—হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে কথা বলছ না কেন?
—বলব কেন? আপনি আমেরিকায় কেন যাবেন?
সোমেন বিষন্ন মুখে বলে—কেন যাব না বলো তো? কেউ যেতে দিতে চাইছে না। মা, বাবা না, তোমরা নও। কেন?
—উই হ্যাড বিটার এক্সপিরিয়েন্স। কিন্তু সে কথা থাক।
রিখিয়া অ্যালবাম বন্ধ করে বলে—আমেরিকায় আমারও খুব যেতে ইচ্ছে করে। বিদেশ কার না ভাল লাগে বলুন? কিন্তু এখন আমি মত পাল্টে ফেলেছি। দাদার জন্যে।
—জানি। কিন্তু আমার তো তা নয়!
—না তোক গে। আপনি যাবেন না। আমার তা হলে ভীষণ খারাপ লাগবে।
এ খুবই গোলমেলে কথা। কিন্তু সোমেন কথাটা বুঝল। তবু দুষ্টুমি করে বলে-কেন খারাপ লাগবে রিখিয়া?
—আমার চেনা জানা লোকের সংখ্যা খুব কম। আমার ভাল লাগে এমন লোক হাতে। গোনা যায়। তার মধ্যেও যদি একজন চলে যায় তো খারাপ লাগবে না!
—তোমার ভাল লাগা লোক কে কে রিখিয়া? | রিখিয়া হাসছিল। এ কথা শুনে হেসে উপুড় হয়ে পড়ল। বলল—আপনাকে দেখে। বোঝাই যাচ্ছে যে আপনি কিছুতেই আমেরিকায় যাবেন না।
—সে কী।
—আপনি যেতে চাইছেন না।
—কী করে বুঝলে?
—আমি বুঝি।
—তুমি থট রিডার?
রিখিয়া ঠ্যাং নাচিয়ে বলে—নয় কেন?
সোমেন খুব নিস্পৃহভাবে যেন ভুল বুঝতে পেরে বলে—তাই তো! নয় কেন?
রিখিয়া বলে—বাবা অনেক মহাপুরুষের বই এনে মাকে শোনান। এর মধ্যে একটা বং থেকে বাবা পড়ছিলেন। একজন মহাপুরুষ বলেছেন—আমি যে তোমার অন্তর্যামী তাক। এমনিতে নয়। তুমি যতক্ষণ আমাকে ভালবাসো ততক্ষণই আমি তোমার অন্তর্যামী। তোমার ভালবাসাই আমাকে অন্তর্যামী করেছে নইলে আমি তোমার কেউ নই।
বলে রিখিয়া হাসল। সোমেন ওর বুদ্ধি দেখে অবাক। তারপর অনেক ভেবে বলল—শোনো রিখিয়া, আমি মাত্র বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমার এক চেনা ভদ্রলোক কতগুলো ফার্মের ঠিকানা দিয়েছেন, আমি অ্যাপ্লাই করেছি অ্যামেরিকায়। সেই ভদ্রলোক ওখানেই থাকেন, তিনি ফিরে গিয়েও চেষ্টা করবেন যাতে আমি একটা চাকরি পেয়ে যাই। ওখানে অনেক প্রসপেক্ট। এখানে আমার কিছু হবে না।।
—যান না, কে বারণ করছে।
—তুমিই তো করছ।
—আমার বারণে কার কি যায় আসে?
সোমেন অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। এই সব ভাবপ্রবণতাকে কি সে প্রশ্রয় দেবে? দিয়ে কী লাভ? সেই গাব্বুকে পড়িয়ে জীবন কেটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে রিগ্রেট লেটার পাবে। বয়স গড়িয়ে যাচ্ছে, সরকারি চাকরি আর পাবে না, প্রাইভেট ফার্মেও না। কি হবে থেকে! বড়জোর কয়েকজন মানুষ খুশি হবে।
—আমাকে যেতে হবে রিখিয়া।
রিখিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে—তা হলে আমি খুব কাঁদব।
অনেকটা রাত করে সোমেন বাড়ি ফিরল।
সবাই শুয়ে পড়েছে, বউদি এসে দরজা খুলে দিল। বলল—তোমার খাবার ঢাকা আছে। সোমেন।
—হুঁ।
—তোমার দাদাকে সামলাতে পারছি না। কি কান্না! এ অবস্থায় ওঁকে ফেলে মার চলে যাওয়াটা বোধ হয় ভাল হল না সোমেন।
সোমেন অন্যমনস্কভাবে বলে—দাদা অত কাদছে কেন? আমারও তো মন খারাপ, কাদছি না তো।
—তোমার সঙ্গে ওঁর তুলনা করছ কেন? ও তো নরমাল নয়। সব সময়ে একটা শিশুর মতো হাবভাব, শিশুর মতোই খুঁতখুঁতে। এখন ওঁর মা বা বাবাকে দরকার। নইলে খুব হেলপলেস ফিল করে।।
সোমেন বুঝে মাথা নাড়ল। বউদি চলে গেলে সে একা একা খেয়ে নিয়ে ঘরে এসে সিগারেট নিয়ে বসে। মার বিছানাটা ফাকা। তার খুব খারাপ লাগছেনা। এ ঘরটা আজ থেকে। তার একেবারে একার ঘর হয়ে গেল। কেউ ডিস্টার্ব করবে না।
আজ অনেকক্ষণ জেগে থাকতে ইচ্ছে হল সোমেনের। অন্য দিন এ সময়ে ঘুম পায়। মা পানের বাটা নিয়ে কথার ঝুড়ি খুলে বসে। সে সব কথা শুনতে ইচ্ছে করে না সোমেনের। আজ কেউ বলার নেই, তাই বুঝি ঘুম আসে না।
অনেকগুলো সিগারেট খেল সোমেন। আমেরিকায় যাবে কি যাবে না তা নিয়ে অনেকবার লটারি করল। ছোট্ট ছোট্ট কাগজে কয়েকবার যাব’ আর ‘যাব না’ লিখে কাগজগুলো ভাঁজ করে দু’ হাতের তেলো জড়ো করে ভাল করে মিশিয়ে দিয়ে টেবিলের ওপর ফেলল ছড়িয়ে। চোখ বুজে একটা তুলে নিয়ে খুলে দেখল, লেখা আছে—যাব না। দ্বিতীয়বার উঠল—যাব। বারবার তিনবার। তিনবারের বার কাগজ তুলতে যাচ্ছে এমন সময়। তাকে ভীষণ চমকে দিয়ে কে যেন কাছ থেকে ডাকল—সসামেন।
সোমেন ঘুরে বসে দেখে, দাদা।
—দাদা!
—মা চলে গেল? বলে উভ্রান্ত রণেন ঘরের চারদিকে তাকায়।
সোমেন উঠে বলে—রাত একটা বাজে দাদা, ঘুমোবে না?
—তুই কী করছিস?
—ও কিছু নয়। ঘুম আসছিল না।
—আমারও আসছে না। মা যাওয়ার সময় কেঁদেছিল?
—হ্যাঁ।
রণেন মায়ের চৌকিতে বসে বলে—আমার হার্ট খুব খারাপ। ডাক্তার বলেছে। আমি মা। বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারব না। তা হলে হার্ট আরও খারাপ হবে। আমাকে মার কাছে কাল পৌঁছে দিয়ে আসবি।
—বাঃ, তা হলে চাকরি করবে না?
—চাকরি করব কী করে? শরীর যদি ভাল না থাকে!
—বউদি আছে, দেখবে। ডাক্তার ওষুধ দেবে। চিন্তা কী?
—না। রণেন খুব জোরে মাথা নাড়ে। বলে—আমি যাবই।
—আচ্ছা, এখন গিয়ে শুয়ে থাকো।
রণেন চলে গেল। কিন্তু একটু বাদেই সোমেন শুনল, বাইরের ঘরে রেডিয়োয়াগ্রামে খুব মৃদুস্বরে বাজছে রবি ঠাকুরের নিজের গলায় গাওয়া সেই অবিস্মরণীয় গান—অন্ধজনে। দেহো আলো, মৃতজনে দেহে প্রাণ…
চোখ ভরে জল আসে সোমেনের। কি করবে সে? কিছু করার নেই।
