানে। এতদিন পর স্বাধীন হতে পেরেছেন তিনি। যেমন হোক, তবু নিজের বাড়ি। চারদিকে অনেকটা জমি। বাচ্চারা জমি কুপিয়ে এরমধ্যেই গাছ লাগিয়েছে কত! বাড়ি তৈরি শেষ হওয়ার আগেই জমির ক্ষেতে ফুল ফল আসতে লেগেছে। এখানে জীবনটা শান্তিতে না হোক স্বস্তিতে কাটবে। একটু একা লাগবে কি! লাগুক। বলতে কী, জীবনটা তো তাঁর একাই হয়ে গেছে। ছেলেরা খোঁজ নিল না।
গৃহপ্রবেশের দিনটায় সকাল থেকে পুজোর শেষ অবধি উপোস করে থাকা ছাড়া আর কোনও ঝক্কি পোয়াতে হয়নি ননীবালার। রাশি রাশি জিনিসপত্র জড়ো হয়েছে। কে কুটছে, কে বাটছে বোঝা মুশকিল। তবে চেনা-অচেনা সবাই খাটছে। বিশাল এক তেরপলের তলায় যজ্ঞির রান্না হচ্ছে। পুজো চলছে উঠোনে। ব্রজগোপাল নিজে পুজো করলেন না, পুরুত করছে। তিনি গা আলগা দিয়ে বহেরুর উঠোনে বসে আছেন। খোলা রোদে তাঁকে ঘিরে বিস্তর লোক ঠাকুরের কথা শুনছে। উপপাসী মুখে কোনও ক্লান্তি নেই, বৈকল্য নেই। পারেও বটে লোকটা—ননীবালা ভাবেন। প্রতি মাসে একবার করে চতুরহ সহ শিশু প্রাজাপত্য করেন। সে ভারী কষ্টের। প্রথম দিন পূর্বাহ্নে হবিষ্যান্ন মাত্র, দ্বিতীয় দিন অপরাহ্নে একবার হবিষ্যান্ন, তৃতীয় দিন অযাচিত—অর্থাৎ কেউ ব্ৰতর কথা জেনে কিছু দিলে তাই দিয়ে হবিষ্যান্ন, চতুর্থ দিন কাঠ-উপোস। ননীবালা আপত্তি করলে বলেন—কত অজানিত অপরাধ করছি প্রতিদিন, তার প্রায়শ্চিত্ত করে রাখি। প্রায়শ্চিত্ত মানে দণ্ড নয়, পুনরায় চিত্তে গমন, স্বাভাবিকতায় প্রকৃতিতে ফিরে আসা।
ননীবালা তত্ত্বকথা বোঝেন না, কষ্টটা বোঝেন। মানুষটা চিরজীবন তাঁর অচেনা রয়ে গেল। এখন অবশ্য আর বাধা দেন না। এখানে এসে বুঝেছেন, ব্রজগোপাল খুব হালকা লোক নন। চারদিকে তাঁকে গুরুত্ব দেওয়ার লোকের অভাব নেই। ফকির সাহেব পর্যন্ত এসে কত সম্মান আর আদর দেখিয়ে যান রোজই। স্বামীর সম্মানের ভাগ এই প্রথম পাচ্ছেন ননীবালা। এর আগে কয়েকদিনের জন্য এসে এত বুঝতে পারেননি।
