ব্রজগোপাল চমকে উঠে বলেন—তাই নাকি?
—বলছে তো। ভাল করে জিজ্ঞেস করিনি কেন যাবে। করলে হয়তো বলবে, আমার জন্যই সংসারে অশান্তি, তাই পালাতে চাইছে।
ব্রজগোপাল করুণাভরে বলেন—এখন তবে কী করবে?
—তোমার মতো বেড়াল-পার হব।
—তার মানে?
—ননীবালা একটা গভীর শ্বাস ছেড়ে বলেন—শেষ পর্যন্ত মেয়েমানুষের জায়গা কোথায় তা কি জানো না?
—জানি। সেটা কি বুঝতে পেরেছ ননীবউ?
—না বুঝে যাব কোথায়? দুরমুশ দিয়ে ঘাঁচা ঘাঁচা করে সংসার জানিয়ে দিচ্ছে। তা ছাড়া—
বলে থামেন ননীবালা।
ব্রজগোপাল উদ্গ্রীব হয়ে তাকান।
ননীবালা ম্লান হাসি আর চোখের জলে উজ্জ্বল একরকম অদ্ভুত মুখে চেয়ে বলেন— তোমার জন্যও তো কিছু করিনি। খুব স্বাবলম্বী মানুষ হয়েছ, দেখে এসেছি। তবু আমি বেঁচে থাকতে তুমি নিজের হাতে রাঁধলে বাড়লে, কাপড় কাচলে আমি যে পাপের তলায় পড়ি।
॥ একাত্তর ॥
ছেলেটা সারাদিন ঘুমোয়। আর ঘুমের মধ্যে কখনও-সখনও গাল ভরে হাসে, কখনও ভ্রূ কুঁচকে কান্না কান্না মুখভাব করে।
শীলা বলে—ওদের পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে, জানো!
কথাটা অবিশ্বাস করতে পারে না অজিত। সে যদিও পূর্বজন্ম মানে না, তবু এখন তার মনে হয়—হবেও বা। নইলে একমাসও পুরো বয়স হয়নি যে শিশুর সে অমন চমৎকার ঘুম-হাসি হাসে কী করে! আধখানা ঠোটে বেশ একটু শ্লেষ বা বিদ্রুপের হাসি।
অজিত যেটুকু সময় পায় বিছানার পাশে বসে থাকে। এই এতদিনে সে নিজস্ব একটা মানুষের জন্ম দিতে পারল। নিজস্ব মানুষ, ছেলে। তারই অন্তর্গত বীজ থেকে প্রাণ পেয়ে শীলার জঠর বেয়ে এসেছে। কি সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড! ভাবতে বসলে থই পাওয়া যায় না। তার ভিতরে ছিল, শীলার ভিতরে ছিল! তাদেরই রক্ত মাংস প্রাণ থেকে, ঠিক যেমন একটা আগুনের শিখা থেকে আর একটা ধরিয়ে নেওয়া, সেরকম।
শীলা আজকাল হাঁটাচলা করে অল্পস্বল্প। এ-ঘর ও-ঘর করে। নতুন একটা রান্নার মেয়েছেলে রাখা হয়েছে, বাচ্চা ঝিটা সারাদিন বাচ্চার খিদমদগারী করে।
ছেলের নাম রাখার জন্য একটা পৌরাণিক অভিধান কিনে এনে কদিন ধরে ঘাঁটছে অজিত। রামায়ণ মহাভারত আর পুরাণ যা পাচ্ছে কিনে আনছে। কোনও নামই পছন্দ হচ্ছে না।বই রেখে কখনও ছেলের মুঠো পাকানো ঘুমন্ত হাত দুখানার দিকে চেয়ে থেকে বলে— ব্যাটা বক্সার হবে নাকি শীলা? সব সময়ে ঘুষি পাকিয়ে থাকে কেন?
শীলা বলে—গুন্ডার ছেলে গুন্ডাই হওয়ার কথা।
—আমি গুন্ডা?
—গুন্ডাই তো। যা গুন্ডামিটা করো আমার সঙ্গে!
অজিত দাঁতে ঠোঁট কামড়ে বলে—ছেলেটা খুব চিন্তাশীল বলেও মনে হয়। ভ্রু কুঁচকে কী ভাবে বলো তো সবসময়ে?
শীলা ধমক দিয়ে বলে—সব সময়ে অত চেয়ে থেকো না তো! বাপ-মায়ের নজর খুব খারাপ। মা-ও সেদিন আমাকে বলে গেছেন, জামাই অত ছেলের দিকে চেয়ে থাকে কেন রে! ও সব ভাল নয়।
ছেলেটার গা থেকে পাতলা চামড়া উঠছে। তালুতে আর গায়ে চুপচুপে করে তেল মাখাননা। ঘানির সর্ষের তেল টিন ভরে কিনে এনে রেখেছে অজিত। ইটালিয়ান অলিভ অয়েলও। যে যা বলছে কিনে আনছে।
শীলা বলে—আদেখলা।
অজিত বলে— তুমিও কম কী?
দুজনেই তারপর হাসে।
ঘুমের মধ্যেই বাচ্চাটা দুধ খায়, ঘুমের মধ্যেই কাঁথা ভেজায় দিনের মধ্যে পঞ্চাশবার, ঘুমের মধ্যেই চমকে চমকে ওঠে।
অজিত বিরক্ত হয়ে বলে—ও এত ঘুমোয় কেন?
শীলা বলে—চুপ চুপ। বাচ্চারা যত ঘুমোয় ততই ভাল। দশমাস ধরে পেটের মধ্যে যা ফুটবল খেলেছে তোমার গুন্ডা ছেলে, ঘুমোবে না?
একটা হালকা বালিশ বুকের ওপর চাপিয়ে রাখে শীলা। অজিত ভয় পেয়ে বলে— সাফোকেশন হবে যে!
—না গো, ভার রাখলে আর চমকায় না।
অজিত ছেলেটার শব্দ শুনতে চায়, হাসি কান্না কথা বা যেমন হোক শব্দ। কিন্তু অত ঘুম বলে বাড়িটা নিস্তব্ধ থাকে। বাচ্চাটা কাঁদেও কম। যতটুকু সময় জেগে থাকে ততটুকু সময় ধরে অল্প অল্প হাত পা নাড়ে। ভাল করে কোনও কিছুর দিকে তাকাতে পারে না। কী ভীষণ অসহায়! এসব ভাবলে বুকের মধ্যে মায়া চলকে চলকে ওঠে। প্রতিদিন ভয়ংকর প্লাবনের মতো বুক ভাসিয়ে দিয়ে মায়ার জল বাড়ে। পিপাসা বাড়ে। এই তার ছেলে, তার আপন মানুষ। তার সৃষ্ট।
সৃষ্ট? না, তা তো নয়। অজিত দ্রু কুঁচকে ভাবতে বসে। এই ছেলেটার জন্মরহস্যটুকুই মাত্র সে জানে। জানে, সে এর জন্মের কারণ। কিন্তু ওর ওই ছোট্ট শরীরের লক্ষ কলকব্জা, ওর চেতনা ও প্রাণ—এ তো তার সৃষ্টি নয়। তাকে দিয়ে কে যেন ওকে সৃষ্টি করেছে। যে করেছে সে কে? ঈশ্বর?
—শোনো শীলা।
—উঁ।
—জায়া মানে জানো?
—জানি। বউ।
—দূর! হল না।
—তবে কী?
—জায়া মানে যার ভিতর দিয়ে পুরুষ আবার জন্মায়। এই যেমন আমি তোমার ভিতর দিয়ে ওই ছেলেটা হয়ে জন্মেছি।
—ও।
এইসব অদ্ভুত রহস্য ক্রমে ধরা পড়ছে অজিতের কাছে। সে আজকাল অল্পস্বল্প টের পায় যে, বাস্তবতার অতিরিক্ত একটা শক্তির অস্তিত্ব আছে। সে শক্তিই হয়তো প্রকৃতি বা ঈশ্বর।
কদিন আগে ছেলেটা খুব হচত। ভয় পেয়ে গিয়েছিল অজিত। খুব শিশুদের সর্দি হলে বাঁচানো মুশকিল। ওরা তো শ্লেষ্ম তুলতে পারে না, দম আটকে মরেটরে যেতে পারে। শিশুদের সর্দি বড় ভয়ের।
তাই ছেলের হাঁচি দেখে অজিত উদ্বিগ্ন হয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল—হায় ভগবান! ওর যে সর্দি হয়েছে।
লক্ষ্মণ ঘরে বসেছিল। বলল—দূর বোকা, ও সর্দি নয়। সদ্য হয়েছে তো, ওদের বুকে গলায় নানারকম কনজেশন থাকে। হাঁচি দিয়ে বের করে দেয়।
