অবাক ভাবটা সামলে নিল সোমেন। হঠাৎ তার খুবই ভাল লাগছিল ব্যাপারটা। এতকাল তাদের সংসারে কোথায় যেন একটা ছেড়া তারে বেসুর বেজেছে। কী যেন একটা অসঙ্গতি দৃষ্টিকটু হয়ে থেকে গেছে বরাবর। এতকাল পরে সেটা বড় স্পষ্ট ধরা দেয়। ঠিকই তো! মা কেন বাবাকে ছেড়ে থাকবে! থাকা উচিত নয়। বোধ হয় এই একটা কারণেই, মাকে ভালবেসেও এতকাল ধরে মার প্রতি একটা অলক্ষ্য বিতৃষ্ণাও রয়ে গেছে তার বুকের মধ্যে। তাই সে মা থাকবে না জেনেও খুব একটা দুঃখ পায় না।
ব্রজগোপালের দিকে চেয়ে সোমেন বলে—আপনার মত-ই মত।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—না না, সেটা কোনও কাজের কথা নয়। আমাদের বুড়ো বয়সে কত মতিভ্রম হয়।
সোমেন হাসল একটু। বড় হয়ে প্রথম যেদিন বাবার কাছে গিয়েছিল গাঁয়ে, সেদিনই তার মনে হয়েছিল, এই ব্রজগোপাল মানুষটির মধ্যে কিছু মৌলিক মানবিকতা আছে, যা তাদের নেই। ব্রজগোপাল অনেক কথা বলেন যা গ্রহণীয় নয়, যা কখনও হাস্যকর। তবু এ মানুষটা যে-মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন তা বড় দেশজ।
সোমেন হেসেই বলে—কিন্তু আপনি তো না ভেবেচিন্তে কিছু করেন না। আমরা হুটহাট অনেক কথা বলে ফেলি, তাড়াতাড়ি ডিসিশন নিই। আপনি সবই আগে থেকে ভেবে রাখেন। মায়ের যাওয়া যদি আপনি ভাল বোঝেন আমারও খুব সায় আছে। আরও আগে হলে ভাল হত। অবশ্য সবচেয়ে ভাল হত, আপনি আমাদের কাছে চলে এলে।
এই কথায় ননীবালা হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন—না না, সংসারে না থেকে উনি ভালই করেছেন। এ বড় ছোট জায়গা বাবা। এতকাল ধরে দেখছি।
ব্রজগোপাল ছেলের চিক্কণ সুন্দর মুখশ্রী অবলোকন করতে করতে কিছু ধীরস্বরে বলেন—সংসারে বাইরে একটা জায়গা করে রাখা সব মানুষের পক্ষেই দরকার। ঠিক সময় বুঝে সরে যেতে হয়। এই সরে যাওয়াটার মানে অনেকে বোঝে না। আমার মনে হয় সময় মতো সরে যাওয়াটাই হচ্ছে বিচক্ষণের কাজ, তাতে কারও ভালবাসা হারাতে হয় না, নিরন্তর মানুষের সংসারে জায়গা ছোট হয়ে আসে—সেই জায়গা দখল করে থেকে বিরক্তি উৎপাদন করারও দরকার পড়ে না। বানপ্রস্থের ব্যবস্থা খুব মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানসম্মত। বন মানে বিস্তার। সংসার ছেড়ে বৃহৎ সংসারে চলে গেলে আনন্দও পাওয়া যায়। মনটাও সজীব থাকে।
সরে যাওয়ার কথাটা ভালই লাগছিল সোমেনের। বানপ্রস্থের কথাটা খট করে কানে লাগল। বুড়ো বয়সের ওই দোষ। সব প্রাচীন প্রথার মধ্যে আশ্রয় খোঁজার অভ্যাস। তবু বাবাকে ঠিক সেরকম ভাবতে কষ্ট হয় সোমেনের। যদিও বাবাকে খুব ভাল করে জানা হয়নি তার আজও, কারণ তারা মানুষ হয়েছে মায়ের আঁচলের তলায়। বাবাকে ঠিকমতো চেনাই হয়নি। বাবা শাসন করতেন না, আদরও বড় একটা নয়। তবে খুব শান্ত গলায়, ভালমানুষের মতো কথা বলতেন ছেলেদের সঙ্গে। কারও সম্মান কখনও ক্ষুণ্ণ করেননি। ছেলেপুলেরাও যে সম্মান পাওয়ার অধিকারী এটা ব্রজগোপাল বরাবর বুঝতেন। বাবার হাতে চড়চাপড় বা ধমক খেয়েছে এমনটা মনেই পড়ে না তার। ব্রজগোপাল যখন স্থায়ীভাবে গোবিন্দপুরে চলে গেলেন তখনও তেমন কোনও দুঃখ পায়নি তারা। কিন্তু সোমেন বড় হয়ে ব্রজগোপালকে দেখেই এই নির্বাসিত লোকটির প্রতি বড় একটা আকর্ষণ টের পেয়েছে। সফল এবং ধনী পিতাকে সব ছেলেই কিছু সমীহ করে, ব্রজগোপালের সেদিক থেকে কিছু নেই। যা আছে তার কোনও মূল্য এখনকার সমাজ দেয় না। সে হল চরিত্র। আজ সোমেন বাবার ভিতরে সেই খাঁটি সোনার পুরনো গয়নার মতো অপ্রচলিত জিনিসটির প্রতিই আকর্ষণ অনুভব করে। বাবার আর কিছু না থাক, লোকটি বড় ভাল। এ লোকটা ভুলেও এক পয়সা চুরি করবে না, একটা মিথ্যে কথা বলবে না, কাউকে আঘাত করবে না।
সোমেন বলল—কেন বাবা, আপনাকে কি আমরা অনাদর বা অসম্মান করব এই ভাবেন?
—না, তা নয়। ব্রজগোপাল হাসে—তোমরা তা করবে কেন? তেমন বাপের ছেলে নও তোমরা। ব্যাপারটা হল, আমি তো বরাবরই একটু বারমুখী। আমার কেমন আটক থাকতে ভাল লাগে না। কিন্তু তা বলে স্নেহ কিছু কম ছিল না তোমাদের প্রতি, ঠাকুর জানেন। তো আমি ভাবলাম, এই স্নেহটুকুই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, সংসারে এই স্নেহটুকু বুকে নিয়েই সরে যাওয়া ভাল। তা হলে সেটুকু বাঁচে। নইলে নানা স্বার্থের দ্বন্দ্বে কবে মন মরে যায়। আমি বাবা, বড় ভিতু মানুষ। স্নেহের কাঙাল। তুমি বরং স্নানটান করে নাও। বেলা হল, আমি বসিয়ে রাখছি।
সোমেন উঠল। মুখ কিছু বিষন্ন। আবার বিষন্নতার ভিতরেও একটু তৃপ্তিময় আনন্দ।
শরতের বেলায় বড় রোদ। সারা সকালটা সসামেন পুড়েছে ঘুরে ঘুরে। বাথরুমে খুব বেশি জল নেই। তাই সাবধানে জল বাঁচিয়ে স্নান করছিল। আর ভাবছিল। মা চলে গেলে ঘরটা তার একার হবে। আবোল-তাবোল বকে মাথা ধরিয়ে দিত মা। আর দেবে না। মাকে অনেক বকেছে সোমেন। ইদানীং সবচেয়ে বেশি রাগ হত মায়ের প্রতি। একটামাত্র নিরাপদ রাগের জায়গা। সত্যি কথা, আর কে তার রাগ অভিমানকে পাত্তা দেবে? তা হোক গে, সংসারে চিরকাল মা-মা করলে হবেও না। তার সামনে বিপুল পৃথিবী পড়ে আছে। সে না আমেরিকায় চলে যাবে চিরদিনের মতো? সংসারের ছোটখাটো দড়িদড়া ছিঁড়ে এবার জেটি ছেড়ে বার দরিয়ায় গিয়ে পড়তে হবে। সে তো আর ছেলেমানুষ নেই! কয়েকটা দিন একটু ফাঁকা লাগবে, কষ্ট হবে। তা হোক গে।
