—কী হল?
—চাকরি বজায় রাখতে কত ওভার-টাইম খাটতে হচ্ছে।
—ইস! কী যে অসহ্য হয়ে যাচ্ছ না দিনকে দিন!
—সেই জন্যই তো বলছিলাম, আরও অসহ্য হয়ে ওঠার আগেই কথাটা বলে ফেলার একটা চান্স দাও। এমন ফাঁকা রাস্তা, নিঝুম শীতের রাত, লোড শেডিং থাকলে চাঁদও দেখা যেত ঠিক। ধরো, যদি বলি…
—ওই যে ট্যাক্সি সোমেন। ধরো, দৌড়ে যাও…
সোমেন দৌড়োল, এবং চটির একটা স্ট্র্যাপ ছিঁড়ে ট্যাক্সিটা ধরতে পারল। অবশ্য আর কেউ ট্যাক্সি ধরার জন্য ওত পেতে ছিল না। যতদূর দেখা যায় রাস্তাটা অতিশয় নির্জন।
ট্যাক্সিতে সোমেন একটা সিগারেট ধরাল। হাঁফাচ্ছিল একটু। দুঃখিত স্বরে বলে—সব মুচি ঘরে আসে, সব চটি ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন—
—কী বলে রে পাগলা? অণিমার হাসি চলকায়।
—রাস্তায় এত রাতে মুচি নেই একটাও। তোমার ট্যাক্সি ধরতে গিয়ে চটিটা ছিঁড়েছে মাইরি।
অণিমা শ্বাস ফলে বলে—কী যে কাণ্ড করো না!
—তুমি দৌড়োতে বললে যে! না দৌড়োলে যদি চাকরিটা খাও?
—ইচ্ছে করেই তো বললাম, নইলে তুমি বোকার মতো কথাটা বলে ফেলতে যে!
সোমেন সবিস্ময়ে বলে—কোন কথাটা?
—যেটা বলতে চাইছিলে!
—কী বলতে চাইছিলাম বলো তো!
—ওই যে! ধরো, যদি বলি—
সোমেন বিরসমুখে বলে—থাকগে। বোলো না।
—বলব না?
—অন্য দিন বোলো। সোমেন সিগারেটে টান দিয়ে বলে—যেদিন ফুলটুল ফুটবে, চাঁদ-টাঁদ উঠবে, লোড শেডিং থাকবে, দূরে কোথাও গিয়ে—
দুজনেই হেসে গড়ায়। পাঞ্জাবি ট্যাক্সিওয়ালা ঘাড় না ঘুরিয়েই একটা অস্ফুট শব্দে রাস্তা জানতে চায়। অণিমা হাসি না থামিয়েই বলে—সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ।
অণিমা তার খোঁপা ঠিকঠাক করল, গা ঢাকা দিল, গাড়ির কাচটা তুলে দিল ভাল করে। বলল—শোন, কথাটা একজন বলে ফেলেছে।
—কোন কথা? সোমেন উদাসভাবে জিজ্ঞেস করে।
—সেই কথাটা।
—ও। সোমেন তেমনি নিরাসক্ত। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড পেরিয়ে লোয়ার সার্কুলার রোড ধরে ছুটছে গাড়ি। ডাইনে মোড় নিল একটা। কী চমৎকার সব মস্ত মস্ত ফ্ল্যাটবাড়ি, নিঝুম, অ্যারিস্টোক্র্যাট আর নরম সব আলোর রঙে রঙিন। মুগ্ধ হয়ে দেখে সোমেন।
—সত্যি বলছি। অণিমা বলল।
—কে বলেছে কথাটা।
—ম্যাক্স।
সোমেন একটু অবাক হয়ে বলে—কে বললে?
—ম্যাক্স।
—সে কে?
—একজন অস্ট্রেলিয়ান সাহেব।
—তাকে কোথায় পেলে?
—পেয়ে গেলাম। একটা সেমিনারে আলাপ। সেখান থেকেই পিছু নেয় কলকাতার গলিঘুঁজি দেখবে, বাঙাল রান্না খাবে, সেতার আর তবলা শিখবে। কিছুতেই ছাড়ে না। তাই তার গাইড হয়ে সঙ্গে নিয়ে কিছুদিন ঘুরলাম, নেমন্তন্ন করে খাওয়ালাম, গানের ইস্কুলে নিয়ে গেলাম। সেই থেকে কী যে হয়ে গেল ওর!
সোমেন চোখ মিট মিট করে ট্যাক্সির মধ্যেকার অন্ধকারে আবছা অণিমার মুখের দিকে চায়—বলেছে?
—তোমার গা ছুঁয়ে বলছি। তিন-চারদিন আগে ওর সঙ্গে তারাপীঠ গিয়েছিলাম। মস্ত শ্মশান সেখানে, গাঁজার আড্ডা। ম্যাক্স গাঁজা খেতে গেল, আমি শ্যামলের সঙ্গে এধার-ওধার ঘুরে দেখছিলাম। ম্যাক্স ঘণ্টাখানেক গাঁজা-টাঁজা টেনে এসে সোজা আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল—
কথাটা শেষ না করে ট্যাক্সির ভিতরকার অন্ধকারে অণিমা ভারী রহস্যময়ী হয়ে বসে থাকে।
সোমেন বিরসমুখে বলে—তারাপীঠ জায়গাটাই খারাপ। আর কখনও যেও না—
অণিমা মুখ ফিরিয়ে নিবিষ্টমনে বাইরের দিকে চেয়ে ছিল। স্তিমিত গলায় বলল—কলকাতায় কত সুন্দর সুন্দর বাড়ি অণিমা। আমাদের যদি একটা বাড়ি হয়, আর ব্যাঙ্ক অফ বরোদার চাকরিটা তা হলে একদিন চলো তোমার সঙ্গে তারাপীঠে যাই।
—ওমা! কেন?
—তারাপীঠে না গেলে তুমি শুনবে না কথাটা!
—কোন কথা?
—সেই যে। ধরো, যদি বলি—
—বোলো না, বোলো না—
বলতে বলতে অণিমা হাসতে থাকে। সোমেন তেমনি স্তিমিত গলায় বলে—কতদিন ধরে বলতে চেষ্টা করছি। একবার তারাপীঠে না গেলে—
চিনে রেস্টুরেন্টটার দিনকাল শেষ হয়ে গেছে। তবু বহুকালের পুরনো নিয়মমাফিক আজও একজন আধবুড়ো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাঞ্জো বা ওই জাতীয় কোনও একটা তারের যন্ত্র বাজায় মিনমিন করে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের দ্রুতগামী অটোমোবিলের শব্দে কিছু শোনা যায় না। লোকটা তবু প্রাণপণে বাজায়।
বাঁ ধারে শেষ কেবিনটায় ঢুকে সোমেন অবাক হয়। ইউনিভার্সিটি ছাড়ার পর যাদের কোনওদিনই আর দেখবে না বলে ভেবেছিল তাদের কয়েকজন বসে আছে। একধারে অপালা আর পূর্বা। অন্যধারে অধ্যাপক অনিল রায়, শ্যামল আর একজন নীলচোখো, সোনালি চুলো, গোঁফদাড়িওলা অল্প বয়সি সাহেব। তার পরনে খদ্দরের গেরুয়া পাঞ্জাবি, তার ওপর কালো জহর কোট। সাহেব কী বলছিল, অপালা আর পূর্বা তার ইংরেজি কিছুমাত্র না বুঝে হেসে কুটিপাটি।
মুখ তুলেই পূর্বা লাফিয়ে ওঠে—সোমেন! কী রোগা হয়ে গেছিস! রোজ তোর কথা ভাবি। মাইরি!
—আমিও। সোমেন নিরুত্তাপ গলায় বলে।
অপালা বড় বড় চোখ করে চেয়েই হেসে ফেলে—সোমেন, তুই বেশ মোটা-সোটা হয়েছিস তো!
—তুইও।
ওরা সরে বসে জায়গা করে দেয়। অণিমা আর সোমেন বসে। বসেই টের পায়, উলটোদিকে তিন-তিনটে আধো মাতাল চেয়ে আছে।
অধ্যাপক অনিল রায় বলেন—আগন্তুকটি কে অণিমা?
—সোমেন স্যার।
—আমারও তাই মনে হচ্ছিল। মুখটা চেনা-চেনা।
শ্যামল সাহেবের কাঁধের ওপর থেকে হাতটা সরিয়ে সোজা হয়ে বলে—সোমেন, তোর সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। রিগার্ডিং—
