অচেনা এক জিতুর জন্য প্রাণটা হঠাৎ হু হু করতে থাকে তার। অবশ্য সেই হুহু করা বুকে মায়ের জন্যও খানিকটা অভাব বোধ আছে, বাবার জন্যও আছে একরকম ব্যথা। আর আছে তার সারা জীবনের নানা ব্যর্থতা ও অসফলতার স্মৃতিও। কোনও ক্ষরণে মনে একটু দুঃখ এলেই হাজারে’ দুঃখের স্মৃতি ভিড় করে আসে।
মধুমিতার চিঠিটার কোনও জবাব দেয়নি সোমেন। ও কেমন আছে?
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে রিখিয়ার ঘরের দিকে যাচ্ছিল সোমেন। খেয়াল হল, বাডিটা বড় নিস্তব্ধ। এত চুপ কেন সব? মিটমিট করে ভূতুড়ে সব কম পাওয়ারের আলো জ্বলছে বড় বাতিগুলো সব নেবানো। শৈলীমাসির কিছু হয়নি তো? একটু অসঙ্গতি দেখলেই আজকাল কেবল অজানা ভয়ে বুক চলকে রক্ত ঝরে যায়।
রিখিয়া তার ঘরে নেই, পড়ার ঘরেও নয়। একা-একা এঘর থেকে ওঘর খুঁজে দেখল সোমেন। চারধারে দামি জিনিস ছড়ানো। ক্যামেরা, ঘড়ি, কলম, ট্রানজিস্টার সেট, স্টিলের জগ। সে যদি এর কিছু তুলে নিয়ে চলে যায় তো কেউ ধরতে পারবে না। বড় অসাবধানী এরা।
সোমেন করিডোরে এসে ডাকল—রিখিয়া।
গলাটা কেঁপে গেল। সোমেন একটু চুপ থেকে আবার ডাকল।
অপ্রত্যাশিতভাবে শৈলীমাসির ঘরের দিক থেকে রিখিয়ার বাবা বেরিয়ে এলেন। খুবই উদভ্রান্ত ও অন্যমনস্ক মুখ চোখ। দরজা খুলে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলেন সোমেনের দিকে। খুবই গম্ভীর তাঁর মুখ।
সোমেন চমকে গিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। দুজন দুজনের দিকে খামোখা চেয়ে আছে। কেউ কথা বলতে পারছে না। কথা নেই বলে। এমনি সময়ে হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দ করে সেই অন্ধ কুকুরটা এসে সোমেনের পায়ে কুঁই কুঁই করে চেটে চেটে লেজ নেড়ে অসম্ভব আদর জানাতে থাকে। কুকুরেরা ভোলে না।
রিখিয়ার বাবা আজও নেশা করেছেন। কুকুরটাকে ধমক দিয়ে বললেন—স্টপ!
সেই স্বর শুনেই বোঝা গেল, গলাটা অন্যরকম।
সোমেনের দিকে চেয়ে বললেন—কুকুরটা তোমাকে চেনে দেখছি! তুমি কি এ বাড়িতে প্রায়ই আসো?
—মাঝে মাঝে। শৈলীমাসি আমাকে চেনেন।
উনি হাত তুলে বললেন—বুঝেছি। আর পরিচয় দিতে হবে না। তুমি বোধ হয় ওঁর সইয়ের ছেলে! না?
খুব বিস্মিত হয়ে সোমেন বলে—হ্যাঁ।
সে ভাবতেই পারে না যে, এ লোকটার অত মনে থাকে। কিন্তু তার চিন্তাকে আর একবার চমকে দিয়ে লোকটা বলে—একদিন সন্ধেবেলা তোমাকে দেখেছিলাম এখানে, সোমেন লাহিড়ি না তোমার নাম?
সোমেন এত অবাক হয় যে, বাতাস গিলে বলে—হ্যাঁ। আপনার আমাকে মনে আছে?
উনি তেমনি একটা উদাসীন ভ্যাবলা চোখে চেয়ে থেকে বললেন—আমার সবই মনে থাকে। এসো। এ ঘরে শৈলী আছে, রাখু আছে। আমরা সবাই বসে একটু গ্যাদারিং করছি। কাম অ্যান্ড জয়েন দি ক্রাউড।
সোমেন দ্বিধাভরে বলল—আমি বরং চলে যাই।
উনি বললেন—যাবে কেন? ইউ আর এ ভেরি হ্যান্ডসাম ইয়ং ম্যান। তবে একটু লিন অ্যান্ড থিন। তবু তোমাকে দেখলেই বেশ একটা ফ্রেশনেস আসে। চলে এস।
বলে উনি দরজার পাল্লাটা মেলে ধরলেন। কুকুরটা আগে গেল। পিছনে সোমেন!
প্যাসেজ দিয়ে ঢুকলে শৈলীমাসির ঘরের আগে আর একটা ঘর পড়ে। সেটা বসবার ঘর বলে মনে হয়। এখন সেখানে ধুলো পড়ছে। কেউ ব্যবহার করে না। এদের কত ঘর অব্যবহৃত পড়ে থাকে।
সেই ঘরে এসে রিখিয়ার বাবা একটু দাঁড়ালেন। পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরনে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দামি গ্যাসলাইটার বের করে সিগারেট ধরিয়ে বললেন— তুমি কার কাছে আসো বলো তো? রাখুর কাছে, না শৈলীর কাছে?
সোমেন লজ্জা পেয়ে বলে—কারও কাছে পার্টিকুলারলি নয়। আসি।
—ও। তোমার বয়সি আমার একটা ছেলে আছে, জানো?
—জানি।
—সেটা একটা হতচ্ছাড়া ছেলে। হি রাইটস টু আস অল দি ক্রুয়েল থিংস। সে নাকি আর কখনও আসবে না। আমরা তার প্রতি কোনও অন্যায় ব্যবহার করিনি, স্বাধীনতা দিয়েছি, তার পিছনে টাকাও কম খরচ করিনি। তবু হি হ্যাজ বিকাম আনবিকামিং…
সোমেন ইংরেজি কথাটা ভাল করে বুঝল না। ইংরেজিটা এখনও তার খুব রপ্ত হয়নি। আমেরিকায় যাওয়ার আগে রামকৃষ্ণ মিশনে স্পোকেন ইংলিশের ক্লাসে ভরতি হয়ে শিখে নেবে, এরকম ইচ্ছে আছে।
উনি বললেন—আজও তার চিঠি এসেছে। শৈলী খুব কাঁদছে। তুমি এ ঘরে একটু অপেক্ষা করো, আমি শৈলীকে একটু খবর দিই, তুমি এসেছ শুনলে ও নিশ্চয়ই শান্ত হবে।
—আমি বরং—
বলে সোমেন উৎসুক হয়ে চলে যাওয়ার কথা বলতে যাচ্ছিল। উনি মাথা নেড়ে বললেন—না, যাবে কেন? উই উইল লাইক ইওর কম্পানি। এ সময়ে আমার ছেলের বয়সি কেউ সামনে থাকলে ভাল লাগবে। তুমি কী করো?
—কিছু করছি না।
—বেকার?
—হ্যাঁ।
—সবাই বেকার আজকাল। আমার অফিসে আর কারখানায় কত ছেলেছোকরা রোজ এসে কাজ খুঁজে যায়। অত কাজ কে কাকে দেবে?
সোমেন মৃদু একটু ম্লান হাসল।
—কি করবে ঠিক করোনি
সোমেন একটু ইতস্তত করে বলে—আমি বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছি।
উনি ভ্রু কুঁচকে বলেন—কোথায়? অ্যাব্রড?
—হ্যাঁ। আমেরিকায়।
—ওঃ। বলে উনি স্তব্ধ থেকে দেয়ালের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর গভীর একটা শ্বাস ছেড়ে বললেন—আমি কয়েকবার গেছি। বেশ ভাল দেশ। যাও।
সোমেন মাথা নত করে।
উনি বললেন—এই বুড়ো বয়সে আবার হয়তো যেতে হবে।
—কোথায়?
—লন্ডন। ছেলের খোঁজ খবর করতে। কেন যে আর আমাদের পছন্দ করে না তা জেনে আসতে। আমি নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছি না, শৈলীর জন্য যেতে হচ্ছে। দাঁড়াও ওদের খবর দিই—
