বলে ভুলে যায়। হাতটা অসহায়ের মতো উলটে দিয়ে বলে—যাকগে।
সাহেব প্রোটোকলের তোয়াক্কা না করে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে—ম্যাক্স।
সোমেন হাতখানা ধরে নিয়ে বলে—সোমেন।
হাতটা নরম, একটু ঘেমো। আটলান্টিক নীল চোখ দুটোয় কিছু ভিতু ভাব, খরগোশের মতো, হাসিটি লাজুক। পেটরোগা বাঙালির মতোই চেহারা, কেবল রং-টা ফরসা। সোমেন হাতটা ছেড়ে দিল এবং সাবধানে নিজের হাতের চেটো প্যান্টে মুছে ফেলল।
পূর্বা ফিসফিস করে বলে—যা ভয় করছিল, তখন থেকে তিনটে মাতাল নিয়ে বসে আছি। তোরা কেন দেরি করলি?
সোমেন টের পায় তার পাঁজরে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে অণিমা কী একটা ইঙ্গিত করল। পরমুহূর্তেই অণিমা গলা নামিয়ে পূর্বাকে বলে—দেরি হবে না! বিকেলের মধ্যেই সাক্ষী সাবুদ জোগাড় করে রেজিস্ট্রারের কাছে যেতেই তো বেলা হয়ে গেল। সইটই করে এই দুজনে আসছি।
পূর্বা ভীষণ অবাক হলে বলে—কী বলছিস যা তা!
—মাইরি।
—সোমেনকে?
—আর কাকে?
—কী বলছে রে? বলে অপালা তার লাইমজুসের গেলাস সরিয়ে রেখে রেখে মুখ এগিয়ে আনে।
পূর্বা অসহায়ের মতো বলে—ওরা রেজিষ্ট্রি করে এল, জানিস! কি বদমাশ বলত?
—কে? কারা? ভারী অবাক হয় অপালা।
—অণিমা আর সোমেন।
—মাইরি? অপালার বড় চোখ বিশালতর হয়।
পূর্বা কাঁদোকাঁদো মুখে বলে—এ মা! শেষ পর্যন্ত সোমেনকে?
অণিমা ভারী চশমায় বেশ গম্ভীর মন-খারাপ গলায় বলে—সেই কবে থেকে জ্বালাচ্ছে। বিয়ে করো, বিয়ে করো, ধৈর্য থাকে? আজ তাই ঝামেলা মিটিয়ে দিলাম।
অপালা বড় বড় চোখ করে, নিশ্বাস চেপে শুনেটুনে হঠাৎ বলে—গুল!! ওদের দেখে মোটেই বোঝা যাচ্ছে না বিয়ে করেছে।
এই নাটকটায় নিজের ভূমিকা বুঝতে একটু সময় নিয়েছিল সোমেন। এবার হঠাৎ গা-ঝাড়া দিয়ে মুখ নিচু করে অপালার দিকে চেয়ে বলে—তোমার বুঝে কাজ নেই সোনা। তুমি তো পুতুল! পুতুলের সব বুঝতে নেই।
—মারব এক থাপ্পড়।
অনিল রায় হঠাৎ ওপাশ থেকে বললেন—কী হয়েছে মেয়েরা? রাগারাগি কীসের?
পূর্বা তেমনি কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে—দেখুন স্যার, ওরা দুজন বিয়ে করে এল।
—কারা?
—সোমেন আর অণিমা।
—অ্যাঁ! আমি যেন অন্যরকম শুনেছিলাম! দাঁড়াও, দাঁড়াও, খুব মাতাল হয়ে গেলাম নাকি!
অপালা গলা তুলে বলে—মোটেই বিয়ে করেনি স্যার। সোমেনকে দেখুন, তিনদিন দাড়ি কামায়নি, চোর-চোর চেহারা, ময়লা জামাকাপড়, ও মোটেই বিয়ে করেনি অণিমাকে।
অনিল রায় হাত তুলে অপালাকে থামান, গম্ভীর গলায় বলেন—ইজ ইট ফ্যাক্ট অণিমা? তোমার মুখ থেকে শুনি।
অণিমা ভীষণ লাজুক মুখভাব করে সোমেনের দিকে তাকায়—লক্ষ্মীটি, স্যারকে বলে দাও না।
সোমেন তার খোঁচা খোঁচা দাড়ি চুলকে মাথাটাথা নিচু করে বলে—তুমিই বলো।
একদিন পূর্বার সঙ্গে উজ্জ্বলায় ম্যাটিনিতে সিনেমা দেখে ফিরছিল সোমেন। কালীঘাট স্টপে ভিড়ের পাঁচ নম্বরে উঠতে গিয়ে সোমেন উঠল, পূর্ব উঠতে পারেনি। পূর্বার হাতব্যাগের ভিতরে ছোট্ট পয়সা রাখার ব্যাগে পাঁচটা টাকা ছিল, বাসের পাদানিতে সাফ হাতের কেউ সেটা তুলে নিয়েছিল। বাস ছেড়ে দিলে ভিতর থেকে সোমেন শুনেছিল, পূর্বা সর্বনাশের গলায় চেঁচাচ্ছে—সোমেন! সোমেন! ব্যাপারটা কিছুই না, পরের বাসে পূর্বা আসতে পারত, পয়সা না থাকলেও অসুবিধে ছিল না, কন্ডাকটরকে বললেই হত। কিন্তু পূর্বা ঘাবড়ে-টাবড়ে, দুঃখে কান্নাকাটি শুরু করে, বাসস্টপে কয়েকজন লোকও জুটে গিয়েছিল ওর চারপাশে। সোমেন রাসবিহারী বাসস্টপে নেমে ফিরে এসে পূর্বাকে ঘিরে ভিড়, ঘুনধুন করে কঁদছে পূর্বা, বলছে—আমার বন্ধু চলে গেছে, কী যে হবে! এমা! আমার টাকাও নেই, তুলে নিয়েছে। কী বিচ্ছিরি। বুড়ো একটা লোক ওকে একটা টাকা অফার করতেই পূর্বা ঝেঁঝে ওঠে—আমি কারও কাছে টাকা নেব না। তারপরেই আবার ঠোঁট কাঁপিয়ে চোখভরা জল রুমালে মুছে দিশাহারাভাবে বলতে থাকে—কী যে সব বিচ্ছিরি কাণ্ড না! যা তা! সোমেন যখন ভিড় ঠেলে গিয়ে ওর হাতটা ধরল তখন পূর্বার মুখে-চোখে সে কী আনন্দের রক্তিমাভা, যেন বাচ্চা মেয়ে মেলার ভিড়ে বাবাকে হারিয়ে ফেলেছিল, এইমাত্র ফিরে পেল।
এই হচ্ছে পূর্বা। যেখানে দুশ্চিন্তার কিছু নেই, সেখানেও ওর দুশ্চিন্তা। যেখানে কাঁদবার মতো কিছু ঘটেনি সেখানেও ও কেঁদে ফেলে। আড়চোখে সোমেন দেখে পূর্বার মুখ লাল, ঠোঁট কাঁপছে, চোখের পাতা ফেলছে ঘনঘন এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে। সোমেন ভারী ভয় পেয়ে যায়। পূর্বা ঘনঘন শ্বাস ফেলে বলে—স্যার, বন্ধুকে কেউ বিয়ে করে? সেটা ট্রেচারি নয়। বলেই সোমেনের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে—লজ্জা করে না। কী বিচ্ছিরি সব কাণ্ড করিস না!
সোমেন অবাক হয়ে বলে—কেন, আমি পাত্র খারাপ?
পূর্বা তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলে—সে কথা বলছি নাকি! কিন্তু অণিমা তোকে বর বলে ভাববে কী করে! তুই-ই বা কী করে ভাববি যে—ইস ভাবতেই গা কেমন করে!
অনিল রায় ভারী অবাক হয়ে পূর্বার কাণ্ডকারখানা দেখে বলেন—বন্ধুকে বিয়ে করতে নেই? কেন বলো তো!
—সোমেনকে কখনও স্বামী বলে ভাবতে পারবে অণিমা?
—কেন পারবে না?
—আপনি বুঝতে পারছেন না স্যার। স্বামী মানে তো বড় বড় মানুষ, যাকে শ্রদ্ধাভক্তি করতে হয়। সোমেনটা তো সমবয়সি, কেবল ইয়ারকি করে বেড়ায়, ও স্বামী হবে কী করে?
