খেতে খেতে অনেক দেরি হয়ে গেল। গল্প আর কথা আজ যেন আর শেষ হতে চায় না। বীণা নিজে ননীবালার বিছানা সাজিয়ে দিল, রণেন বাঁধল। গোছগাছেরও শেষ নেই।
কান্নাও চলছে। ফাকে ফাকে হাসিঠাট্টার কথাও। ননীবালা বললেন একবার—ও বউমা, সব জিনিস যে দিয়ে দিচ্ছো বড়! তোমরাই তো পর করে দিলে দেখি!
এইরকম ভাবে সারাক্ষণ বাড়ি সরগরম রইল। বিস্তর পোঁটলাপুঁটলি বাক্স বিছানা সদরে জড়ো করে রেখে সোমেন ট্যাক্সি ডেকে আনল। কান্নাকাটিটা আর বেশি দীর্ঘায়িত করতে দিল না সে। মাকে প্রায় কোলে করে টেনে নিয়ে ট্যাক্সিতে বসাল। ননীবালা কাঁদতে কাঁদতে রণেনকে বলেন—বাড়িটা শেষ করিস। পরের বাড়িতে আর কতকাল পরবাসী থাকবি? আমরা যেন দেখে যেতে পারি।
রণেন কাঁদছিল ছেলেমানুষের মতো হাউহাউ করে। কান্না দেখেই বোঝা যায়, তার ভিতরটা এখনও সুস্থির নয়। বীণা কঁদছে, বাচ্চারাও। পাড়া-প্রতিবেশী বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছিল। কয়েকজন বয়স্কা মহিলা চোখের জল ফেলে গেলেন।
গাড়ি গড়িয়াহাটা ছাড়িয়ে এলে আর কাঁদছিলেন না ননীবালা। পানের বাটা খুলে একটা পান খেলেন। সোমেন ড্রাইভারের পাশে সামনে বসেছিল। পিছন ফিরে একবার মাকে দেখে নিয়ে বলল—উঃ বাবা, তোমরা কাঁদতেও পারো। আমার মাথা ব্যথা করছে।
ননীবালা তাঁর বড় বড় চোখে ছেলেকে স্থিরভাবে একটু দেখে বললেন—শোনো ছোটকা, তুমি মাথা থেকে আমেরিকা তাড়াও।
খুব আদরের সময়ে কখনও-কখনও সোমেনকে ছোটকা বলে ডাকেন ননীবালা।
সোমেন বলে—কেন?
—না। অতদূরে তোমাকে ছাড়তে পারব না। তা ছাড়া, রণেনের কী অবস্থা তা তো দেখছই! এ অবস্থায় ওকে ছেড়ে তোমার কোথাও যাওয়া চলবে না। সুস্থির মাথায় সবটা বিবেচনা করো।
—বাঃ, আমার ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই?
ব্রজগোপাল গলা খাকারি দিয়ে বললেন—বাবা, ওটা ঠিক কথা নয়। আমেরিকা তৈরি দেশ, তারা টাকা দিয়ে বিদেশি চাকর রাখবে। আর তোমার দেশ তোমারই, গরিব মায়ের হাল দেখে কুপুত্রই পালায়। পালানোর জন্য যেয়ো না। যদি বোঝো গিয়ে জ্ঞানী মানী হবে তো যেয়ো। সব কাজের পিছনে নিজের উদ্দেশটা যাচাই করা ভাল। উদ্দেশ সৎ ও সাধু হলে মঙ্গলার্থে সব কাজই করা যায়। অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মন্ত্রোচ্চারণও পাপ। আর সৎ উদ্দেশে নারীহরণও পুণ্য।
সোমেন উত্তর দিল না। মনটা খারাপ লাগছে।
হাওড়ায় বড় ঘড়ির নীচে বহেরু দাড়িয়েছিল বশংবদ। ব্যাপার দেখে হইচই করে উঠল— মা ঠাকরুন যাবেন! অ্যাঁ! চন্দ্রসূর্য ওঠে তা হলে! কী ভাগ্য আমাদের! ও ঠাকুর, কালই রাজমিস্ত্রী লাগাব ঘর পাকা করতে। ব্রাহ্মণকে গৃহদান করব। মহাপুণ্য!
টানা-হ্যাঁচড়া করে সেই মালপত্র তুলল গাড়িতে।
সন্ধের মুখে মুখে গাড়িটা ছাড়ল। মা বাবাকে প্রণাম করে প্রায় চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে এল সোমেন।
তারপরই খুব ফাঁকা লাগতে লাগল। বহুক্ষণ সিগারেট খাইনি। সিগারেট ধরাতেই মাথাটা চন-ন করে পাক খেল একটা। হু-হু করে উঠল বুক। ফাঁকা লাগছে।
অনেকদিন বাদে তার মনে হল, আজ বাসায় ফিরে খারাপ লাগবে। রোজই লাগে। তবু আজ যেন আগে থেকেই লাগছে।
ষোলো নম্বর বাস ধরে সোমেন আজ ইচ্ছে করেই রিচি রোডে নেমে গাব্বুকে পড়াতে না গিয়ে রিখিয়াদের বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। অনেককাল দেখা হয় না।
॥ চুয়াত্তর ॥
অন্যমনস্ক সোমেন আজও গেট পেরিয়ে ঢুকে যাচ্ছিল রিখিয়াদের বাড়িতে। হঠাৎ একটা মোটরের হেডলাইট পড়ল এসে সেই লেখাটার ওপর—প্রতিশোধ, প্রতিরোধ, প্রতিবাদ। কমরেড, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো, গড়ে তোলো ব্যারিকেড। লেখাটা নজরে পড়তেই চমকে উঠল সোমেন। এই লেখাটার কথাই চিঠিতে তাকে জানিয়েছিল মধুমিতা। দেওয়ালে এ কটা কথা লিখেছিল জিতু নামে একটা ছেলে, যে প্রথম মানুষ খুন করার শক সামলাতে পারেনি। খুন করে নিহত মানুষের হাত কেটে নিয়ে যে শ্রেণীশত্রুর রক্ত মাংস খেয়েছিল, তারপর উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আজও। সেই জিতুকে ভালবাসত মধুমিতা।
জিতুকে চেনেও না সোমেন। তবু আজ মধুমিতার চেয়েও বেশি হঠাৎ করে জিতুর কথা মনে হয়। কেমন ছিল ছেলেটা! সোমেনের মতোই কি? হয়তো এরকমই বয়স, একমাথা বোঝাই নানা অবাস্তব স্বপ্ন আর চিন্তা নিয়ে ঘুরে বেড়াত। রোমান্টিক বিপ্লবী। হঠাৎ কেউ ভুল করে তাকে শ্রেণীশত্রুর রক্তপাত করতে প্ররোচিত করে। সেটা খুবই ভুল হয়েছিল। পৃথিবীতে যারা জন্মায় তাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যাদের খুনির ইনস্টিংট থাকে, আর কারও তা থাকে না। সেই জিতুকে একবার দেখতে খুব ইচ্ছে হয় সোমেনের। ছেলেটা কি আজও বেঁচে আছে? থাকলেও নেই। ওরকম উন্মত্ত অস্তিত্বের কোনও মানে হয় না। সোমেন শুধু অনুভব করে, দেশময় লক্ষ লক্ষ অল্পবয়সী ছেলে কিছু একটা করতে চাইছে, এমন কিছু—যার জন্য সর্বস্ব পণ করা যায়, প্রাণ দেওয়া যায়, নেওয়া যায়। শুধু সেই মহৎ কারণটি তাদের হাতে দাও, তারা লড়ে যাবে। কিন্তু তা তো হল না। কেউই আদর্শ বলে কোনও জিনিস দিতে পারল না যুবাদের। তারা তাই আদর্শের পিপাসা মেটাতে ভিনদেশ থেকে রাজনৈতিক মত ধার করে আনল, আর তার জন্যই কত কাণ্ড করল তারা। বেকারকে চাকরি দেওয়ার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল তাদের একটা সুন্দর আইডিয়াল দেওয়া, বাস্তববাচিত চিন্তা ও ব্যাপকতার ধারণায় সমৃদ্ধ একটি কার্যকরী আদর্শ। কে বুঝবে সে কথা? সস্তা কথা শুনে শুনে সকলের কান পচে গেল।
