টিউশনিটা তাই আর ভাল লাগে না সোমেনের। খামোখা। চাকরিটা পেলে বরং হয়। টিউশনিটা ছাড়লে অণিমাও সহজভাবে কথা বলতে পারে আবার। বড্ড আবেগপ্রবণ মেয়ে। আবার মাসের প্রথমে একশোটা টাকা পাওয়ার অভ্যাসই বা কেমন করে ছাড়ে সোমেন?
সন্ধ্যাবেলা সোমেন গাব্বুকে পড়িয়ে বেরোচ্ছে, হঠাৎ দেখে, অন্যমনে মাথা নিচু করে অণিমা অন্য দরজা দিয়ে বাসা থেকে বেরোচ্ছে। তেমনই আছে অণিমা। ভারী চশমার আড়ালে চোখ, পরনে ছাপা শাড়ি, গায়ে স্টোল, হাতে ব্যাগ, পায়ে চপ্পল। মুখে কোনও প্রসাধন কখনও মাখে না, চুল রুক্ষ।
—এই যে বস, কী খবর?
অণিমা চমকাল না। অণিমা কখনও চমকায় না। অণিমা কখনও চমকাবে না। আচমকা বোমা পড়লেও না। ওর ওই স্বভাব। গম্ভীর মুখখানা তুলে চমৎকার মুখে হাসল—কী খবর! ছাত্র কীরকম পড়ছে?
—ভালই। টার্মের ইনক্রিমেন্ট দেবে নাকি?
—ইনক্রিমেন্ট? ভারি অপ্রতিভ গলায় বলে অণিমা।
তেমনি ঠাট্টার স্বরে সোমেন বলে—ইনক্রিমেন্ট না দিলে ঘেরাও করব।
—একা কি কাউকে ঘেরাও করা যায়?
চোখ নাচিয়ে সোমেন বলে—যায় না?
—কীভাবে শুনি?
সোমেন শব্দহীন হাসি হেসে বলে—যায়। একজনের দুটো হাতে একদিন ঠিকই ঘেরাও হবে তুমি। জানো না?
অণিমা মাথা নেড়ে বলে—না তো! কে সে?
—ধরো, যদি বলি….
॥ ছয় ॥
অণিমা মুখ তুলে হাসে। হাসিটা দুষ্টুমিতে ভরা। অণিমা বলল—থাক, বোলো না।
—বলব না? সোমেন বিস্ময়ের ভান করে—তা হলে কথাটা কি টের পেয়ে গেছ?
—না তো! তবে শুনতে চাইছি না।
সোমেন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে—গরিব হওয়ার ওই একটা দোষ। বড়লোকের মেয়েরা পাত্তা দিতে চায় না।
—অ্যাই! তোমাকে আমি পাত্তা দিইনি?
—দিয়েছ? তা হলে শোনোই না কথাটা। ধরো, যদি বলি—
—আঃ। চুপ করো।
—চুপ করব? যদি তোমাদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে আজ আমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয় তা হলে কিন্তু কথাটা না বলাই থেকে যাবে। সারাজীবন তুমি ভাববে, সোমেন কী একটা বলতে চেয়েছিল—
বিরক্তিতে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আবার হেসে ফেলে অণিমা। বলে—গরিবের ছেলের অনেক দোষ। তার মধ্যে মৃত্যু নিয়ে রোমান্টিসিজম একটা।
অণিমাদের বাগানে চমৎকার ফুল ফুটেছে। বারান্দার ফ্লুরোসেন্ট আলোতে অজস্র ভৌতিক ফুল দেখা যাচ্ছে। আসল রং বোঝা যায় না রাতে, কেমন আলোর তৈরি ফুল সব আধো-অন্ধকার বাগানে নিস্তব্ধ হয়ে ফুটে আছে। সোমেন চলে যাবে বলে বারান্দার দুধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে এল। বলল—চলি। বলা হল না কিন্তু।
—না হোক। শোনো, কোথায় যাচ্ছ?
—গড়িয়াহাটা।
—হাতে কোনও কাজ নেই তো!
—কী কাজ থাকবে? সারাদিন নৈকষ্যি বেকার। গড়িয়াহাটায় বুকস্টলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটু লিটল ম্যাগাজিন দেখব, তারপর বাসায় ফিরব।
অণিমার বাইরে যাবার সাজ। সোমেনের পিছু পিছু নেমে আসতে আসতে বলল—একটা জায়গায় আমার সঙ্গে যাবে?
সোমেন দাঁড়ায়। হেসে বলে—যেতে পারি, যদি কথাটা শোনো—
অণিমা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে—কথাটা আর একদিন বললে হয় না! যেদিন বেশ চাঁদটাঁদ উঠবে, ফুল-টুল ফুটবে, দূরে কোথাও যাব আমরা। সেদিন বোলো বাপু!
—সময় কিন্তু বয়ে যাচ্ছে।
—যাকগে। এখন আমাকে পৌঁছে দাও। একা একা ট্যাক্সি চড়তে ভয় করে।
—তাই বলো! নইলে কি আর আমাকে সঙ্গে নিতে!
অণিমা কথা বলে না। ভ্রূকুটি করে।
প্রশস্ত পথটি ধরে ওরা বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের দিকে আস্তে আস্তে হাঁটে। সোমেন সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে বলে—অত রাতে কোথায় যাচ্ছ একা?
অণিমা বলে—একা তো যাচ্ছি না।
—আমাকে না পেলে তো যেতে।
অণিমা হেসে বলে—তাই যদি যাব তবে গাব্বুর পড়ার ঘরের পাশের ঘরটায় বসে ঘণ্টাখানেক মশা তাড়ালাম কেন? বুঝলে মশাই, ঠিক তক্কে তক্কে ছিলাম কখন তোমার পড়ানো শেষ হবে।
সোমেন বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বলে—তাই বুঝি! তবে কী কথাটা তুমিই বলতে চাও অণিমা। তাই অপেক্ষা করেছিলে ট্যাক্সিতে যেতে যেতে বলবে? নাকি কোথাও দুরের কোনও মাঠে পৌঁছে গিয়ে বলবে।
অণিমা ভয় পাওয়ার ভান করে বলে—না, না, আজ নয়। আজ অন্য জায়গায় যাচ্ছি।
সোমেন ম্লান মুখে হাঁটতে হাঁটতে বলে—কলকাতার কত লোকের কত জায়গা আছে যাওয়ার!
—তোমার নেই বুঝি?
সোমেন মাথা নাড়ে। আস্তে আস্তে আপন মনে বলে—ধরো, পার্ক স্ট্রিটের হোটেলে নাচ-গান হুল্লোড় হয়, বড় রেস্টুরেন্টে হয় বিউটি কন্টেস্ট, কেনেল ক্লাবে ডগ শশা, সাউথ ক্লাবে টেনিস, গোপন আড্ডায় নেশাভাঙ। সব জায়গায় যেতে ইচ্ছে করে। একটা শ্বাস ফেলে বলে—এমন গঙ্গার ঘাটেও যাই না, জাহাজ দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। কোনওদিন বিদেশে যাব না, এই সত্যি কথাটা বড্ড মনে পড়ে।
—আচ্ছা ছিঁচকাঁদুনে ছেলে রে বাবা! আর কী কী ইচ্ছে করে তোমার, একটা লিস্ট করে দিও তো! খেয়াল রাখব।
—এই তো ইচ্ছে করছে একটা কথা বলি। ধরো, যদি বলি….
দু’হাতে কান চাপা দিয়ে অণিমা হেসে ওঠে—ওটা থাক।
—থাকবে?
—বললেই তো ফুরিয়ে গেল। থাক না।
—সময় চলে যাচ্ছে।
—যাকগে। তুমি ট্যাক্সি ধরো তো। এই রাস্তায় ট্যাক্সি বড় কম।
সন্ধে সাতটাও বাজেনি। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড এর মধ্যেই জনহীন, পরিত্যক্ত। হুড়হুড় করে কেবল কয়েকটা গাড়ি ওয়াশ-এর ছবির মতো মিলিয়ে যাচ্ছে।
সোমেন রাস্তার দু’ধার দেখে হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলে—প্রাইভেট টিউটর হওয়ার কি গেরো রে বাবা।
