ব্রজগোপাল সামলে গেলেন। হেসে বললেন—ভাল, ভাল।
—ভালই তো। তুমি ভেবো না, আমি যে তোমার কাছে চলে যাব এ কথা আমি আগে থেকেই গেয়ে রেখেছি। আমার আর ভাল লাগে না। তোমার ছোট ছেলেটা কোনওদিনই আমাকে দেখতে পারে না। তার ধারণা তোমাকে আমিই পর করেছি। তাই ভাবি, তোমার কাছে গিয়ে থাকলে বোধ হয় তার মন পাব। নইলে ও ডাকাত ঠিক আমেরিকা না কোথায় চলে যাবে।
ব্রজগোপাল আবার হেসে বলেন—বেশ ব্যাবসাবুদ্ধি তোমার। ছেলের মন পাওয়ার অত চেষ্টা করো কেন? এটা ঠিক জেনো, তুমি যত ওদের ভালবাসবে তার অর্ধেক তোমাকে ভালবাসার ক্ষমতাও ওদের নেই। স্নেহ নিম্নগামী, এ তো জানোই।
ননীবালা ব্রজগোপালের পিঠ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে পানের বাটা খুলে বসলেন।
বললেন—ছেলেদের জন্য অনেক করেছি। তুমি ঠিকই বলেছ, অত করতে নেই। তাই এবার একটু দূরে সরে যেতে চাইছি। তাইতে হয়তো সম্পর্কটা ভাল থাকবে।
ব্রজগোপাল হাসিমুখে মাথা নেড়ে বললেন—কিংবা হয়তো সম্পর্ক থাকবে না সোমেন যখন আমার কাছে প্রথম গেল তখন চিনতে কষ্টই হচ্ছিল। বাবা বলে ডাকল, খুব আশ্চর্য লাগছিল শুনে। আমারই ছেলে, তবু সম্পর্ক রাখত না বলে কত পরের ছেলের মতো হয়ে গেছে। ছেলেরা সম্পর্ক রাখবে কেন, ওটা তো তাদের দায় নয়। চোর-দায়ে ধরা পড়েছে যত মা বাপ।
ননীবালা মুখখানা ম্লান করে বললেন—না গো, ওরকম ভাবা তোমার ভুল হয়েছে। সোমেন ফিরে এসে থেকেই তোমার কথা কত বলেছে। আমার ওপর সে কী চোটপাট! বড় হয়ে বুঝতে পেরেছে তো বাপ কত আপন! সেই বাপকে সংসার পর করে দিয়েছে এটা ও সইতে পারে না। ওকে খারাপ ভেবো না। একটু রাগী আর গোয়ার ঠিকই, কিন্তু মনটা ভাল।
ব্রজগোপাল পায়ের ওপর পা তুলে বসেছিলেন। গ্রীষ্মকালে ডাবের জল খেলে যেমন ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে যায়, এ কথা শুনে তাঁর ভিতরটাও তেমনি ঠান্ডা হচ্ছিল। কথাগুলি তিনি পান করছিলেন পরম আনন্দে।
বললেন—মায়েদের ওই দোষ। ছেলেদের কেউ কিছু ভালমন্দ বলতে পারবে না, এমনকী বাপও নয়। ওই করেই তোমরা ছেলেপুলে নষ্ট করো।
ননীবালা ব্রজগোপালের কণ্ঠের স্নিগ্ধতা লক্ষ্য করে হেসে ফেলে বলেন—সেও ঠিক কথা। আমরা মায়েরাই নষ্ট করি। তুমিও তো ওইরকম মায়ের আদর পেয়েই বাউণ্ডুলেপনা করে বেড়াতে। সে কথা ভুলে যাও কেন!
ব্রজগোপাল অন্যমনস্কভাবে মনশ্চক্ষে এক জগদ্ধাত্রীর রূপ দেখতে পেলেন। বয়সের ভার, বিস্মৃতির কুয়াশা ভেদ করে সেই বিসর্জিত প্রতিমার স্মৃতি আজও দেখা দেয়। গাঢ়স্বরে বললেন—মা! মায়ের মতো জিনিস আছে!
বহুকাল পরে সেই মা-ন্যাওটা শিশুর মতোই বুকটা আকুল হয়ে ওঠে। মনে হয় মরার তো দেরি নেই। মরে মায়ের কাছে যাব। মা কত নাড় মোয়া করে রেখেছে!
ননীবালা বললেন—শোনো, আমি যা ঠিক করেছি তার আর নড়চড় হবে না। আমি যাবই। তুমি একটু বসো, সোমেন দুপুরে খেতে আসবে। ওকে সব বুঝিয়ে বলে আমি যাব। বীণা আর রণোকে দুই খোট চিঠি লিখে রেখে যাচ্ছি। ভয় পেয়ো না, ওরা কিছু মনে করবে না।
—যাবেই?
—হুঁ। নইলে সম্মান থাকে না। তোমারও আমাকে দরকার। বহেরুর ওই ভূতের রাজ্যে কে তোমাকে দেখে বলো তো! ঘাড়ের বোঝা মনে করো, পেতনি ভাবো, তবু জেনো আমার চেয়ে আপনার তোমার কেউ নেই।
ব্রজগোপাল উত্তর করলেন না। শুধু অস্ফুট ‘হুঁ’ দিলেন।
ননীবালা উৎকণ্ঠায় বললেন—কী? কিছু বলছ না যে!
—বড় হুট করে ঠিক করলে তাই ভাবছি। ঠিক আছে গুছিয়ে নাও।
ননীবালা অবহেলার ভাব করে বললেন—গোছানোর আর কী! তেমন কিছু নিজের বলতে নেইও। সবই রণোর সংসারের। এই দু-চারখানা জামাকাপড়…
কড়া নড়ল। ননীবালা উঠে গিয়ে সদর খুললেন। বিভ্রান্তের মতো সোমেন ঘরে এসে ঢুকেই থমকে গেল।
—বাবা!
—আয়।
সোমেন ভরদুপুরের ক্লান্ত মুখশ্রী ভেঙে ফেলে খুব খুশির একটা হাসি হেসে বলল— কখন এলেন? কেমন আছেন বাবা!
ব্রজগোপাল মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন।
॥ তিয়াত্তর ॥
ননীবালা সোমেনকে বললেন—তুই স্নান করে আয় খেতে দিই।
সোমেন জামা গেঞ্জি ছেড়ে প্যান্ট পরে পাখার তলায় মেঝেয় বসে বলল—উঃ, দাঁড়াও একটু জিরিয়ে নিই। দাদা বউদিরাও তো দুপুরেই ফিরবে, একসঙ্গে খেতে দিয়ো।।
বলে চৌকিতে বসা বাবার দিকে মুখ তুলে চেয়ে বলল—আপনার সেই বুকের ব্যাথাটা আর হয় না তো বাবা?
—না না। বেশ ভাল আছি।
বলে ব্রজগোপাল চোখ সরিয়ে নিলেন।
সোমেন অন্যমনস্কভাবে মেঝেয় রাখা স্যুটকেশ দেখছিল। মা হয়তো কিছু বেরটের করছিল। হাত দিয়ে সে স্যুটকেশটা চৌকির তলায় ঠেলে দিল ফের।
ননীবালা পানের পিক ফেলে এসে বসলেন। বললেন—বুঝে সমঝে থাকিস। তোর তো আবার হুট বলতেই মাথা গরম হয়। কিন্তু মা ছাড়া তো আর কেউ তোমার রাগের মর্ম বুঝবে না। তাই বলছি, রাগ-টাগগুলো এবার যেন কম করো।
সোমেন অবাক হয়ে বলল—তার মানে? কীসের রাগের কথা বলছ?
ননীবালা চোখের জল মুছলেন আঁচলে। তারপর ভার-ভার মুখখানা সোমেনের দিকে ফিরিয়ে খুব অস্ফুট গলায় বললেন—আমি চলে যাচ্ছি বাবা।
সোমেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। এতকালের মা, যাকে ছাড়া তার একমুহূর্ত চলে না, সেই মা কোথায় যাবে?
সে বলল—কোথায়? বাবার কাছে নাকি!
ননীবালা আঁচলে মুখ চেপে ফুপিয়ে উঠলেন।
ব্রজগোপাল সামান্য অস্বস্তি বোধ করে বললেন—ওঁর খুব ঝোঁক চেপেছে বনবাসী হবেন আমার মতো। আমি বলছিলাম যা করুন একটু ভেবেচিন্তে করুন। তোমাদেরও মতামতের দরকার। মা বাপ বুড়ো হলে ছেলেপুলেরাই তাদের অভিভাবক হয়। এখন তোমরা বিবেচনা করে দেখো—
