বিশাল দলবল নিয়ে বহেরু গিয়ে জমিটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মচ্ছবের মতো ব্যাপার। লাগিয়ে দিল, তার চোখেমুখে একটা প্রচণ্ড আনন্দ। দিনে পাঁচবার এসে ননীবালাকে ডাকে—মাঠান, এসে দেখে যান কেমন হচ্ছে।
ব্রজগোপাল গা করেন না। কিন্তু ননীবালা যান, বলেন—ও বাবা বহেরু, পায়খানা বাথরুম সব, অতদূরে করিস না। শহরে থেকে অভ্যাস, সব সেখানে এক ছাদের তলায়। তোদের এখানে শেয়াল কুকুর সাপ ভূতের তো অভাব নেই, রাতবিরেতে বেরোতে ভয়। করে। তারওপর বুড়োবুড়ি, কে কখন হোঁচট খেয়ে পড়ে হাড়গোড় ভাঙি।
বহেরু রাজি, বলে—তাই হবে। বাংলো প্যাটার্ন।
শুনে ননীবালা হাসেন। এক ছাদের তলায় হলেই তা বহেরুর কাছে সাহেবি বাংলো।। অনেককাল আগে কলকাতায় বাসা দেখে ও বলেছিল—এ হচ্ছে বাংলো প্যাটান। কার থেকে যেন শিখেছিল ইংরেজি কথাটা! তাই শুনে কত হেসেছে রণেন আর সোমেন।
ব্রজগোপাল ঘরেদোরে বেশি থাকেন না। বেরিয়ে পড়েন যাজনে। ঘরবাড়ি তার জন্য। নয়। মানুষ যে আছে সে হল তার অস্তিত্ব, আর মানুষ যে কিছু হয় সে হল তার বৃদ্ধি। এই অত্তি-বৃদ্ধির মামলোত সংগ্রহ করতে হয় আবার পরিবেশ থেকে। সার কথা, নিজের পরিবেশকে সেবা দিয়ে, সাহায্য দিয়ে, ভালবাসা দিয়ে পরিপুষ্ট করে তোলো। তা নইলে সে। যদি শুকিয়ে যায় তো জীবনের রস টানবে কোত্থেকে? তুমিও শুকিয়ে মরবে যে, তা যতই তুমি কেষ্টবিষ্ট হয়ে থাকো। সিধে মানুষ, বড় মানুষ বড় একটা দেখা যায় না আজকাল, সব পোকা লাগা। হাত-পাওলা মানুষও কেমন যেন নুলোন্যাংলা, ধনীও ভিখিরির সামিল হয়ে হা-পয়সা জো-পয়সা করে খাবি খাচ্ছে। আঝকাল লোকজনের চোখেমুখে সব সময়ই একটা মাতলা ভাব লক্ষ করেন ব্রজগোপাল, কেমন একটা মানসিক নেশার ঘোরে চলেছে। কলকাতার মতো বড় শহরে সে-ভাবটা আরও বেশি। মানুষ বড় তিতিবিরক্তি, রাগী, লোভী, বড় বেশি অস্থির। কীসে ভাল হবে বুঝতে পারে না। যত মানুষ তত সমস্যা। এইরকম গোলমেলে সমাজে ব্রজগোপাল সুস্থির হয়ে বসে থাকেন কী করে! ঘুরে ঘুরে পচনের ধারাটা দেখেন, লক্ষ করেন কতটা নিরাময়ের যোগ্য, আর কতটাই বা কেটে বাদ দিতে হবে। দেখে শঙ্কিত হন। অবসাদও আসে। ঠাকুরই আবার শক্তি যুগিয়ে দেন। এই বয়সেও ব্রজগোপাল ফের কষ্টসহিষ্ণু হচ্ছেন।
ননীবালা বলেন—অত সইবে না, এখন বসে বিশ্রাম নেওয়ার বয়স।
ব্রজগোপাল শান্তস্বরেই বলেন—ঠাকুর শরীর দিয়েছেন, বসিয়ে রাখার জন্য নয়, কাজ করার জন্য।
ভূতের বেগার। ধর্মকথা আজকাল কেই বা শুনছে?
ব্রজগোপাল ভেবে বলেন—ঠিক, তবু বলি, আজকাল ধর্মের বড় দাপট বেড়েছে। কত ম্যাজিকঅলা দু-পয়সা করছে দেখছ না! দেশে এখন দীক্ষার বান ডেকেছে। গুরু গুরু করে পাগল হচ্ছে লোক। নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে এরকম ক্ষেপে যায় মানুষ। ম্যাজিক না। দেখলে কিছু বিশ্বাস করে না। সবাই কৃপা চাইছে। বোঝে না যে কৃ অর্থে করা, তারপর পা অর্থাৎ পাওয়া। করে না পেলে কি ঠাকুরের কৃপা এমনি হয়! মানুষকে এটুকু বোঝানো দরকার যে সেই চির-রাখাল আজও বসে আছেন কদম্ববৃক্ষের তলায়, কত বাঁশি বাজাচ্ছেন, তবু তাঁর হারানো গোধন দূরের চারণক্ষেত্র থেকে ফিরে আসবার পথ পাচ্ছে না। তাঁর সেই হারানো গোধন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করি। আর কী করব?
দু’মাসের মধ্যেও চিঠিপত্র এল না কলকাতা থেকে। কেউ দেখা করতেও এল না। মনটা বড় উচাটন লাগে ননীবালার। দিনরাত প্যাঁচাল পাড়েন—কে কীরকম আছে কে জানে! খবরবার্তা নেই। খোঁজ না নিলি, নিজেরা কেমন আছিস তা তো দুখোট লিখে জানাতে পারিস?
ব্রজগোপাল শুনে মাথা নেড়ে বলেন—তোমার মন কেমন করছে। যাও বরং গিয়ে দু-চারদিন থেকে এস।
ননীবালা ঝামড়ে ওঠেন—কেন যাব? ওদের যদি টান না থাকে তো আমারই বা কি দায় ঠেকেছে? দুমাস হয়ে গেল! একটা পোস্টকার্ড পর্যন্ত লিখতে পারল না।
ব্রজগোপাল হেসে বলেন—এ হল অভিমানের কথা। ওরা তো দায়িত্বজ্ঞানহীন হবেই, জানা কথা। দায় তোমারই।
ননীবালা মাথা নেড়ে বলেন—না। দেখি, কতদিনে বুড়োবুড়ির কথা মনে পড়ে।
সারাদিনটাই প্রায় নয়নতারা এসে ননীবালার আশেপাশে ঘুরঘুর করে। বেড়ালের মতো। বিন্দু আসে রোজ, রান্নার কাঠ দিয়ে যায়, ক্ষেতের কলাটা মুলোটা রেখে যায়, কোটা চিড়ে, ভাজা মুড়ি পৌঁছে দেয়। আসে মতিরাম বামনবীর, কালীপদ ষষ্টীচরণ এসে খেলা করে দোরগোড়ায়। বামুনবাড়ির পেসাদের লোভে হামাগুড়ি দিয়ে গন্ধ বিশ্বেসও এসে বসে থাকে। রান্নাঘরের দরজায়। চোখে দেখে না, কিন্তু নাকে গন্ধ টেনে বলে—উরেব্বাস, কী গল্প। মাঠান, তোমাদের চচ্চড়িতে! কোকা, কপিল যেমন-তেমন হোক একবার দিনান্তে এসে খোঁজ নেবেই। বৃহস্পতিবার সন্ধেয় লক্ষ্মীর পাঁচালি শুনে বাতাসা, শশা আর ফলটলের প্রসাদ নিতে সবাই জুটে যায়। হরির লুটের বাতাসা কুড়োতে আসে। এসব ভুলে গিয়েছিলেন। ননীবালা কলকাতায়। এখানে এসে আবার সব করতে শুরু করেছেন। সকলের সঙ্গে। জড়িয়ে পড়েছেন খুব। ছেড়ে যেতে মন চায় না। এ বছর প্রথম দুর্গাপূজা করল বহেরু। পুজোর আগেই চলে এসেছিলেন ননীবালা। দুঃখ ছিল। বহেরু পুজোয় মেতে গিয়ে সে দুঃখ ভুললেন। বেশ লাগল গাঁয়ের পুজো, অনেককাল পর। একটু একটু করে কলকাতাকে ভুলছেন। কত বড় জায়গা এটা, আর কি শীতটাই পড়েছে এবার!
