তবু উঠে গিয়ে বাইরের ঘরে দেখে, রণেন সোফা কাম-বেডে বসে আছে চুপ করে। ভূতের মতো। তাকে দেকে ঠোটে আঙুল তুলে চুপ থাকতে ইঙ্গিত করল।
সোমেন আস্তে আস্তে গিয়ে দাদার পাশে বসে থাকে।
গান শেষ হয়। রেকর্ডে পিনের একটা ঘটানির শব্দ হতে থাকে।
রণেন মুখ ফিরিয়ে বলে—ভাল না?
—কী দাদা?
—গানটা?
—খুব ভাল।
রণেন মাথা নেড়ে বলে—খুব। আমাকে একটা সিগারেট দে। আমার প্যাকেটে আর। নেই।
খুব লজ্জা পায় সোমেন। দাদা তার কাছে সিগারেট চাইছে! কত বড় দাদা তার চেয়ে!
তবু সোমেন উঠে গিয়ে নিজের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট এনে দেয় রণেনকে।। সিগারেটটা নিয়ে বসে থাকে রণেন। অনেকক্ষণ বাদে বলে কাঁদবি না?
—কেন কাদব?
—মার জন্য? আয় দুই ভাই মিলে একটু কঁদি।
সোমেন হেসে বলে—পাগলামি কোরো না দাদা। কেঁদে লাভ কি? মা গিয়ে ভালই হয়েছে। নইলে বাবার বড় কষ্ট।
রণেন কয়েকবার ফুপিয়ে উঠল। তারপর অতি কষ্টে সংযত হয়ে বলে—মাকে তুই চিনবি কী করে? তোর বয়সে কতদিন মাকে দেখেছিস! আমি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে…
বলেই রণেন থমকায়, হঠাৎ বলে—কত বয়স হল আমার বলো তো! অ্যা!
বীণা অন্ধকারেই নিঃশব্দে উঠে আসে।
কোনও ভূমিকা না করেই এসে রণেনের হাত ধরে বলে—চলো তো।
রণেন সন্ত্রস্ত চোখে তাকায়, তারপর ওঠে। রেডিয়োগ্রামের খুব মৃদু আলোতেও ওর মুখ। দেখতে পায় সোমেন। অদ্ভুত একটা অব্যক্ত যন্ত্রণায় বিদ্ধ মুখ।
সোমেন দাদার মুখটা ভুলতে পারে না। তার সারারাত ভাল ঘুম হল না। আজেবাজে স্বপ্ন। দেখে উঠে বসল বার বার। ভোরের দিকে ঘুমলো খানিকক্ষণ। বেলা করে উঠল।
সকালে উঠেই তার মনে হল, দাদা এখনও তার আমেরিকায় যাওয়ার প্ল্যান জানে না। জানলে? আবার চেঁচামেচি করবে, কাঁদবে, বলবে—তুই যাস না। গেলে আমি বাঁচব না। দাদা কীরকম স্পর্শকাতর আর স্যাঁতসেঁতে মানুষ হয়ে গেছে।।
সকালবেলাতে আবার সে ভাবতে বসল। কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারল না। কী করবে?
তার এই বয়সে, এখন মাত্র দুটো জিনিস খুব ভাল লাগে। এক হল, রিখিয়ার কথা। আর একটা, আমেরিকার কথা।
একটা শ্বাস ফেলল সে। দুটোই পরস্পরকে শত্রুতা করছে। হঠাৎ কেন যেন খুব বাবার কথা মনে পড়ছিল। খুব ইচ্ছে করছে কাউকে সব উজাড় করে বলতে। সে শুনবে, ভাববে, সিদ্ধান্ত নিয়ে সোমেনকে বলে দেবে পথ। এরকম ঈশ্বরের মতো মানুষ একজনকেই সে চেনে। বাবা।
যাবে নাকি একবার বাবার কাছে?
যাবে। আজ না হয় কাল। মার জন্য মনটা খারাপ লাগে। মা চলে যাওয়ার পর একটা দিন চলে গেল। আরও দিন যাবে। তারপর আর খারাপ লাগবে না।
॥ পঁচাত্তর ॥
অনেকরকম ভয়ভীতি ছিল ব্রজগোপালের মনে। ঠাকুর যেমন চাইতেন তেমনি জীবনটাকে খুব সাদামাটা করে এনেছিলেন তিনি। খুব কম আয়োজন তাঁর জীবনে। যত অল্প উপকরণে দিন কাটানো যায় ততই মনটা ভাল থাকে, বিষয়লগ্ন হয় না বলেই ঊর্ধ্বমুখী হয়। এখন ননীবালা এলেন, ব্রজগোপালকে বুঝি আবার সংসারী করে ফেলেন।
টর্চ জ্বেলে অন্ধকারে পথ দেখিয়ে রাস্তা থেকে ঘর পর্যন্ত যখন ননীবালাকে নিয়ে আসছিলেন তখনই এরকমটা মনে হল। এখটু ভয়, একটু সংশয়। অবশ্য ভাল না লাগলে ননীবালা ফের চলে যাবেন এবং ব্রজগোপালও আবার যেমন তেমন হয়ে যাবেন। তবু মনটা উদ্বিগ্ন লাগছিল।
ঘরে একটা চৌকি ছিলই। সেটাতে বিছানা পাতা হল ননীবালার। নিঝুম রাত। ঘুম আসে নতুন জায়গায়। কয়েকদিন বার বার রাতে উঠে পান খেতেন, ব্রজগোপালকে সজাগ করে বাইরে যেতেন।
ব্রজগোপাল জিজ্ঞেস করেন—মন খারাপ করছে তো ওদের জন্য? বরং আবার কিছুদিন গিয়ে থেকে এস।
ননীবালা মাথা নেড়ে বলেন—না। এখানে এসে পৌঁছে সংবাদ দিলাম, সে চিঠিটারও উত্তর আসেনি। ওরা কি আমার কথা ভাবে নাকি? আমারও আর দরকার নেই যাওয়ার।
—ওরা না ভাবুক, তুমি তো মা, তোমার তো আর ছাড়ান কাটান নেই।
ননীবালা অন্য কথা পাড়েন—শোনো, খুব তো পরের জমিতে আর পরের ঘরে বাস করে কর্তাত্তি করছ, বহেরু চোখ বুজলে উৎখাত হবে। বরং বাস্তুজমিটায় একটা কুঁড়েঘর হলেও তোলো। এরকম থাকা আমার ভাল লাগে না। পাকিস্তান হয়ে অবধি পরের দরজায় পড়ে আছি।
ব্রজগোপাল গম্ভীর হয়ে বলেন—গুচ্ছের টাকা নষ্ট। আমরা চোখ বুঝলেই সব ফরসা। ছেলেরা কি এতদূর আসবে?
ননীবালা বলেন—আসল কথাটা কী বলো তো? এর আগেরবার এসে বহেরুর মেয়ের কাছে শুনেছিলাম ষষ্ঠীচরণকে নাকি সব উইল করে দিয়েছ!
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—দিয়েছি কিছু। দুকাঠা বাস্তু, সে ওই পুবধারে। ও জমিটা দিইনি, ও তোমার নামে কেনা। কুয়ো কাটিয়ে, বাঁধিয়ে, চারধারে বেড়া দিয়ে যত্নে রেখেছি।
—সে বেশ করেছ। এবার ঘর তোলো। বহেরুকে আজই বলব, বাঁশ টিন সব জোগাড় করবে।
বহেরু পরদিন এসে সব শুনল, রামভক্ত হনুমানের মতো। তারপর লাফ দিয়ে উঠে বলল—কর্তার এক পয়সা খরচ করতে হবে না। বাড়ি আমি তুলে দেব।
ব্রজগোপাল ধমক দিয়ে বলেন—তুই তুলবি কেন?
—ব্রাহ্মণকে গৃহদান মহাপুণ্য। ও আপনাকে ভাবতে হবে না। আমার কর্মফল কিছু কাটুক। অনেক খুনজখম করেছি কর্তা, এই দুই হাতে আপনার মতো সৎ-ব্রাহ্মণের জন্য কিছু করি। তারপর আপনি গুরুস্থানীয়ও বটে।
ব্রজগোপাল আরও ধমকালেন। বহেরু শোনে না। সে বলে—বাঁশ টিনের পলকা জিনিস বছর বছর পালটাতে হয়। গতবারে ইট কেটেছিলাম, তার হাজার দশেক পড়ে আছে। এখনও। সিমেন্ট না পাই চুন সুরকির গাঁথনি দিয়ে পাকা ঘর তুলে দেব।
