ছোট জামাই বিদেশ ঘুরে এসেছে। হাসিমুখে সে বলল—এ খুব খাঁটি জায়গায় আছেন বাবা। গাছপালা মাটি—এ সবই হচ্ছে মানুষের এলিমেন্টাল জিনিস।
—তোমরা কবে এলে?
—আমি মুম্বই ফিরেছি দিন-দশেক আগে। লন্ডনের এক কোম্পানি চাকরি অফার করেছে কলকাতায় তাদের অফিসে। তাই চলে এলাম কন্ডিশন দেখতে। মাসখানেক পরে এসে জয়েন করব। কলকাতায় এলে মাঝে মাঝে উইক এন্ডে চলে আসব এখানে। কী সুন্দর জায়গা!
অজিত বেশি কথা বলে না। ব্রজগোপাল তারদিকে চেয়ে বলেন—অজিত, তোমার শাশুড়ির বাড়ি দেখেছ?
—দেখব। বাইরে থেকে দেখেছি। খুব ভাল লাগছে।
ব্রজগোপাল গম্ভীর হয়ে বলেন—ভালই। তিনচারখানা ঘর হয়েছে শেষ অবধি। আমার প্রথমে খুব ইচ্ছে ছিল এখানে বাড়ি করার, পরে নানা কারণে আর ইচ্ছে হয়নি। তোমার শাশুড়ি এসে পড়ায় শেষ পর্যন্ত হল। অনেকগুলো ঘর আছে, কলকাতার ওপর কখনও বিরক্তি এলে তোমরা চলে এস এখানে, যতদিন খুশি থেকে যেয়ো।
—আসব। জায়গাটা বড় ভাল। অ্যাওয়ে ফ্রম ম্যাডেনিং ক্রাউড।
—চলো, দেখবে। বলে ব্রজগোপাল জামাইদের নিয়ে এগোনে। চোখের ইঙ্গিতে সোমেনকে ডাকেন, সেও আসে।
নতুন চুনের সোঁদা গন্ধঅলা ঘর। চারদিকে জানলা দরজা খোলা। ফটফটে রোদ আর হাওয়ায় ঝলমল করছে। সামনের ঘরে যজ্ঞ হচ্ছে, পুরুতের মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পেঁয়ো উচ্চারণে সংস্কৃত মন্ত্র, তবু শুনতে শুনতে শৈশব ফিরে আসে। ঘুরে ঘরে। ঘরদোর দেখান ব্রজগোপাল। সোমেনের দিকে চেয়ে বলেন—কেমন?
সোমেন তার সুন্দর মুখশ্রীতে চমৎকার হাসির আলোটি ছড়িয়ে দিয়ে বলে—আমাদের। কোথাও একটা বাড়ি আছে, এটা ভাবতেই ভাল লাগবে এখন থেকে।
ব্রজগোপাল ভ্রু কুঁচকে একটু ভেবে আস্তে করে বলেন—কথাটা শুনতে ভাল, কিন্তু ওর অর্থ ভাল নয় বাবা, তুমি তো অসহায় নও যে দুনিয়ার কোথাও তোমার আশ্রয় নেই এ বাড়িটা ছাড়া।
—আমাদের নিজের বলতে তো কিছু নেই বাবা।
ব্রজগোপাল শ্বাস ফেলে মাথা নেড়ে বলেন—জানি। তবু বলি, পুরুষমানুষ হয়েছ, নিজেকে কখনও নিরাশ্রয় ভেবো না। ঠাকুর সকলের জন্যই সব দিয়ে রেখেছেন, খুঁজে পেতে অর্জন করে নিতে হয়। আবার স্বার্থপরও হতে নেই। তোমার ঘর যেন হয় মন্দিরের মতো।
ননীবালার কান্না থেমেছে। শরীরে শক্তির জোয়ার এল বুঝি। নাতিদের, ছেলেপুলেদের, নাড়ু-মোয়া দিচ্ছেন, জল গড়িয়ে আনছে নয়নতারা। ননীবালা বলেন—এটুকু খেয়ে নে সব। ভাতে বসতে দেরি আছে।
বীণা বলে—এবার পুজোয় আপনাকে কাপড় দিতে পারেনি আপনার ছেলে। মাইনে-টাইনে সব কেটে নিত তো কামাইয়ের জন্য। এখন কিনে এনেছে।
ননীবালা বলেন—কাপড়! সে কথা বোলো না বউমা, কাপড়ের অভাব নেই। এসে অবধি এ পর্যন্ত কতগুলো যে পেয়েছি। এক ছেলে দেয়নি তো কি হয়েছে, কত ছেলে আমাকে। দিয়ে যায়।
ঝোলা ব্যাগ থেকে বীণা শাড়ি বের করে দেখায়। বেশ শাড়ি, খুব চওড়া পাড়ে মুগার সুতোর টান রয়েছে। অন্তত ষাট পঁয়ষট্টি তো হবেই। শীলা আর ইলাও শাড়ি এনেছে। ননীবালা বলেন—তোরা কি আমাকে শাড়িতে ঢেকে দিবি নাকি?
ভারী আনন্দ। ঘর ভরতি। আপনজনদের কথার কলরোল, হৃৎপিণ্ডের শব্দ, রক্তের গুঞ্জন। বাতাসটা পবিত্র হয়ে গেল।
শীলার ছেলেটা চিত হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। একরাশ জুই ফুল পড়ে আছে যেন। ননীবালা বলেন—ও শীলা, আমার এই বরটির নাম কী রেখেছিস শুনি!
শীলা মোয়ায় কামড় দিয়ে বিষম খেয়ে হেসে ফেলল। ননীবালা বললেন—ষাট ষাট।
সামলে নিয়ে শীলা বলে—আবার কী! বাবা নাম লিখে পাঠিয়েছিল, সেই নামই রাখল। তোমার জামাই। বলল—শ্বশুরমশাই শাস্ত্রজ্ঞ লোক, জেনেশুনে বুঝেই নাম রেখেছেন নিশ্চয়ই। তাই নাম রাখা হয়েছে ঋতম্ভর।
—বেশ নাম। ইলা, তোর ছেলের?
—আর বোলো না, আমার শাশুড়ি নাম রেখেছেন ননীচোর। সেই নামই নাকি থাকবে। বড় হয়ে ছেলে আমাদের মারতে আসবে দেখো। চোর-টোর দিয়ে কেউ নাম রাখে! তার ওপর আবার দিদিমার নামও ননীবালা। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে! বরং স্কুলে ভরতি করার সময়ে চুপ চুপ করে নাম পালটে দিয়ে আসব।
নাম শুনে সবাই হাসে।।
কিছু সময় পার হয়ে যায়। বেলা হল। ননীচোরকে নিয়ে বেলকুঁড়ি বাইরে কাক বক দেখাচ্ছে। ননীবালা তাকে ডাক দিয়ে বলেনননীবালাকে চুরি করবি নাকি ও ভাই? নিয়ে যা চুরি করে। তোর দাদু বুড়ো বয়সে একটু কাঁদুক।
শীলা বলে—মা, বেশ তো থেকে গেলে এখানে! একবার খবরটাও দিয়ে আসোনি! আমি শুনে তো হাঁ। বিশ্বাসই হয়নি প্রথমে যে, তুমি সবাইকে ছেড়ে বাবার কাছে চলে। আসতে পারো।
ননীবালা চুপ করে রইলেন খানিক। ভেবে বললেন—হুট করে এলাম বটে, কিন্তু কাজটা খারাপ হয়নি মা। এখানে এসে বেশ আছি। মনটা হু-হু করে বটে, তবু বেশ লাগে। তোরা। আসবি, থাকবি, বেড়িয়ে যাবি। হ্যাঁ রে, সোমেন কী বলে। আমেরিকা না কোথাকার পোকা। যে ঢুকেছিল মাথায়!
শীলা মাথা নেড়ে বলে—লক্ষ্মণবাবু ফিরে গিয়ে সোমেনকে লিখেছেন—না আসাই ভাল। লক্ষ্মণবাবুও ফিরে আসছেন। চাকরিবাকরি করবেন না, নিজেই একটা কোম্পানি খুলবেন বলে ঠিক করেছেন এখানে। সোমেনকে সেখানে চাকরি দেবেন।
—ওমা, তাই নাকি?
শীলা হেসে বলে—গাছে কাঁঠাল, গোঁফে তেল। তবে লক্ষ্মণবাবু মানুষটা তো খুব খাঁটি। যা বলেন তাই করেন।
