অজিত রুখে বলল—তুই জানলি কী করে? তোর কখনও ছেলে হয়েছে?
—ওসব বুঝতে কমন সেন্স যথেষ্ট।
পরে অজিত জেনেছে, লক্ষ্মণের কথাই ঠিক। লক্ষ্মণের কমন সেন্স বরাবরই অদ্ভুত। মানুষকে অনেক ভয়-ভীতি থেকে মুক্তি দিতে পারে লক্ষ্মণ। অজিতকে বরাবর দিয়েছে।
ছেলেটার গায়ে একটা অদ্ভুত আঁতুড়ের গন্ধ। এত মিষ্টি গন্ধ আর কখনও পায়নি অজিত। প্রায়ই সে ছেলের শরীরে নাক ডুবিয়ে বুক ভরে গন্ধ নেয়। আর খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ওর গা। তেল চোবানো বলে ছেলেটার গলার খাঁজে ময়লা, মুঠো খুললে হাতের রেখায় রেখায় ময়লা জমে থাকতে দেখা যায়। প্রায়দিনই ওকে স্নান করানো হয় না। শীলা গ্যাদড়া বাচ্চাকে নাড়াচাড়া করতে ভয় পায়। দু-চারদিন পর পর ননীবালা আসেন, রোদ্দুরে নিয়ে গিয়ে গরমজলে স্নান করান। দৃশ্যটা ভয়াবহ। এক হাতের চেটোয় বাচ্চাটাকে অনায়াসে ধরে থাকেন, বাচ্চাটা ন্যাতার মতো বেঁকে ঝলে কাদতে থাকে, অন্য হাতে গামছায় জল নিয়ে ওর শরীর ঘষতে ঘষতে ননীবালা নাতির উদ্দেশ্যে কত যে কথা বলেন। স্নান করিয়ে পাউডার আর কাজল দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে যান।
অনেকদিন স্নান হয়নি বাচ্চাটার। ননীবালাকে একটু খবর দিতে হবে।
লক্ষ্মণ দিন দশেক ধরে মুম্বই আর দিল্লি ঘুরে এল। একবছরের মধ্যেই ও পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে আসতে চায়। সেটা ঠিক করে যাওয়ার জন্যই এবার এসেছে।
দিল্লি থেকে ফিরে একদিন ম্লান মুখে এসে বললে—অজিত, বড় মুশকিলে পড়ে গেলাম।
কীরে?
ভাবছিলাম, এ দেশে একটা চাকরি বা পজিশন পেলে ফিরে আসব। কিন্তু পাচ্ছি না।
—কেন?
—আমার লাইনের বেশি প্রজেক্ট তো এখানে হয়নি। যা দু-চারটে আছে সেখানে সব উপযুক্ত লোক রয়েছে। তাই ভাল পজিশন পাচ্ছি না।
—তা হলে?
—মুশকিল হল। এরকম হলে ফিরে আসা শক্ত। ওখানে আমার মাইনেই শুধু বেশি নয়, কাজ করারও অঢেল সুযোগ। কী করি বল তো!
—কী করবি?
—আমি তো চলে আসতেই চাই। কিন্তু মোটামুটি একটু ভাল জায়গা না পেলে চলবে কী করে? ওখানে আমি অনায়াসে সিটিজেনশিপ পেয়ে যেতে পারি এখন। ইচ্ছে করেই নিইনি। কিন্তু যদি এখানে কিছু মেটেরিয়ালাইজ না করে তবে বাধ্য হয়ে এবার সেটা নিয়ে ওখানেই থেকে যেতে হবে।
—যাঃ
খুব মন খারাপ হয়ে যায় অজিতের। লক্ষ্মণ আশা দিয়েছিল যে ও ফিরে আসবে। সেটা একটা মস্ত জিনিস অজিতের কাছে। লক্ষ্মণ নিজেও বুঝি জানে না যে ও অজিতের কী ভীষণ প্রিয় ও আপন।
লক্ষ্মণ, এ কিছুতেই হতে পারে না। আমি ভীষণ লোনলি ফিল করি।
লক্ষ্মণ হেসে বলে—জানি।
—তোকে আসতেই হবে।
—আমিও তো চাই। কিন্তু পারছি না যে।
—লক্ষ্মণ প্লিজ! অজিত ভীষণ অস্থির হয়ে বলে।
॥ বাহাত্তর ॥
ননীবালা কেন স্যুটকেস গোছাচ্ছেন তা অনুমান করতে ভয় পাচ্ছিলেন ব্রজগোপাল। নিপাট ভালমানুষের মতো বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে করে বললেন—শোনো, এখন বয়স হয়েছে। তোমারও আমারও।
ননীবালা মুখ তুলে বলেন—সে তো জানি। বলছ কেন?
—এখন হুট করে কিছু করতে নেই, দৃষ্টিকটু দেখায়।
ননীবালা একটু শ্বাস ছাড়লেন। স্যুটকেস যেমন গোছাচ্ছিলেন তেমনই গোছাতে লাগলেন। বললেন—হুট করে নয়। অনেকদিন ধরেই এটা ভেবে আসছি। আজকাল আর মন টেকে না এখানে। ছেলেপুলে নাতিনাতনি সব থেকেও কেমন হাঁফ ধরে যায়। মনে হয় আমি বুঝি বাড়তি মানুষ।
ব্রজগোপাল ধীরগম্ভীর স্বরে বলেন—সে তো ঠিকই। তবু এমন কিছু করো না যাতে ওদের সামনে একটা কু-দৃষ্টান্ত থাকে। সংসারে সবসময়েই সব কাজেরই নিন্দে হয়।
ননীবালা তাঁর বিখ্যাত বড় বড় চোখে অপলক চেয়ে রইলেন ব্রজগোপালের দিকে। তারপর আস্তে করে বলেন—আমাকে বোকা ভাবছ!না? ভাবছ আমি এই বুঝি ঘাড়ে চেপে বসলাম পেতনির মতো।
ব্রজগোপাল উদারভাবে হেসে বলেন—আমি এই কথাটারই ভয় পাচ্ছিলাম। তোমাকে তো চিনি। আর তোমারই বা কথা কী, দুনিয়ার বোধ হয় সব মেয়েমানুষই ওইরকম করে ভাবতে শেখে। সংসারে কারও কাছে তার ওজন কমে গেল বুঝি কখন।
ননীবালা স্যুটকেসের ডালা বন্ধ করে বলেন—আমি ঠিক জানতাম, তুমি ভাল মনে আমাকে আর নিতে পারবে না। একেবারেই কি সংসারের বাইরে চলে গেলে? আর কি কখনও বাউণ্ডুলেপনা ছাড়তে পারবে না?
ব্রজগোপাল তটস্থ হয়ে বলেন—ওসব কথা থাক না। আমার কথা তো একটা জীবন ধরে সবাইকে বলে বেড়িয়েছ। আমি যা ঠিক তাই। ও নিয়ে আর উত্তেজিত হয়ো না। বলি কী, যাবেই যদি তো সবাইকে আগে থেকে বলেকয়ে রাজি করিয়ে তারপর চলো। আমিও তো পথ চেয়েই আছি। বুকে মাঝে মাঝে ঠেলা ধাক্কা লাগছে, কবে কী হয়ে যায়। শেষ বয়সটা না-হয় তুমি আমার কাছেই একটু কষ্ট করে…
ব্রজগোপাল আর বলতে পারলেন না। গলাটা ধরে এল। সহজে বিচলিত হন না। কিন্তু এখন হলেন। বারবার গলাটা ঝেড়ে পরিষ্কার করতে লাগলেন। এ সব দুর্বলতা কেন যে এখনও রয়ে গেছে! সকালে খুব সুন্দর একটি প্রণাম নিবেদন করে এসেছেন ঠাকুরকে। ভেবেছিলেন, সংসারের কাছে তার সব প্রত্যাশা বুঝি চুকেবুকে গেছে। কিন্তু যায়নি তো। বুকের কোন গর্ত থেকে এই দুর্বলতার কালসাপ বেরিয়ে এল!
ননীবালা অত্যন্ত কূটচক্ষে চেয়েছিলেন। হঠাৎ উঠে পাশে এসে বসে পিঠে আলতো হাত ছুঁইয়ে বললেন—কেন অত পাষাণ হওয়ার চেষ্টা করো বলো তো! তোমার মতো মানুষ কি কখনও এরকম হতে পারে। সংসারের দিক থেকে যতই চোখ ফিরিয়ে থাক, তোমাকে আমি চিনি।
