বলে উনি ও ঘরে চলে গেলেন।
মুহূর্ত পরেই রিখিয়া দৌড়ে আসে, পরদা সরিয়েই উভ্রান্ত একটা আনন্দে শ্বাসরুদ্ধ অস্ফুট স্বরে বলে—তুমি!
তুমি শুনে একটু হাসে সোমেন। এবং তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে, এই বালিকাটিকে সে…সে বোধ হয়…হ্যাঁ…ভীষণ
ভাবতেই সোমেন—যে সোমেন মেয়েদের সঙ্গে বহুকাল ধরে অন্তরঙ্গভাবে মিশেছে, কারও কারও শরীরও ছুঁয়ে রেখেছে—সেই সোমেনের কান মুখ ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে লজ্জায়। বুকে ডুগডুগি বাজে।
সোমেন বলে—কেমন আছো?
—এতদিনে মনে পড়ল? কথা বলব না তো, কিছুতেই না।
—আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম।
—কী নিয়ে শুনি!
সোমেন কী উত্তর দেবে! সে কিছু নিয়েই ব্যস্ত ছিল না, আবার ছিলও।
—প্রায় একমাস। রিখিয়া বলে।
—তুমিও তো খোঁজ নাওনি। সোমেন বলে।
রিখিয়া মুখ ভার করে বলে—আমাকে কোথাও বেরোতে দেয় বুঝি! আজকাল খুব কড়া ডিসিপ্লিনে রেখেছে মা। কোথাও ছাড়ে না। দাদা ওরকম করেছে বলেই এখন আমার ওপর সকলের নজর। বলে মৃদু আদুরে হাসি হাসে। আবার গম্ভীর হয়। বলে—অবশ্য রাস্তাঘাটও ভাল চিনি না। তা হলেও ঠিক একদিন চলে যেতাম ঢাকুরিয়ায়। রোজ ভাবি, আজ আসবে। ওমা, কেউ আসে না।
—তুমি কোনওদিন যাওনি বলেই আসিনি। সোমেন মিথ্যে করে বলে। পরমুহূর্তেই যোগ করে দেয়—তুমি না গেলেও মধুমিতা কিন্তু যেত।
একটু যেন শিউরে ওঠে রিখিয়া। বড় চোখে চেয়ে বলে—কে গিয়েছিল? মধুমিতা?
সোমেন মাথা নাড়ল। মধুমিতার কোনও খবর সে এখনও জানে না। বুকের মধ্যে মেঘের মতো ভয় জমে ওঠে স্তরে স্তরে। আস্তে করে বলল—সে কথা থাক।
রিখিয়া বোধ হয় বুঝল। সেও বলল—থাক গে। কিন্তু আপনার বাসায় যেতে আমার খুব লজ্জা ছিল। মধু তো আমার মতো নয়। ওর কোনও লজ্জা নেই। এমনকী ও স্কুলের দেয়াল টপকে ক্লাস থেকে পালাত ছেলেদের সঙ্গে মিশবে বলে। পুলিশ দেখলে ঢিল ছুঁড়ত।
—তাই নাকি!
রিখিয়া মুখ গম্ভীর করে বলে—আমি অত স্মার্ট নই। আপনি তো জানেন।
—আবার আপনি করে বলছ কেন?
রিখিয়া অবাক হয়ে বলে—আপনি করেই তো বলি!
—একটু আগেই ‘তুমি’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিলে যে!
—যাঃ! ভুল হয়েছিল তবে।
—ভুল!
—ভুলই। আসুন, মা বসে আছে আপনার জন্য।
সোমেন ঘরে ঢুকে দেখে, শৈলীমাসি খুব রোগা আর শুকনো হয়ে গেছেন। তাঁর শরীরে যেটুকু জীবনীশক্তি অবশিষ্ট আছে, সেটুকু সব জমা হয়েছে চোখে। বোঝা গেল একটু আগেও কাঁদছিলেন। এইমাত্র চোখ মুছে হাসিমুখে বসেছেন। চোখ সজল।
ভারি গলায় বললেন বাবা, তুমি কেন আমেরিকায় যাবে? উনি এসে এইমাত্র বললেন, তুমিও চলে যাচ্ছো।।
সোমেন হেসে বলে—এখনও ঠিক নেই, তবে চেষ্টা করছি।
—না, না। কেন যাবে? ননী তোমাকে যেতে দিচ্ছে কেন? ও কি রাজি হয়েছে।
—না।
—ওকে শীগগীর একদিন আসতে বোলো। আমি ওকে বলে দেবো, যেন কিছুতেই তোমাকে যেতে না দেয়।
—কেন মাসি? ছেলেরা কী চিরকাল ঘরে থাকে?
শৈলীমাসি হঠাৎ চুপ করে কী যেন ভেবে বলেন—সে কথাও ঠিক। ছেলেদের আটকে রেখে আমরা তাদের ক্ষতিই তো করি। কিন্তু, তোমরা সব দূরে গিয়ে পর হয়ে যাও যে! আমার ছেলেটা বলে শৈলীমাসি বিছানা হাতড়ে একটা এয়ারোগ্রাম খুঁজে পেয়ে সোমেনের দিকে বাড়িয়ে বললেন—দেখো।
সোমেন চিঠিটা নিল না, বলল—থাক মাসি।
চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে থেকে শৈলীমাসি অনেকক্ষণ বাদে বললেন—উনি যাচ্ছেন লন্ডনে। কিন্তু তাতে কিছু হবে না। আমি নিজে যদি যেতে পারতাম! বলে সোমেনের দিকে চেয়ে বলেন—কি করে যাব বলো তো! কত দূর! আমি এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যেতে পারি না। পৃথিবীটা যে আমার কাছে কি বিরাট জায়গা হয়ে গেছে তা তোমরা বুঝবে না। কেবল। মনে হয় চারদিকটা আমার কাছ থেকে কত কত ভীষণ দূরের হয়ে গেছে!
রিখিয়ার বাবা কোনের দিকে অন্ধকারে একটা ইজিচেয়ারে বসেছিলেন, পায়ের কাছে কুকুর, হাতে গেলাস। আস্তে, সেই এড়ানো গলায় বলেন—অত অ্যাটাচমেন্ট বলেই তো ছেলে তোমাকে পছন্দ করে না। ছেলেরা একটু বয়স হলে আর মা-বাপের অতিরিক্ত স্নেহকে ভাল চোখে দেখে না। তখন তারা অনেকের ভালবাসা আর মনোেযোগ চায়। কিন্তু এসব সাইকোলজি তুমি তো মানেন না।
—মানি। শৈলীমাসি বলেন—ওকে ফিরিয়ে আননা, দেখো আমি আর অত ছেলেছেলে করব না। করার আর সময়ও নেই। বেশিদিন কি বাঁচব বলে ভেবেছ নাকি তোমরা? |
—মা, চুপ! রিখিয়া ধমক দেয়।
আজও সেই অদ্ভুত অনুভূতিটা হচ্ছিল সোমেনের। শৈলীমাসির অস্তিত্ব থেকে যেন মৃত্যুর জীবাণু উড়ে আসছে ঝাঁক বেঁধে। শ্বাসে শ্বাসে ঢুকে যাচ্ছে বুকের ভিতরে।
শৈলীমাসি বলেন—যাও সোমেন, রিখিয়া, ওকে নিয়ে যা। রুগির ঘরে অত বসে থাকতে নেই।
সোমেন হাঁফ ছেড়ে উঠে এল।
রিখিয়ার ঘরে এসে উজ্জ্বল আলোয় রিখিয়ার দিকে তাকাতে সংকোচ হচ্ছিল সোমেনের।।
রিখিয়া কথা বলছিল না। হুট করে এক ফাকে বেরিয়ে গিয়ে বোধ হয় চাকরকে চা খাবারের কথা বলে এল। এসে গোমড়ামুখে বসে থাকল সামনে। অ্যালবামের পাতা। ওলটাচ্ছে। উপেক্ষা নয়, অভিমানের ভঙ্গি।
সোমেন বলে—রিখিয়া, মধুমিতা তোমাকে চিঠি লেখেনি?
—লিখেছিল। কেন?
—এমনিই।
—ওর কথা ভুলতে পারছেন না?
সোমেন মাথা নেড়ে বলে—ভুলব কেন? ও একটু অদ্ভুত মেয়ে ছিল।
—ওর কোনও খবর পাননি?
—না।
—আমিও না। ও আসে না। বোধ হয়—
বলে খুব বিষন্ন চোখে চেয়ে রিখিয়া চোখ নামিয়ে নিল। বলল—জানাই ছিল।
