স্নান করতে করতেই টের পেল, দাদা বউদি আর বাচ্চারা ফিরেছে। খুব হইচই হচ্ছে।
স্নানের ঘর থেকে বেরোতেই বউদি তাকে নিজের শোওয়ার ঘরে ডেকে নিয়ে গেল। নিচু গলায় বলল—কী ব্যাপার বলো তো! মা নাকি আজই চলে যাচ্ছেন!
—তাই তো শুনছি।
—রাগটাগ করেননি তো!
—আরে না। মা তো অনেকদিন থেকেই যাব যাব করছে।
বীণা মুখখানা শুকনো করে বলে—সে তো অনেক কথা বলেন রাগের মাথায়। সব কি ধরতে আছে?
সোমেন আস্তে বলল—যেতে দাও। তাতে ভালই হবে।
বীণা মাথা নাড়ল। একটু ধরা গলায় বলল—না সোমেন, এটা ভাল হল না। লোকে মনে করবে, বউ শাশুড়িকে তাড়িয়েছে।
—দূর। লোকের ভাবতে বয়ে গেছে। এটা কলকাতা, বনগাঁ নয়।
বীণা তেমনি বিষন্ন গলায় বলে—সেটা না হয় মানলাম, কিন্তু আমরাই বা কী করে থাকব? কদিন উনি ছিলেন না, তাইতেই বাচ্চারা ঠাম্মা ঠাম্মা করে অনাথ শিশুর মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। এখন কী হবে?
সোমেন নিঃশ্বাস ফেলে বলে—ও সব সেন্টিমেন্ট ছাড়ো তো। বাচ্চাদের সব সয়ে যায়। তা বলে মাকে আটকে রেখো না। বাবার কথা ভেবে ছেড়ে দাও। একা বাবার বড় কষ্ট।
বীণা উদাস গলায় বলে—কষ্ট হলেও ওঁর সয়ে গেছে। আমাদেরই কষ্ট হবে বেশি।
কথাটা শুনে একটু অবাক মানে সোমেন। বউদির সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক তো কোনওকালে! তেমন ভাল ছিল না! মুখ ফসকে সে বলে ফেলল—কষ্ট হবে মানে? মা গেলেই তো তোমার সুবিধে, ক্যাটক্যাট করার লোক থাকবে না।
জলভরা চোখে, কান্না আর ভর্ৎসনা মেশানো চোখে তারদিকে তীব্রভাবে মুখ ফেরাল বীণা। চোখের জল গড়িয়ে নামল, সেটা মুছবার চেষ্টাও না করে বলল—তাই মনে হয় না? আমি পরের মেয়ে, তোমাদের মনে তো হবেই। আমার কথা না হয় বাদ দাও, তোমার দাদাকে গিয়ে দেখে এস, তোমাদের ঘরে মার কোলে মুখ গুঁজে কেমন কঁদছে। পাষাণ গলে যায়। যাও, দেখে এস।
সোমেন উঠে এল।
সত্যিই দৃশ্যটা সহ্য করা যায় না। চৌকির ওপর মা বসা, তাঁর কোলে মাথা গুঁজে রণেন লম্বা হয়ে পড়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। মা তার চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে বসে আছে পাথর হয়ে। দুচোখে জলের ধারা। ছেলেমেয়েরা ঠাকুমা আর বাবার দৃশ্যটার সামনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে।
রণেন কাঁদতে কাঁদতে বলে—আমিই তোমাকে তাড়ালাম মা। আমার সংসারে তুমি থাকতে পারলে না মা। কি করেছি বলো, আমাকে কেন ছেড়ে যাচ্ছো?
ননীবালা আকুল হয়ে বলেন—ওরে, ওসব কী বলছিস? বলিস না, বলিস না। আমি সে-যাওয়া যাচ্ছি নাকি? বুড়ো মানুষটা গতরপাত করে খায়, তার দিকটা একটু দেখে আসি।
সোমেন কিছু বিরক্ত হয়ে বলে—এ তোমরা কী শুরু করলে বলো তো? যাবে তো একটুখানি দূরে। এবেলা-ওবেলা ঘুরে আসা যায়।
রণেন মাথা তুলল না। পড়ে রইল।
ননীবালা তার চুলের মধ্যে বিলি কেটে দিতে থাকেন।
ব্রজগোপাল খুব গম্ভীর আর অন্যমনস্ক হয়ে বসেছিলেন। বোধ হয় ভাবছিলেন যে, তিনি যখন চলে যান তখন কেউ এভাবে তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করেনি।
সোমেন বাবার দিকে চেয়ে বলে—বাবা, আপনি একটু দেখুন। এত কান্নাকাটি ভাল লাগে না।
ব্রজগোপাল ছেলের দিকে তাকালেন। মাথা নেড়ে বললেন—ও খারাপ নয়। কান্না জিনিসটা ভাল। তুমি বরং খেয়ে নাও গে। যদি তোমার অসুবিধে না হয়, বরং হাওড়ায় তুলে দিয়ে এস। তোমার মা যাবেনই, তাঁকে আটকানো যাচ্ছে না।
রণেন মুখ তুলে বলে—বাবা, আমাকেও নিয়ে যান সঙ্গে। আমি মাকে আর আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না।
ব্রজগোপাল একবার কী বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। তারপর আবার সময় নিয়ে বললেন—তুমি বড় ভাল মানুষ বাপকুমোনা, তাই অত কষ্ট পাচ্ছো। মনটাকে শক্ত করো। মনকে বেশি প্রশ্রয় দিতে নেই। পুরুষ মানুষ, ওঠো।
রণেন কোলে মাথা রেখেই বলে—আমার কেমন যেন মনে হয় বাবা যে, আমি খুব ছোট্ট হয়ে গেছি। আদুরে ছেলে। বড় মা-মা আর বাবা বাবা করে প্রাণটা।
শুনে বুবাই হেসে ফেলল। টুকাই-ও। শুধু মেয়েটা ঠাকুমার দেখাদেখি কাঁদছিল। মেয়েরা কান্নার অভ্যাস নিয়েই জন্মায়। আর বীণা কখন অলক্ষ্যেতে নিঃশব্দে এসে দরজা ধরে দাঁড়িয়েছিল, দুচোখে অঝোর জল, ফেঁপাচ্ছে। একটা হাত বাড়ালেন ননীবালা, বীণা নিঃশব্দে এসে বুক ঘেঁষে বসল।
ননীবালা তাকে বুকের সঙ্গে সিটিয়ে নিয়ে বললেন-বউমা, এই একটা অবোধকে রেখে যাচ্ছি, বুক-বুক করে রেখো। আর ওই ছোটটা ওকে ছেলের মতো—বুঝলে? কোনওটাই আমার পাকা মানুষ নয়, ন্যাংলা হাবলা।
বুবাই টুকাই ফের হেসে ওঠে ন্যাংলা হাবলা শুনে। সোমেন ওদের নড়া ধরে টেনে নিয়ে যায় ঘর থেকে। বাইরের ঘরে এনে ধমক দেয়—হাসছিলি কেন? খুব হাসির ব্যাপার হচ্ছে ওখানে, না? দেব থাপ্পড়?
কাকাকে ওরা ভীষণ ভয় খায়। ভয়ে অবশ হয়ে দাড়িয়ে আছে। চোখের পাতা ফেলছে।
—যা, ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধো।
সোমেন বাইরের ঘরে বসে সিগারেট ধরায় দাদার প্যাকেট থেকে।
এ-ঘর থেকেই শুনতে পাচ্ছিল সোমেন, ননীবালা বীণাকে বলছেন—না গো বউমা, হঠাৎ নয়। মনে মনে ঠিকই ছিল। যোগাযযাগটা হঠাৎ হয়ে গেল। আজকের দিনটা পঞ্জিকায় সকালে দেখলাম বড় ভাল দিন। অমৃত যোগ আছে আর এই দিনেই হঠাৎ উনিও এসে পড়লেন। ভাবলাম, ঠাকুরই বুঝি যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। তা এই যোগাযোগ ছাড়ি কেন? রোজই যাব-যাব ভাবি, যাওয়া আর হয়ে ওঠে না। এইবার হঠাৎ মনটা ‘যাই’ করে উঠেছে যখন, তোমরা তখন আর আটকে রেখো না। এই তো কাছেই, যখন খুশি আসব, তোমরাও যাবে।
